এ বছরের আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসের থিম ‘দ্য পাওয়ার অব ইয়ুথ ইন কো-ক্রিয়েটিং এডুকেশন’। আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা দর্শন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য আইইউবিএটির শিক্ষা দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষা কখনই একমুখী প্রক্রিয়া হতে পারে না। শিক্ষার্থীরা কেবল জ্ঞান গ্রহণকারী নয়; বরং শিক্ষা প্রক্রিয়ার সক্রিয় সহস্রষ্টা। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই আইইউবিএটি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণমূলক, বাস্তবমুখী ও মানবিক শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়ে আসছে। আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বগুণ, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তাকে আরো বেশি অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। কারিকুলাম উন্নয়ন, গবেষণা প্রকল্প, সামাজিক উদ্যোগ এবং উদ্যোক্তা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। আমরা বিশ্বাস করি, যুবশক্তির সহসৃজনশীল ক্ষমতাকে কাজে লাগাতে পারলেই একটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সব পর্যায়ে উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিতকরণে করণীয় কী? যেসব শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে তাদের মান কেমন?

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মানসম্মত শিক্ষকের অভাব একটি বাস্তব ও বহুল আলোচিত চ্যালেঞ্জ। বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি, গবেষণা সক্ষমতা ও নৈতিক মানদণ্ডসম্পন্ন শিক্ষক তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। এজন্য শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরো স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও যোগ্যতাভিত্তিক করতে হবে। আইইউবিএটিতে আমরা নিয়মিত শিক্ষক উন্নয়ন কর্মশালা, পেডাগোজিক্যাল ট্রেনিং এবং গবেষণা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করছি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সেমিনার ও কনফারেন্সে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মানের দিকে তাকালে দেখা যায়, বর্তমান প্রজন্ম প্রযুক্তি ব্যবহারে তুলনামূলকভাবে দক্ষ হলেও সমালোচনামূলক চিন্তা, বিশ্লেষণী দক্ষতা ও একাডেমিক লেখালেখিতে আরো উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আমরা ফাউন্ডেশন কোর্স, মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দিচ্ছি।

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থান উপযোগী করে গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ কী কী?

বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি ও শ্রমবাজারের সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমন্বয় করা। কেবল একাডেমিক জ্ঞান নয়, বরং সমস্যা সমাধান দক্ষতা, যোগাযোগ সক্ষমতা, দলগত কাজ এবং অভিযোজন ক্ষমতা আজকের কর্মবাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিল্প খাত ও একাডেমিয়ার মধ্যে কার্যকর সংযোগের অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের পর্যাপ্ত সুযোগ পায় না। আইইউবিএটি এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইন্ডাস্ট্রি-লিংকড কারিকুলাম, বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং এবং সফট স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করেছে।

মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের মানোন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনে আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ কী?

মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের মানোন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনের কোনো বিকল্প নেই। আইইউবিএটিতে গবেষণাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উৎসাহিত করতে গবেষণা তহবিল, জার্নাল প্রকাশনা এবং আন্তঃবিভাগীয় গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।

আমরা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যৌথ গবেষণায় উৎসাহিত করছি, যাতে গবেষণার ফলাফল বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে। উদ্ভাবনী চিন্তা বিকাশে ইনোভেশন ল্যাব, স্টার্টআপ সাপোর্ট এবং সামাজিক উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং উদ্যোক্তা হিসেবেও গড়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং, একাডেমিক এক্সচেঞ্জ ও যৌথ গবেষণায় বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনি মনে করেন?

আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক পরিচিতি বাড়াতে সহায়ক হলেও আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষার মান ও সামাজিক প্রভাব। তবে একাডেমিক এক্সচেঞ্জ, যৌথ গবেষণা ও বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করে।

আইইউবিএটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একাডেমিক এক্সচেঞ্জ ও যৌথ গবেষণায় যুক্ত রয়েছে। এসব সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা বৈশ্বিক মানদণ্ড সম্পর্কে অবগত হতে পারছি এবং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারছি।

ডিজিটাল লিটারেসি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে কারিকুলাম আধুনিকায়নে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে? বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন কোনো প্রোগ্রাম চালুর পরিকল্পনা আছে কি?

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে কারিকুলাম আধুনিকায়ন এখন অপরিহার্য। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডাটা অ্যানালিটিকস, অটোমেশন ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ভবিষ্যৎ কর্মবাজারকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।

আইইউবিএটিতে ডিজিটাল লিটারেসি, এআই এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাকে কারিকুলামের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন প্রোগ্রাম চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে।

আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও গবেষণার অন্যতম অনুষঙ্গ পিএইচডি প্রোগ্রাম। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ প্রোগ্রাম চালুর ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতা কী? কিংবা আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি চালুর মানদণ্ডে কতটা এগিয়ে আছে?

পিএইচডি প্রোগ্রাম একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগত সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ প্রোগ্রাম চালুর ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো পর্যাপ্ত গবেষণা অবকাঠামো, অভিজ্ঞ সুপারভাইজার এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন।

আইইউবিএটি ধাপে ধাপে গবেষণা অবকাঠামো, লাইব্রেরি, ল্যাব ও ফ্যাকাল্টি উন্নয়নের মাধ্যমে পিএইচডি প্রোগ্রাম চালুর মানদণ্ডে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য মানের সঙ্গে কোনো আপস না করে গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণ। আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শিক্ষা একটি চলমান সামাজিক বিনিয়োগ। যুবশক্তির সহসৃজনশীল ক্ষমতাকে কাজে লাগালে বাংলাদেশ একটি জ্ঞানভিত্তিক, ন্যায়ভিত্তিক এবং টেকসই সমাজ গঠনের পথে আরো এগিয়ে যেতে পারবে। আইইউবিএটি সেই লক্ষ্যেই তার শিক্ষা দর্শন, নীতি ও কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

শিক্ষার্থীরা কেবল শিক্ষার গ্রাহক নয়; তারা শিক্ষার সহস্রষ্টা, উদ্ভাবক, সমাজ গঠনের অংশীদার। আমাদের দায়িত্ব হলো তাদের সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী শক্তি এবং নেতৃত্বগুণকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিকশিত করা। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, গবেষণা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে আমরা একটি নতুন উচ্চশিক্ষার যুগের সূচনা করছি। বাংলাদেশের যুবশক্তি যখন শিক্ষার সহস্রষ্টা হয়ে উঠবে, তখন এক নতুন যুগের সূচনা হবে, যেখানে শিক্ষার ফলাফল শুধু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নয় বরং পুরো সমাজের জন্য প্রগতির সূচক হবে।