শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে শিল্প খাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
আমাদের এগুলো নিয়ে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আছে। আমরা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে আসলে অনেক প্রকল্প হাতে নিয়েছি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইউএনডিপির সঙ্গে একটি যৌথ প্রকল্প, যেখানে আমাদের হাজারখানেক ছাত্র-ছাত্রী অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছে। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আমাদের সিসিডিসি (ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং) এবং অফিস অব দি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স—অনেক বেশি তৎপর। ছাত্রদের জন্য বৃত্তি ব্যবস্থা করা, বৃত্তির পরিমাণ বাড়ানো, বৃত্তির মূল্যমান বাড়ানো প্রতিটি খাতে আমাদের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ আছে। গ্র্যাজুয়েট লেভেল থেকে শুরু করে এমফিল, পিএইচডি পর্যন্ত গবেষণা বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়ে আমাদের সব কাজ শেষের দিকে। সব মিলিয়ে বড় ধরনের একটা পরিবর্তন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হচ্ছে এবং খুব তাড়াতাড়ি সবাই এর সুফল পাবে।
শিক্ষার্থী রাজনীতি, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও একাডেমিক পরিবেশ তিনটার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় আপনারা কোন বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছেন?
এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। তিনটা বিষয়ের ভেতরে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে আমরা বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ছি। আমি নিজের জায়গা থেকে উপলব্ধি করি, ঠিক যেভাবে ৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রেক্ষাপটকে উপলব্ধি করা দরকার ছিল, আমরা কেউই সেটা খুব ভালোভাবে করতে পারিনি। যে ধরনের পজিটিভ মাইন্ডসেট, সহানুভূতি, সুবিচারের ধারণা এবং শিক্ষাদীক্ষা ও জ্ঞান থাকা প্রয়োজন ছিল, সেটার পরিচয় আসলে বাংলাদেশের কোনো সেক্টরেই আমি দেখতে পাইনি। আমরাও কাজ করতে গিয়ে পদে পদেই চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ছি এবং সবকিছু সুশৃঙ্খল রাখার কাজটা, ইতিবাচক পরিবর্তন নিশ্চিতের বিষয়টা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান কতটা সন্তোষজনক বলে মনে করেন এবং একাডেমিক মান ও গবেষণা সক্ষমতা বাড়াতে আপনার মেয়াদে কোন কোন সংস্কার বা উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে?
আন্তর্জাতিক মান সম্পর্কে আমাদের যাদের ধারণা আছে, তারা সবাই বুঝতে পারি উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক মানে আমাদের দেশ অনেক পিছিয়ে আছে। এর ভেতরে অনেক কারণ আছে। আমরা সবসময় বাজেটের কথা বলি। বাজেটটা একটা প্রধান কারণ। বিশ্ববিদ্যালয় হলো মেধার বিকাশ ঘটানোর জায়গা। আমাদের উচ্চশিক্ষা খাতে একটি বড় সমস্যা হচ্ছে নিয়োগ পদ্ধতি। আমি যদি একটু ঢালাওভাবেই বলি, গত দশকগুলোয় শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতিকে নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। লেখাপড়ার পরিবেশ, ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য প্রণোদনা এসব জায়গায়ও ব্যাপক ঘাটতি আছে। আমরা প্রত্যেকটা জায়গায়ই অল্প সময়ে হাত দেয়ার চেষ্টা করেছি। বিশেষত মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত, স্বচ্ছ নিয়োগ ও গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধিতে আমরা বেশ গুরুত্ব দিয়েছি। জ্ঞাতভাবে, আমার জানা অবস্থায় শিক্ষক নিয়োগে কোনো ধরনের অস্বচ্ছতার সুযোগ আমি দিইনি। আমি মনে করি স্বচ্ছভাবে শিক্ষক নিয়োগ একটা বড় চ্যালেঞ্জ এবং এখন পর্যন্ত আমরা সে চ্যালেঞ্জ সফলভাবেই উতরানোর চেষ্টা করছি। আরেকটি বিষয় গবেষণা। গবেষণা বরাদ্দ আগের বছরগুলোর তুলনায় সব জায়গায়ই বেড়েছে। কোথাও কোথাও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেড়েছে। আমাদের সময়ে শিক্ষকদের প্রায় ১০ বছর ধরে আটকে থাকা পিএইচডি ইনক্রিমেন্ট চালু করেছি। আর্টিকেল পাবলিকেশনের জন্য প্রণোদনা দেয়া শুরু করেছি। বহু শিক্ষক এরই মধ্যে পেয়েছেন। এপিসির জন্য বরাদ্দ আছে, বিভিন্ন কনফারেন্সে অংশগ্রহণের জন্য বরাদ্দ আছে। এটা শুধু শিক্ষকদের জন্য না, ছাত্রদের জন্যও। রাকসু ইলেকশনসহ যে কাজগুলো যুগে যুগে হয়নি, আমরা অল্প সময়ে করার চেষ্টা করেছি।
বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কেমন দেখছেন এবং শিক্ষা সংস্কারে আপনার সুপারিশ কী থাকবে?
আমি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে মোটেই ভালো অবস্থানে দেখছি না। এটা আমার নিজের উপলব্ধির বিষয় না। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যতগুলো মাপকাঠি আছে, সেগুলো নিয়ে যদি আমরা কথা বলি, তাহলে কোনো মাপকাঠিতেই আমাদের শিক্ষার মান ভালো—এ কথা বলার কোনো সুযোগ নেই। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গায় আমরা পিছিয়ে আছি। আমাদের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা তরুণরা। আমরা যদি তাদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত না করতে পারি, তাহলে সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাবে। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি যেটা মনে করি, প্রথমে আমাদের খুব অকপটে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং একটা জিনিস উপলব্ধি করতে হবে—এর কোনো দ্রুত সমাধান বা সহজ সমাধান নেই। আমরা ভাবি, একটা মিটিংয়ে বসলাম, কিছু সিদ্ধান্ত নিলাম, বাংলাদেশের শিক্ষা ঠিক হয়ে যাবে; না তেমনটা নয়। আমাদের সরকার ও নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। পাঁচ বছর নয়, ১০ বা ১৫ বছর যদি সুপরিকল্পিতভাবে নিবেদিতভাবে কাজ করা যায়, তাহলে হয়তো আমাদের এখন যে অধোগতি, সেটাকে ঠেকানো সম্ভব হবে। এখানে যারা এগুলো বোঝেন, জানেন তাদের একসঙ্গে বসে রাজনীতিকে বা কোনো বয়ানকে সামনে না রেখে দেশকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। এটা না করলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত না করা গেলে আমাদের সব সম্ভাবনা বোধহয় অঙ্কুরেই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
I সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বণিক বার্তা প্রতিনিধি, রাবি










