উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে মানসম্মত শিক্ষাদান ও ফলাফলে নটর ডেম কলেজ সবসময়ই সামনের সারিতে থাকে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় আপনাদের ব্যতিক্রমগুলো কী?

কিছু বিষয়ে আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খুব গুরুত্ব দিয়ে থাকি। প্রথমটি হলো শৃঙ্খলা। শিক্ষার্থীরা যাতে ঠিক সময়ে কলেজে আসে এবং প্রতিটি ক্লাসে অংশগ্রহণ করে এটা আমরা নিশ্চিত করি। অসুস্থতা বা অন্যান্য যৌক্তিক বিষয় বিবেচনা করে ১৫ শতাংশ ছাড় দেয়া হয়, তবে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ন্যূনতম ৮৫ শতাংশ উপস্থিতি অবশ্যই বাধ্যতামূলক। দ্বিতীয়টি হলো, ক্লাসে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস শেষ করা। কেবল পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য নয়, বরং শিক্ষার্থীরা যেন বিষয়টি গভীরভাবে বুঝতে পারে এবং ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষায় সেই জ্ঞান কাজে লাগাতে পারে সেই লক্ষ্যে আমরা পাঠদান করি। তৃতীয়ত, আমরা একাডেমিক পড়ালেখার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকি। নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা ও মানবিক গুণাবলি বিকাশে বিজ্ঞান, পরিবেশ ও সংস্কৃতিভিত্তিক বিভিন্ন ক্লাবের মাধ্যমে সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এছাড়া নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ওপর মাসে এক-দুইটা ক্লাস নেয়া হয়। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আমরা কেবল শিক্ষিত নয়, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন দক্ষ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করি। গাইডেন্স অ্যান্ড কাউন্সেলিং বিভাগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, পড়াশোনার অগ্রগতি ও নিয়ম-শৃঙ্খলা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। প্রয়োজনে অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করা হয়, কারণ আমরা মনে করি শিক্ষা একটি যৌথ প্রক্রিয়া। এখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণও অত্যন্ত জরুরি।

পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কোন কোন বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেন এবং কোন বিষয়গুলো নিরুৎসাহিত করা হয়?

আমরা শিক্ষাকে কেবল ক্লাসরুমে সীমাবদ্ধ রাখি না। শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পাশাপাশি সামাজিক ও শারীরিক বিকাশে গুরুত্ব দিই। ক্লাব কার্যক্রম এবং খেলাধুলার সুযোগের মাধ্যমে তাদের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ নিশ্চিতের চেষ্টা করি। আমরা প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে উৎসাহিত করি। আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, লক্ষ্য স্থির থাকলে পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ে। নটর ডেমের শিক্ষার্থীরা সাধারণত পরিশ্রমী হয় ও জীবনের নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে।

আর নিরুৎসাহিত করার জা য়গায় প্রথমেই আছে সময়ের অপচয়। ক্যাম্পাসে মোবাইল ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোচিং নির্ভরতাও আমরা নিরুৎসাহিত করি, কারণ সম্পূর্ণ সিলেবাস কলেজেই পড়ানো হয়। কোচিং সেন্টারগুলো অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় ভয় তৈরি করে, যা শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করে। বাস্তবে দেখা যায়, বোর্ড পরীক্ষার প্রশ্ন আসে কলেজে পড়ানো বিষয় থেকেই। এছাড়া যেকোনো দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার বিষয়েও আমরা নিরুৎসাহিত করি। শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতা থাকবে কিন্তু তারা যেন এ সময়ে দলীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে না পড়ে। কারণ আমরা মনে করি ছাত্রজীবনে পড়ালেখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এ সময়ে তারা যদি অন্য নানা বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে তখন পড়ালেখায় মনোযোগ নষ্ট হয়।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার মান কমেছে। নটর ডেম কলেজে সারা দেশ থেকেই শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। এ বিষয়ে আপনাদের পর্যবেক্ষণ কী?

শিক্ষার মান নির্ণয়ের প্রশ্নটি জটিল। আমরা কোন পদ্ধতিতে শিক্ষার মান বুঝব সেটি একটি বড় প্রশ্ন। শুধু ফলাফল দিয়ে মান বিচার করা যায় না। আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, গ্রামাঞ্চল থেকে আসা শিক্ষার্থীদের বেসিকে কিছু দুর্বলতা থাকে—কারণ সেখানে ভালো শিক্ষক, ল্যাব বা শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের অভাব আছে। এ কারণে নটর ডেমে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম তিন থেকে ছয় মাস আমরা তাদের বেসিক মজবুত করার ওপর জোর দিই। এরপর তারা দ্রুত উন্নতি করে।

পাঠদান পদ্ধতি ও শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আপনারা কোন বিষয়গুলো বিবেচনা করেন?

আমাদের পাঠদান পদ্ধতির মূল কথা হলো ধারাবাহিক মূল্যায়ন। প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত কুইজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যা পড়ছে, তা আত্মস্থ করছে কিনা সেটা নিশ্চিত করা হয়। সিলেবাস শেষ না করে আমরা কোনো শিক্ষার্থীকে বোর্ড পরীক্ষায় পাঠাই না। এছাড়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য ল্যাব ক্লাস করা বাধ্যতামূলক। কেউ ল্যাব ক্লাস মিস করলে তাকে অবশ্যই পরবর্তীতে মেকআপ ল্যাব ক্লাস করে নিতে হবে।

শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কেবল ভালো ফলাফল নয়, বরং আন্তরিকতা, মানবিকতা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি ভালোবাসাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। অনেক শিক্ষকই আমাদেরই প্রাক্তন শিক্ষার্থী, যারা আমাদের শিক্ষা পদ্ধতিকে ভালোভাবে বোঝেন। আমরা চাই, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যাত্রাটা হোক সহযাত্রী হিসেবে। শিক্ষকরা ক্লাসরুমের বাইরেও শিক্ষার্থীদের পাশে থাকুক, সহযোগিতা করুক।

আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলো বলছে, গুণগত শিক্ষায় বাংলাদেশ পিছিয়ে। গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতে সরকারের করণীয় কী?

প্রথমত, সরকারকে একটি সুস্পষ্ট শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে হবে এবং তার কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কোনো ধরনের দুর্নীতি থাকা চলবে না—কারণ শিক্ষায় দুর্নীতি মানে জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংস। শিক্ষার্থীদের ক্লাসমুখী করা অত্যন্ত জরুরি। নির্দিষ্ট উপস্থিতি নিশ্চিত না হলে বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ না দেয়ার মতো সিদ্ধান্তে সরকারের হস্তক্ষেপ না করে বরং সমর্থন দেয়া উচিত। পাশাপাশি কলেজ পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় রাজনীতিমুক্ত রাখা প্রয়োজন।

নটর ডেম কলেজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আপনার বার্তা কী?

আমাদের শক্তির জায়গা দক্ষ, প্রাণবন্ত শিক্ষকরা। পরিকল্পনার জায়গায় বলতে চাই, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও গুণগত উন্নয়নে আমরা আরো জোর দেব, যাতে নটর ডেম কলেজের ৭৫ বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখে সামনে এগোনো যায়। আমাদের লক্ষ্য শুধু ভালো ফলাফল নয়, বরং এমন শিক্ষার্থী তৈরি করা, যারা দেশ ও দেশের বাইরে দক্ষতা, মূল্যবোধ ও মানবিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবে। আর শিক্ষার্থীদের প্রতি আমার বার্তা একটাই—এ সময়টা তোমাদের জীবন গঠনের সময়। লক্ষ্য স্থির করো, পরিশ্রম করো, শর্টকাটের পথে যেয়ো না। জীবনে সফল হতে হলে ত্যাগের কোনো বিকল্প নেই। যত বেশি পরিশ্রম করবে, ত্যাগ করবে সাফল্য তত বেশি আসবে।