জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোয় শিক্ষার মান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। এ সংকটগুলো নিরসনে আপনারা কীভাবে এগোচ্ছেন?
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর আগে নানা কারণে শিক্ষার মান ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলায় ঘাটতি ছিল। দক্ষ ও যোগ্য অধ্যক্ষ এবং উপাধ্যক্ষ নিয়োগের মাধ্যমে কলেজ প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। প্রায় সব কলেজের অবকাঠামো ও প্রশাসনিক সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়েছে। কোথাও যদি কোনো সহযোগিতা প্রয়োজন হয়, সেটি আমরা প্রদান করার চেষ্টা করছি। অনেক প্রতিষ্ঠানে বোটানি ল্যাব, পরিবেশবিজ্ঞান ল্যাব, আইসিটি ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। অনেক কলেজের আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় শিক্ষকরা পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পেতেন না এবং মানসম্মত শিক্ষাও নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছিল না। সম্প্রতি আমরা সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ শিক্ষককে এমপিও সুবিধার আওতায় এনেছি। এছাড়া সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর গভর্নিং বডি পুনর্গঠন করেছি, যা কলেজগুলোর বিভিন্ন সমস্যা নিরসন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি আমরা অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোয় অডিট কার্যক্রমও আরো জোরালো করেছি। এককথায় আমরা সামগ্রিকভাবে চেষ্টা করছি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যাগুলো শনাক্ত করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি। সাম্প্রতিক সময়ে এ সমস্যা কতটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং স্থায়ী সমাধানে কোন পদক্ষেপগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন?
আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ন্যূনতম ৬০ শতাংশ ক্লাসে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করেছি। কলেজগুলোয় গভর্নিং বডি ও অধ্যক্ষদের মাধ্যমে উপস্থিতি এবং শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো মনিটরিংয়ের জন্য জেলাভিত্তিক মনিটরিং কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে শিক্ষার্থীরা ক্লাসমুখী হচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত রাখলে অনুপস্থিতির সমস্যা কার্যত নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আমরা মনে করি।
কারিকুলাম হালনাগাদ ও শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রমকে সামঞ্জস্য করার ক্ষেত্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কতটা এগিয়েছে? বিশেষত চতুর্থ ও পঞ্চম শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?
আমরা পঞ্চম শিল্প-বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে আছি। সেক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষার মান ও কারিকুলাম বাজারমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে। তাই আমরা আমাদের সব শিক্ষার্থীর জন্য ইংরেজি ও আইসিটি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছি। সারা দেশে ১২ হাজার আইসিটি শিক্ষকের প্রশিক্ষণ চলছে, ৫০ হাজার নারীকে ডিজিটাল উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সার হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অনার্স, মাস্টার্স, বিএড, এলএলবিও লাইব্রেরি সায়েন্স প্রোগ্রামের পাঠ্যক্রম সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। ট্রেড ও কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যাতে কর্মমুখী দক্ষতা অর্জন করতে পারে এ উদ্দেশ্যে আমরা আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও চায়নার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছি। এখন পর্যন্ত আমরা যেসব উদ্যোগ নিয়েছি, সেগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে আমাদের শিক্ষার্থীরা আধুনিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের এগিয়ে নিতে পারবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন বেসরকারি কলেজগুলোর সুযোগ-সুবিধা, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণে আপনার পরিকল্পনা কী?
গত ১১ মাসে আমরা ৩৮ লাখের বেশি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা গ্রহণ করেছি। মূল্যায়নে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে আমরা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে অতিরিক্ত জনবল সহযোজন করেছি। ইন-কোর্স পরীক্ষার খাতাও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো বাধ্যতামূলক করেছি। বর্তমানে প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রে কেন্দ্রীয় মনিটরিং টিম, জেলা মনিটরিং টিমের মাধ্যমে নিরাপত্তা ও তদারকি নিশ্চিত করা হয় এবং কেউ পরীক্ষায় অসদুপায় ও নকল করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়। এছাড়া উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের জন্য গাজীপুরে প্রেরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং চূড়ান্ত পরীক্ষার ফলাফল ৫০ দিনের মধ্যে প্রকাশের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশনে কোন উদ্যোগগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
শিক্ষা পদ্ধতির আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে আমরা অনলাইন শিক্ষা প্লাটফর্ম চালু ও সম্প্রসারণ করেছি। প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করতে বাস্তবায়ন করেছি। ই-নথি, ডি-নথি চালু করেছি। ফাইল ম্যানেজমেন্ট ও অফিস অটোমেশন বাস্তবায়ন করেছি। আমাদের শিক্ষার্থীরা সমগ্র দেশে ছড়িয়ে আছে। তারা যাতে সহজে সেবা পেতে পারে, এ কারণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবার উন্নয়ন করা হয়েছে, একাডেমিক ও প্রশাসনিক তথ্যের ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন এবং এ চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে আপনার পরিকল্পনা কী?
আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শিক্ষার বাজারমুখী ও জ্ঞানভিত্তিক উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা। বর্তমান শ্রমবাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কারিগরি দক্ষতা। এ বাস্তবতা উপলব্ধি করে আমরা শিক্ষার্থীদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিতে চাচ্ছি। কিন্তু এ উদ্যোগ কোন প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করব সেটি নিয়ে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি। শিক্ষার্থীদের জন্য ট্রেডগুলো কোন পদ্ধতিতে নির্ধারণ করলে সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ হবে সেটি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। আমরা শ্রমবাজারের সঙ্গে সামাঞ্জস্য রেখে এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কারিকুলাম পর্যালোচনা করে বিষয়টি চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছি। এছাড়া শিক্ষক-অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোসহ আমাদের সমগ্র কাঠামোকে এ প্রক্রিয়ার বাস্তবায়নের জন্য উপযোগী করাও আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়-সরকারের সমন্বয়, দক্ষ জনবল, অর্থ বরাদ্দসহ অনেক বিষয় জড়িত। সব মিলিয়ে বিষয়টি রাতারাতি করে ফেলা সম্ভব নয়। তবে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, এরই মধ্যে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বেশ কয়েকটি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে কারিকুলাম তৈরিসহ কারিগরি সহযোগিতা প্রদানে সম্মত হয়েছে। আমরা নিজেরাও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ল্যাব নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু করেছি। সরকারও বিষয়টি নিয়ে বেশ আন্তরিক। যদি এ ধরনের সমন্বয় ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকে, তাহলে হয়তো আমরা চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে কর্মমুখী উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতে সক্ষম হব।










