আপনার মতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী?

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সবার জন্য শিক্ষায় অভিগম্যতা নিশ্চিত করা। এখনো প্রাথমিক শেষ করে অনেক শিক্ষার্থী মাধ্যমিকে ঝরে পড়ে। এ অভিগম্যতার সংকট সবচেয়ে প্রকট হয়ে ওঠে প্রতিবন্ধী শিশু ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে। প্রতিবন্ধী শিশুদের অংশগ্রহণ ৫ শতাংশেরও নিচে। অনেক ক্ষেত্রে নাম লেখালেও তারা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না। আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে দুর্গম ভৌগোলিক বাস্তবতা ও নিরাপত্তা বড় বাধা। চর, হাওর, বাঁওড় ও চা বাগান এলাকার শিক্ষার্থীরাও বেশ পিছিয়ে। শুধু দারিদ্র্যের কারণে নয়, ভৌগোলিক ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণেও তারা শিক্ষার মূলধারায় আসতে পারছে না। অভিগম্যতার পরেই যে বড় চ্যালেঞ্জটি আসে, তা হলো সমতাভিত্তিক শিক্ষা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত তিনটি ধারায় বিভক্ত—ধর্মীয় শিক্ষা, ইংরেজি মাধ্যম ও মূলধারা। ধারাগুলোর মধ্যেই রয়েছে ব্যাপক বৈষম্য, আবার প্রতিটি ধারার ভেতরেও উপধারা তৈরি হয়েছে। ফলে এক ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা আরেক ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনাই করা যায় না। তৃতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো শিক্ষায় বিনিয়োগ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সর্বনিম্নে অবস্থান করছে! আমরা বড় বড় মেগা প্রকল্পে বিনিয়োগ করি, অনেক ক্ষেত্রে তার প্রয়োজনও আছে। কিন্তু মানবসক্ষমতা উন্নয়নই যে সব উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি, এ জায়গাটিতে আমরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছি। ফলে গার্মেন্টস খাতসহ উন্নয়নের নানা খাতে পরিচালনা-সম্পর্কিত উচ্চ পদগুলোতে বিদেশী জনবল আমদানি করতে হচ্ছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যে প্রয়োজনীয় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারছে না, এটি তার জাজ্বল্যমান উদাহরণ। ফলে বিপুলসংখ্যক যুবশক্তি একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার কাজে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষার মানকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

শিক্ষার মান আশানুরূপ নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরেই বহু গবেষণায় উঠে এসেছে। দক্ষ শিক্ষক সংকট, কাঠামোগত দুর্বলতা, সঠিক পরিকল্পনার ঘাটতিসহ বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকদের দক্ষতায় বৈষম্য বিদ্যমান, যেমন চরাঞ্চলের একজন শিক্ষক ও শহরের একজন শিক্ষকের দক্ষতা ও সুযোগ এক নয়। যত প্রশিক্ষণই দেয়া হোক, যদি কাঠামোগতভাবে তাকে শক্তিশালী করা না হয়, তাহলে তিনি মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারবেন না। এর প্রভাব সরাসরি পড়ে বোর্ড পরীক্ষার ফলাফলে। কিছু বোর্ড, যেমন সিলেট বোর্ড, প্রায় প্রতি বছরই তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকে। এর একটি বড় কারণ হলো বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি। মাধ্যমিক পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অন্য বিষয়ের শিক্ষককে দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে ক্লাস নেয়া হচ্ছে। এ ধরনের ব্যবস্থায় সমতা তো নিশ্চিত হয়ই না, মানও নিশ্চিত হয় না। আরেকটি বড় বিষয় হলো অভিভাবকদের ভূমিকা। বাস্তবে অভিভাবকদের আমরা প্রায় গুরুত্বই দিই না। হঠাৎ করে বৃত্তি পরীক্ষা চালু করা, আবার বাতিল করা, হঠাৎ করে নতুন কারিকুলাম চাপিয়ে দেয়া—এসব সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে অভিভাবকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয় না। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক উভয়ই বিভ্রান্ত হয়, যা অত্যন্ত অন্যায় এবং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তাদের শিখন ফলেও।

কভিড-পরবর্তী সময়ে শিক্ষাবৈষম্য কতটা বেড়েছে বলে আপনার পর্যবেক্ষণ? এ বৈষম্য কাটিয়ে উঠতে কী ধরনের হস্তক্ষেপ জরুরি?

কভিডের সময় শিক্ষা ব্যবস্থার সব দুর্বলতা একসঙ্গে সামনে চলে এসেছে। অটো প্রমোশন দেয়া হয়েছে, অনলাইন শিক্ষার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সবাই সমান সুযোগ পায়নি। অনেক শিক্ষার্থীর স্মার্টফোনই ছিল না, ইন্টারনেট তো দূরের কথা। তখন অভিগম্যতা আরো নিচে নেমে গিয়েছিল। আর এ সংকট সরাসরি শিক্ষার মানের সঙ্গেও যুক্ত। কভিড-পরবর্তী সময়ে আমরা মানের একটি বড় ঘাটতির মধ্যে পড়েছি, যার প্রভাব এখনো কাটেনি। এ বৈষম্য কাটিয়ে উঠতে সবচেয়ে জরুরি হলো সঠিক পরিকল্পনা ও লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ। সব জায়গায় একইভাবে কাজ করা সমীচীন নয়। মহানগরভিত্তিক কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা বাইরে গিয়ে আমাদের বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন যে, মহানগরে যেমন আর্থিকভাবে সচ্ছল অনেক পরিবার রয়েছে, আবার অনেক দরিদ্র পরিবারও রয়েছে। এসব নিম্নবিত্ত, দরিদ্র পরিবারের কেউ কেউ হয়তো বস্তিতে থাকছে, আবার কেউ একেবারেই ভাসমান। তাদের কথা আমাদের ভাবতে হবে। আবার চর, হাওর বা চা বাগান এলাকায় প্রয়োজন মহানগর এলাকার তুলনায় ভিন্ন। কোথায় কতটা প্রয়োজন, সেটা নির্ধারণ করে পরিকল্পনা করা জরুরি। ঢালাও পরিকল্পনার বদলে চাহিদাভিত্তিক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া শিক্ষায় ক্রমবর্ধমান বৈষম্য কমানো সম্ভব নয়।

কার্যকর সাক্ষরতা ও জীবনমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতে কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন?

এখন আর শুধু নামমাত্র সাক্ষরতা যথেষ্ট নয়। ইউনেস্কোর সংজ্ঞা অনুযায়ী কার্যকর সাক্ষরতা বলতে বোঝায় পড়া, লেখা ও মৌলিক গণনা করার দক্ষতা অর্জন করা। এক্ষেত্রেও আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। বিশেষ করে যেখানে পাঁচজনের একজন এখনো পড়তে-লিখতে পারে না, সেখানে এর প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে যায়। বাবা-মা যদি শিক্ষিত না হন, সন্তানের শিক্ষাও বাধাগ্রস্ত হয়। আরেকটি বড় দুর্বলতা

হলো আমরা শিক্ষাকে জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া হিসেবে দেখি না। প্রাথমিক, মাধ্যমিক বা উচ্চশিক্ষায় ভাগ করে দেখি, কিন্তু জীবনদক্ষতা ও কর্মদক্ষতার বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায় না। সাক্ষরতার হার বাড়ানোর জন্য আমরা কিছু প্রকল্প অবশ্য নিয়েছিলাম এবং সেগুলোর কারণে সাময়িক অগ্রগতিও হয়েছিল। তবে এ অগ্রগতি দীর্ঘমেয়াদি হয়নি। কারণ টেকসই অগ্রগতির জন্য আমাদের এসব বিষয়ে প্রকল্প নয়, সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটি করা হয়নি। যদি কার্যকর সাক্ষরতা ও জীবনমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতে চাই তাহলে পরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

এসডিজি-৪ অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতি নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?

এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ করোনা-পরবর্তী সময়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে পিছিয়ে পড়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কমেছে, যা উদ্বেগজনক। সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে এসডিজি ৪-এর কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায়। এখানে কাঙ্ক্ষিত সংখ্যায় শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি এবং শ্রমবাজার উপযোগী জীবনদক্ষতা উন্নয়নও যথাযথভাবে হচ্ছে না। এছাড়া এ খাতে নারীদের অংশগ্রহণ লজ্জাজনক হারে কম থাকছে, যা জেন্ডার গ্যাপকে আরো স্পষ্ট করে তুলছে। এছাড়া এসডিজি ৪-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান জীবনব্যাপী শিক্ষা বা লাইফ-লং লার্নিংয়ের ক্ষেত্রেও আমরা পিছিয়ে আছি। এখানে শুধু সাক্ষরতা নয়, সাক্ষরতার সঙ্গে জীবনদক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা সীমিত কয়েকটি প্রকল্পের মধ্যেই আটকে আছে। প্রকল্পভিত্তিক এসব উদ্যোগ টেকসই নয়; প্রকল্প শেষ হলে কার্যক্রমও থেমে যায়। ফলে এসডিজির এ লক্ষ্য অর্জনে কাঠামোগত ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচিভিত্তিক উদ্যোগ ছাড়া অগ্রগতি কঠিন।

সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। শিক্ষা খাতকে রাজনৈতিক দলগুলো কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে করেন?

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নানা কমিশন গঠন করেছিল, কিন্তু শিক্ষা খাতে তারা কোনো কমিশন করেনি। পরবর্তী সময়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার দুই মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি করে পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু এ কমিটি দুটি প্রতিবেদন দেয়ার পরও তা যথাযথভাবে কার্যকর করা হয়নি। এ সরকারের উচিত ছিল শিক্ষা ও সমতানির্ভর শিক্ষাকে আরো গুরুত্ব দেয়া। অন্তত নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করা যেত, যা তারা করেনি। এটি করা হলে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব হতো। এছাড়া সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সব নাগরিকের জন্য মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত করা, কিন্তু শিক্ষাকে নাগরিক অধিকার হিসেবে স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। বর্তমানে আমরা শুনছি শিক্ষা কার্ড চালু করা হবে, বৃত্তি বাড়ানো হবে এবং নানা উদ্যোগ নেয়া হবে। তবে নারী, পুরুষ, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সমতাভিত্তিক শিক্ষার বিষয়গুলো এখনো সুস্পষ্ট নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রত্যাশা থাকবে যারাই নির্বাচিত হোক তারা যেন শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে সর্বজনীন, মানসম্মত ও জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করে। অন্তত প্রথম ধাপেই শিক্ষায় বাজেট বৃদ্ধি এবং অন্তত অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ শিক্ষা একটি রাষ্ট্রের ভিত্তি; শিক্ষাকে গুরুত্ব না দিলে রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।