আপনাদের অধিভুক্ত মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষার সার্বিক মান ও পরিবেশ নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? সংকট এবং সম্ভাবনার জায়গা কোনগুলো?
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মাদ্রাসাগুলো নীরবে কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। বিশেষ করে প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা একটি বড় আশ্রয়। তবে দীর্ঘদিনের অবহেলা, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের অভাব এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি। বিগত সরকারগুলো মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে বৈষম্যের নিষ্পেষণ থেকে উদ্ধার করতে পারেনি বরং অবহেলা করেছে। সংকট আছে—এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সম্ভাবনাও অনেক বড়। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা আর অনগ্রসর থাকতে চায় না। তারা বিশ্ববিদ্যালয়, বিসিএস, কর্মক্ষেত্র—দেশে ও বিদেশে—নিজেদের সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখছে। রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলন থেকে শুরু করে নেতৃত্ব সর্বত্র এখন মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। জুলাই আন্দোলনে মাদ্রাসা ছাত্রদের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের কোনো আন্দোলনে এর আগে মাদ্রাসার ছাত্ররা এত সক্রিয় অংশগ্রহণ করেনি। শহীদদের মধ্যেও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। ডাকসু নির্বাচনে যারা নির্বাচিত হয়েছেন তাদেরও অধিকাংশই মাদ্রাসা পড়ুয়া। এখন সময় এসেছে মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুক্তিনির্ভর, আধুনিক ও গবেষণাভিত্তিক করে তোলার।
অধিভুক্ত মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, নিয়োগ ও দক্ষতা উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী?
ভালো আলেম ও দক্ষ শিক্ষক তৈরি করাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সারা দেশে মাদ্রাসা শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে মাত্র একটি। এটি একেবারেই অপ্রতুল। আমরা শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। ইনহাউজ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কামিল পর্যায়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। কারিকুলাম উন্নয়ন, জার্নাল প্রকাশ, এমফিল ও পিএইচডি কার্যক্রম চালুর বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত। তবে অর্গানোগ্রামে অনুমোদিত ১ হাজার ১০০ পদের বিপরীতে ২০০ জনবল নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে—এটা একটি বড় সংকট। গত এক বছরে একজনকেও নিয়োগ দেয়া যায়নি। সব ধরনের অনুমোদন নিয়ে ১০০ জনকে নিয়োগ দেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করার নিয়োগ পরীক্ষার একদিন আগে নির্দেশ এসেছে এটি স্থগিত রাখার জন্য। চাইলেও সারা দেশের মাদ্রাসাগুলোকে উন্নত করতে পারছি না। ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসায় এখনো সহযোগী অধ্যাপকের পদ তৈরি করা হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকার উদাসীন ছিল। যারা প্রভাষক হিসেবে কাজ করছেন তারা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়ছেন। ভালো শিক্ষক আনতে পারছি না কারণ তারা দেখছে এখানে ক্যারিয়ার পঙ্গু হয়ে পড়ছে। অধ্যাপক হওয়ার সুযোগ নেই। ১ হাজার ৭০০ মাদ্রাসা পরিচালনায় আমরা পদে পদে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছি।
শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে?
আমরা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুযোগ সম্প্রসারণে কাজ করছি। শিক্ষার্থীদের যাতে শিক্ষাজীবন শেষে বেকার থাকতে না হয় এ কারণে আমরা ফাজিল-কামিল সব পর্যায়েই সিলেবাস আধুনিকায়নের ও কর্মবাজার উপযোগী করার উদ্যোগ নিয়েছি। এর অংশ হিসেবে আমরা ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স নামে একটি বিভাগ চালু করতে যাচ্ছি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুযোগ সম্প্রসারণের জন্য তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও আরব বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সইয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বহু মাদ্রাসা শিক্ষার্থী মিসরের আল-আজহারসহ বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন, অনেকেই তুরস্কে পিএইচডি করছেন। এসব বিষয়ে আমরা তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করছি।
অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও সনদ প্রদানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কী ধরনের সংস্কার আনা হয়েছে?
পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছি। প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং, কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, সময়নিষ্ঠতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা হচ্ছে। একসময় সার্টিফিকেট পেতে শিক্ষার্থীদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতো। ২০১৮ সালে পাস করা শিক্ষার্থীরাও সনদ পায়নি—এটা লজ্জাজনক ছিল। আমরা দ্রুততার সঙ্গে এসব সনদ ছাড় দিচ্ছি। ঘুস ও অনিয়মের অভিযোগ ছিল, সেটিকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়েছে।
আপনার মতে দেশের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী? তা কাটিয়ে উঠতে করণীয় কী?
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও অপপ্রচার। ১৫ বছর ধরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জঙ্গি তকমা দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো—সিট বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির মতো অপরাধে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা জড়িত ছিল না; বরং তারা ছিল নির্যাতিত। মাদ্রাসা শিক্ষা এ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ—এটা রাজনৈতিকভাবে স্বীকার করতে হবে। বাজেট বরাদ্দ, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং সমান মর্যাদা নিশ্চিত করলেই এ চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
ভবিষ্যতে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক, গবেষণাভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে আপনার অগ্রাধিকার কী কী?
আমার অগ্রাধিকার তিনটি—নৈতিকতা, আধুনিকতা ও গবেষণা। কারিকুলামকে প্রযুক্তিনির্ভর করা, আইসিটিতে শিক্ষার্থীদের আগ্রহকে কাজে লাগানো এবং গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা চালু করা জরুরি। আমরা তিন বছরের সেশনজট শূন্যে নামিয়ে এনেছি, এক বছরে তিনটি পরীক্ষা নিয়েছি। এমফিল-পিএইচডি চালু, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে পূর্ণ সক্ষমতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছি। আমি আশাবাদী মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে দেশকে নৈতিক, সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রদানে সক্ষম হবে।










