আপনার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে মৌলিক কাঠামোগত সমস্যা কোনগুলো? আর সংস্কার কোন পর্যায় থেকে শুরু হওয়া উচিত?
আমার কাছে সবচেয়ে মৌলিক সমস্যা হলো রাষ্ট্র শিক্ষার দায় স্পষ্টভাবে গ্রহণ করেনি। প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক শিক্ষা আইন আছে, যেখানে অভিভাবকদের দায়িত্ব ও শাস্তির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র যদি প্রয়োজনীয় বিদ্যালয়, শিক্ষক ও অবকাঠামো নিশ্চিত না করে, সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কী দায় নেবে—তা আইনে স্পষ্ট নয়। সংবিধানেও শিক্ষা অধিকার হিসেবে ঘোষিত নয়; কেবল মূলনীতি হিসেবে আছে, যা আদালতে প্রতিকারযোগ্য নয়। আর মাধ্যমিক শিক্ষার বিষয়ে তো সংবিধান বা আইনে কার্যত কোনো স্পষ্ট অঙ্গীকারই নেই। অথচ একবিংশ শতাব্দীতে শুধু পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা দিয়ে একটি সমাজ এগোতে পারে না। অন্তত মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা সর্বজনীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত হওয়া দরকার, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ৪-এর মূল প্রতিশ্রুতি। এ দায়হীনতার প্রতিফলন আমরা দেখি প্রশাসনিক কাঠামোতেও—বিদ্যালয় শিক্ষা দুই মন্ত্রণালয়ে বিভক্ত। ফলে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ভাবার সুযোগ নেই। সংস্কার শুরু করতে হলে প্রথমেই রাষ্ট্রীয় দায় স্পষ্ট করতে হবে এবং এলাকাভিত্তিক সামগ্রিক পরিকল্পনার দিকে যেতে হবে।
শিক্ষার্থীদের শিখনমান প্রত্যাশিত মাত্রায় না পৌঁছানোর পেছনে কোন বিষয়টি বেশি দায়ী?
শিক্ষায় কোনো ‘সিলভার বুলেট’ নেই। পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন ও শিক্ষক—তিনটিই পরস্পরনির্ভরশীল। মূল্যায়ন পদ্ধতি এখনো মুখস্থনির্ভর শেখাকে উৎসাহিত করে। এমনকি সৃজনশীলের সংক্ষিপ্ত প্রশ্নেও পাঠ্যবইয়ের নির্দিষ্ট তথ্য হুবহু না লিখলে নম্বর পাওয়া যায় না। ধারাবাহিক মূল্যায়নের বদলে আমরা এক-দুটি বড় পরীক্ষার নম্বর দিয়ে শিখনমান বিচার করি। এসব বিষয়ে সংস্কার করতে হলে দক্ষ ও পর্যাপ্ত শিক্ষক লাগবে—সেই জায়গাতেও চরম সংকট রয়েছে। শিখনমান প্রত্যাশিত মাত্রায় না পৌঁছানোর পেছনে এগুলোই বড় কারণ।
মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া কমাতে বিদ্যমান নীতিগুলো কতটা কার্যকর? কী ধরনের নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন?
ঝরে পড়ার পেছনে একটি বড় কারণ হলো অর্থনৈতিক অবস্থা। শিক্ষা এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে যত বেশি অর্থ ব্যয় করা যায়, তত ভালো শিক্ষা পাওয়া যায়। প্রাথমিক শিক্ষা নামমাত্র বিনা বেতনের হলেও বাস্তবে প্রাইভেট কোচিং, গাইড বই ও অন্যান্য খরচ অনিবার্য হয়ে উঠেছে। ফলে দরিদ্র পরিবারগুলোর শিশু—শহর ও গ্রাম উভয় জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়া ঠেকাতে হলে শিক্ষাকে বাস্তব অর্থে এ স্তরে ব্যয়মুক্ত করতে হবে এবং দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় বিশেষ সহায়তা দিতে হবে। শুধু উপবৃত্তি দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না।
শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও পদোন্নতির বর্তমান ব্যবস্থাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
বর্তমান ব্যবস্থা মানসম্মত শিক্ষক তৈরির জন্য মোটেও সহায়ক নয়। প্রথমত, নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, আমরা মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে পারছি না, যারা আসছেন, তাদের ধরে রাখার মতো কোনো পদোন্নতির কাঠামো নেই। পদোন্নতি, দায়িত্বের বৈচিত্র্য বা পেশাগত স্বীকৃতির কোনো সুস্পষ্ট পথ নেই। অথচ শিক্ষকতা যদি আজীবনের পেশা হয়, তাহলে ‘সহকারী শিক্ষক, শিক্ষক, সিনিয়র শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক’—এমন একটি পদক্রম থাকা উচিত। তৃতীয়ত, শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো ও জনবল ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। প্রশাসনিক ক্যাডারের ওপর নির্ভরশীলতাও একটি বড় কাঠামোগত সমস্যা। স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষা প্রশাসনেও শিক্ষকদের নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় শহর-গ্রাম ও আর্থসামাজিক বৈষম্য কমাতে রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
শিক্ষায় যে বৈষম্য, তা অর্থনৈতিক বৈষম্যেরই প্রতিফলন। শহরের ধনী পরিবার কিংবা গ্রামের উচ্চবিত্তরা ভালো স্কুলের সুযোগ পায়, আর দরিদ্র পরিবারগুলো সরকারি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল—যার মান প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষ করে শহরের বস্তি ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য কার্যত কেউ দায়িত্ব নেয় না—না শিক্ষা অধিদপ্তর, না সিটি করপোরেশন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো যে প্রতিষ্ঠানেই শিশু পড়ুক না কেন, একটি ন্যূনতম মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। এটি কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং শিশু অধিকার সনদের আওতায় রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার।
প্রাথমিক শিক্ষার সংস্কার নিয়ে আপনারা যে সুপারিশ দিয়েছিলেন, সেগুলো বাস্তবায়নে সরকার কতটা আন্তরিক?
সরাসরি বললে—কোনো সুপারিশই বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা তিন মাস কাজ করে ১০০টির বেশি সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। প্রধান উপদেষ্টা গুরুত্বের কথা বললেও পরে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে আমাদের সুপারিশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়—রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক আগ্রহের ঘাটতি রয়ে গেছে। এ সরকার হয়তো বড় সংস্কার করতে পারবে না, তবে একটি শক্ত সংস্কার এজেন্ডা রেখে যাওয়া জরুরি, যাতে ভবিষ্যৎ সরকারগুলো চাপের মুখে পড়ে।










