রাজশাহী কলেজ দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বর্তমানে কলেজটির একাডেমিক মান উন্নয়নে আপনার অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগগুলো কী কী?
একাডেমিক ও সার্বিক পরিবেশ বিবেচনায় আমাদের কলেজ একাধিকবার দেশসেরা কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০২৬ সালেও জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ প্রতিযোগিতায় আমরা সেরা কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছি। আমাদের অগ্রাধিকারের একটি জায়গা হলো আমরা যে মানদণ্ডে রয়েছি, এটাকে আরো উন্নত করা, আরো ভালো করা। সে লক্ষ্যেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের যে প্রাচীন পদ্ধতির শিক্ষা আছে, সে শিক্ষার সঙ্গে যদি আধুনিক দক্ষতা যোগ না হয়, তবে শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারবে না। এ কারণে আমরা এখন দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা প্রদানে গুরুত্ব দিচ্ছি।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ হিসেবে সেশনজট, পরীক্ষার ফল প্রকাশে বিলম্ব ও প্রশাসনিক জটিলতা—এ চ্যালেঞ্জগুলো রাজশাহী কলেজ কীভাবে মোকাবেলা করছে?
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এখন সেশনজট কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে তারা বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে, যেমনে আগে পরীক্ষার সময়সূচি জটিলতা ছিল, কিন্তু এখন ইনকোর্স পরীক্ষার সময় নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে, ফলাফল প্রকাশের সময় নির্ধারণ দেয়া হয়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে আমরা পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করছি। কখনো কোনো বিষয়ে সমস্যা দেখা গেলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্যাগুলোকে সমাধান করার চেষ্টা করি। আশা করছি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেশনজট কমানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে, এটা অব্যাহত থাকলে সেশন জট আর থাকবে না এবং পড়ালেখার মান আরো ভালো হবে। তবে প্রশাসনিক বিষয়ে এখনো কিছু জটিলতা আছে। এর মধ্যে একটা বড় সমস্যা সার্টিফিকেটের জন্য শিক্ষার্থীদের সেই ঢাকার গাজীপুর পর্যন্ত যেতে হয়। এতে শিক্ষার্থীদের অনেক সময়, শ্রম ও অর্থ চলে যায়। যদি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সার্টিফিকেট প্রদানের বিষয়গুলো অন্তত জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ে বণ্টনের ব্যবস্থা করে, তবে শিক্ষার্থীদের অনেক হয়রানি কমবে। আগামীতে সিনেটে যদি কোনো মিটিং হয়, তখন আমি এ ধরনের প্রস্তাব তুলব।
শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির জন্য স্কিল ডেভেলপমেন্ট, গবেষণা এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগের ক্ষেত্রে আপনাদের উদ্যোগগুলো কী?
আমরা শিক্ষার্থীদের প্রেজেন্টেশন ও গবেষণামূলক শিক্ষার পারফরম্যান্সকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। অলরেডি এ ধরনের কার্যক্রম চালুর জন্য সব ডিপার্টমেন্টে নোটিস জারি করেছি। বিভাগের শিক্ষকরা যেন তাদের প্রেজেন্টেশন, অ্যাসাইনমেন্ট ও অন্য স্কিলের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। এতে তাদের জ্ঞানও বাড়বে আবার শিক্ষার মানেরও উন্নয়ন হবে। শিক্ষার্থীদের স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্যও আমরা চেষ্টা করছি। আমাদের ম্যানেজমেন্ট ও অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির সংযোগ আছে। এ দুই বিভাগের শিক্ষার্থীরা ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ পাচ্ছেন। ভাষাভিত্তিক স্কিল ডেভেলপমেন্ট এবং বিদেশে শ্রমবাজারে স্থান পাওয়ার জন্য রাজশাহী কলেজের বিজনেস ক্লাবের উদ্যোগে আমরা ইংলিশ কোর্স করাচ্ছি। নিজেদের অর্থায়নে আইসিটি কোর্স করাচ্ছি। পাশাপাশি আমরা কোরিয়ান ও জাপানিজ ভাষার কোর্স চালু করার পরিকল্পনা করেছি। এছাড়া রাজশাহী কলেজ বিজনেস ক্লাবের পক্ষ থেকে আমরা প্রায়ই চাকরি মেলা আয়োজন করি। এতেও কিছু ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ তৈরি তৈরি হচ্ছে এবং অনেক শিক্ষার্থীই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে রাজশাহী কলেজের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী? এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আপনাদের পরিকল্পনা কী?
আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরিয়ে আনা। আমরা কাজটি খুব গুরুত্বসহকারে করছি। জুলাই-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতির পরিমাণ একেবারেই কমে গিয়েছিল। এইচএসসির শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা ও উপস্থিতির বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয়া হয়েছে। তবে অনার্স-মাস্টার্সের কিছু শিক্ষার্থী অনিয়মিত ক্লাসে আসে। আমরা নিয়মিত সকালে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে পরিদর্শন করে ক্লাসে গিয়ে তাদের মোটিভেশন দেয়ার চেষ্টা করছি, যাতে তারা ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিত থাকে। কারণ শিক্ষার্থীরা ক্লাস না করলে তার শিক্ষাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই আমাদের মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরানো এবং এরই মধ্যে এ বিষয়ে আমরা অনেকটাই সফল হয়েছি। এছাড়া আমাদের কিছু অবকাঠামোগত সমস্যা, বাজেট ঘাটতিও রয়েছে। এগুলোও কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে ।
স্মার্ট শিক্ষা ও ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল লাইব্রেরি বা আইসিটিভিত্তিক শিক্ষার অগ্রগতি কতটুকু?
রাজশাহী কলেজ এ ব্যাপারে অনেক অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। যখন বাংলাদেশের অন্যান্য কলেজে আইসিটি শিক্ষা ছিল না বললেই চলে; ওই সময় রাজশাহী কলেজ নিজস্ব অর্থায়নে আইসিটি ও ইংলিশ কোর্স করিয়েছে। আমাদের আইসিটি ল্যাবে প্রায় ১৫০ কম্পিউটার আছে। প্রত্যেক বিভাগ থেকে কমপক্ষে ২০০ শিক্ষার্থী কম্পিউটার শেখার সুযোগ পায়। আমাদের কিছু বিভাগে স্মার্ট বোর্ড এবং কোথাও প্রজেক্টরের মাধ্যমে ক্লাস নেয়া হয়। আবার অনেক সময় আমরা আমাদের ওয়েবসাইটে কিছু বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম আপলোড করি। শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে তাদের নোটস ও তথ্যগুলো সংগ্রহ করতে পারে। সরকার সহযোগিতা ও পাঠপরিকল্পনায় আইসিটি কোর্স যদি বাধ্যতামূলক করে; তবে স্মার্ট শিক্ষা ও ডিজিটাল শিক্ষার রূপান্তর আরো বাড়বে বলে আমি মনে করি।
রাজশাহী কলেজকে আরো আধুনিক, গবেষণামুখী ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে আপনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী?
আমরা একটি স্টুডেন্ট-টিচার রিসার্চ সেন্টার করতে চাই। যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা মেলবন্ধন সৃষ্টি হবে। আমাদের শতকরা প্রায় ৩২ ভাগ শিক্ষক পিএইচডি ও উচ্চতর ডিগ্রিধারী। আমাদের গবেষণামূলক অনেক কাজ করার সুযোগ আছে। আমাদের শিক্ষকরাও শিক্ষার্তীদের সঙ্গে নিয়ে গবেষণা করার বিষয়ে বেশ আগ্রহী। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসেও গবেষণাপত্রের বিষয়ে উল্লেখ আছে। কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থীরা বিমুখ। আমরা চেষ্টা করছি এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করার। আমরা চাই শিক্ষার্থীরা যেন পাঠ্যবইনির্ভর পড়ালেখার পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর গবেষণা করা, বই লেখা এবং নিজের, দেশের ও জাতির জন্য ভালো কিছু করতে আগ্রহী হয়। তারা যেন একক ও গ্রুপভিত্তিক গবেষণা করতে পারে, ভালো পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষা লাভ করতে পারে এবং জীবনে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারে।










