শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা গ্রহণ করেন মাধ্যমিক স্তরে। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত সাত বছর ব্যয় করেন এ স্তরে। তবে অবৈতনিক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকায় এ স্তরের একদিকে যেমন ব্যয়বহুল অন্যদিকে এ স্তরে শিক্ষার মান নিয়েও রয়েছে বড় ধরনের সংকট।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, এ স্তরে প্রায় ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই বেসরকারি এবং শিক্ষার্থীদেরও প্রায় ৯২ শতাংশই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করেন। বর্তমানে এ স্তরে সাধারণ আলিয়া মাদ্রাসা কারিগরি ও ইংরেজি মাধ্যম—চার ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্টে দেখা গেছে, বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যয়ের ৭১ শতাংশ পরিবারগুলো বহন করে। প্রাইভেট পড়ানোর খরচের চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের গ্রামাঞ্চলের পরিবারগুলোর প্রাইভেট পড়ানোর খরচ ২০০০ সালের ২৮ থেকে বেড়ে ২০১০ সালে হয়েছে ৫৪ শতাংশ। এ খরচ শহরাঞ্চলে ৪৮ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৭ শতাংশ।
ইউনেস্কোর বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, অবৈতনিক শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশ। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার যেসব দেশে আইন কাঠামোর মাধ্যমে নির্দিষ্ট শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করেছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে শ্রীলংকা। দেশটিতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষাদানের বিধান রয়েছে। এছাড়া মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তানে প্রথম থেকে দ্বাদশ; কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও ভুটানে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দশম; তাজিকিস্তান ও ইরানে প্রাক-প্রাথমিক থেকে অষ্টম এবং ভারতে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষাদানের বিধান রয়েছে। বাংলাদেশে ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ব্যয়ের পাশাপাশি এ স্তরেও শিক্ষার মান নিয়েও রয়েছে বড় ধরনের সংকট।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিপরীতে বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার মানের একটি চিত্র উঠে এসেছিল বিশ্বব্যাংকের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্সের প্রতিবেদনে। এ ইনডেক্সে বাংলাদেশের সর্বশেষ ২০২০ সালের তথ্য রয়েছে। এ ইনডেক্স অনুযায়ী বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী ১০ বছর ২ মাস শিক্ষাজীবন শেষে অর্থাৎ একাদশ শ্রেণীতে যা শিখছে তা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ছয় বছরের অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণীর দক্ষতার সমান। ইনডেক্সের ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী ওই সময়ে বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী ১০ বছর ২ মাস শিক্ষাজীবন শেষে যে দক্ষতা অর্জন করত, তা ছিল আন্তর্জাতিক মানে ৬ বছর ৫ মাস বা সপ্তম শ্রেণীর দক্ষতার সমান।
হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্সের ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী ওই সময়ে বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী ১০ বছর ২ মাস শিক্ষাজীবন শেষে যে দক্ষতা অর্জন করত, তা ছিল আন্তর্জাতিক মানে ৬ বছর ৫ মাস বা সপ্তম শ্রেণীর দক্ষতার সমান। অর্থাৎ এ ইনডেক্সে বাংলাদেশের ক্রমেই অবনমন ঘটছে। অবনমনের চিত্র উঠে এসেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জাতীয় মূল্যায়ন প্রতিবেদন ২০২৩-এ। দেখা গেছে, ২০১৯ সালে অষ্টম শ্রেণীতে গণিতে ‘খারাপ’ শিক্ষার্থীর হার ছিল ২২ শতাংশের কিছু বেশি। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ শতাংশ। দশম শ্রেণীতে ২০১৯ সালে গণিতে খারাপ শিক্ষার্থীর হার ছিল ৬ দশমিক ৯ শতাংশ, যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ শতাংশে।
মাধ্যমিক স্তরে দক্ষ শিক্ষক, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধারও সংকট রয়েছে। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী মাধ্যমিক স্তরে গণিত ও ইংরেজি দুই বিষয়েই যেসব শিক্ষক মাধ্যমিক স্তরে ক্লাস নিচ্ছেন তাদের অর্ধেকের বেশিই উচ্চ মাধ্যমিকের পর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়েননি। এ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যালয়ে এখনো ল্যাব সুবিধা নেই ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা হাতেকলমে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হন। মাধ্যমিকের শিক্ষকরাও সুযোগ-সুবিধায় পিছিয়ে রয়েছেন।
বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে শিক্ষকদের বেতন বিবেচনায় বাংলাদেশ সমগ্র বিশ্বে নিচের দিকে অবস্থান করছেন। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ায়ও বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে। ২০২৫ সালে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার বাড়িভাড়া এবং চিকিৎসা ভাতা কিছুটা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিলেও সামগ্রিকভাবে শিক্ষকদের বেতন এখনো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম।
মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষায় সংকট আরো প্রকট হয়েছে অটোপাস ও শর্ট সিলেবাস। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের জেরে ২০২০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অটোপাস দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। আর ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা এবং উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে। সর্বশেষ শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে জুলাই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে স্থগিত হওয়া ২০২৪ সালের এইচএসসির পরীক্ষাগুলোয় অটোপাস দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয় পুনর্বিন্যাসকৃত সিলেবাস অনুযায়ী। বর্তমানে শর্ট সিলেবাস পদ্ধতি বাদ দেয়া হলেও শিক্ষক, অভিভাবকসহ শিক্ষার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে অটোপাস, সিলেবাস সংক্ষিপ্তকরণের মতো ঘটনা এরই মধ্যে শিক্ষার মানে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে। তাদের মতে রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি উপযুক্ত পরিকল্পনা করতে হবে এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।










