চাকরি জীবনে কেউ না কেউ কারো না কারো প্রিয় বা অনুসরণীয় হয়ে পড়েন এটা স্বাভাবিক। আমরা যখন সিভিল সার্ভিসের বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেছি, তখন কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান একটি ফরমেটের মাধ্যমে আমাদের অনুসরণীয় কর্মকর্তার নাম জানতে চাইত। আবার আমরা যারা পরে নিজেরাই জুনিয়রদের ক্লাস নিয়েছি, তখন আমাদের কারা অনুসরণ করে তা-ও জানতে চেয়েছে দেখেছি। আমি আমার চারজন সচিবকে এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতাম—(১) মো. কেরামত আলী, (২) সৈয়দ শামীম আহসান, (৩) মোহাম্মদ আলী (নরসিংদী) ও (৪) ড. আকবর আলি খান। এ চারজনের অধীনে (সৈয়দ শামীম আহসানের ভাষায়, সঙ্গে) আমি কাজ করেছি; তারা আমার বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনও লিখেছেন। মো. কেরামত আলীর সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে, সৈয়দ শামীম আহসানের সঙ্গে তত্কালীন সেচ, পানি উন্নয়ন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বিভাগে, মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে তত্কালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে, যমুনা বহুমুখী সেতু কর্তৃপক্ষে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে, ড. আকবর আলি খানের সঙ্গে তত্কালীন সেচ, পানি উন্নয়ন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বিভাগে। আমি যখন তাদের অধীনে/সঙ্গে কাজ করেছি, তখন মো. কেরামত আলী মন্ত্রিপরিষদ সচিব আর আমি চাকরিতে যোগদানের পর শাখাপ্রধান (বর্তমানে সহকারী সচিব); সৈয়দ শামীম আহসান ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব (বর্তমান পদবি ভারপ্রাপ্ত সচিব) আর আমি শাখাপ্রধান; মোহাম্মদ আলী যথাক্রমে অতিরিক্ত সচিব, ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব, নির্বাহী পরিচালক এবং সচিব আর আমি যথাক্রমে শাখাপ্রধান/সহকারী সচিব, সিনিয়র সহকারী সচিব, অতিরিক্ত পরিচালক এবং উপসচিব; কিন্তু ড. আকবর আলি খান উপসচিব আর আমি শাখাপ্রধান। আরো অনেক সচিব/কর্মকর্তার অধীনে কাজ করেছি, তারাও পরে কমবেশি সবাই উচ্চপদে আসীন হয়েছেন, অনেকে সচিবও হয়েছেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে বিশেষত তাদের দক্ষতা, জ্ঞানের গভীরতা, সিদ্ধান্ত প্রদানের দ্রুততা এবং সঠিকতা, জুনিয়র সহকর্মীদের সঙ্গে ব্যবহারের মাত্রা, জুনিয়রদের ভুলভ্রান্তি ধরিয়ে দিয়ে শেখানোর আগ্রহ, তাদের সুবিধা-অসুবিধায় সহমর্মী হওয়ার আন্তরিকতা ইত্যাদি বিবেচনায় আমার নিকট এ চারজনই আমার প্রিয় বা অনুসরণীয় মনে হয়েছে।

ড. আকবর আলি খানের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় আমার চাকরির প্রথম দিকে, তিনিও তখন উপসচিব হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে এবং আমিও শাখাপ্রধান হিসেবে। তখন আমি সরাসরি কিন্তু তার অধীনে নই, তিনি উন্নয়ন অধিশাখার উপসচিব, ডেভেলপমেন্ট বোর্ডগুলো দেখতেন, মো. মহবুবউজ জামান তখন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদ আমার উপসচিব। প্রথম সিভিল সার্ভিসে এলে যেসব আগ্রহ অনেকের হয়তো থাকে, আমারও তখন অনেক আগ্রহের মধ্যে একটি ছিল সিভিল লিস্ট থেকে ওপরের অফিসারদের জন্মতারিখ, চাকরির ব্যাচ, নিজ জেলা ইত্যাদি জানার। এটা জানতে গিয়েই দেখি যে মো. কেরামত আলী চাকরিতে প্রবেশই করেছেন আমার জন্মেরও বছর তিন আগে, তিনি ১৯৪৯ ব্যাচের সিএসপি আর আমার জন্ম ১৯৫২। ভাবলাম, আমার কী সৌভাগ্য যে আমি চাকরির শুরুতেই আমার জন্মের আগে চাকরিতে যোগ দেয়া অফিসারের সঙ্গে কাজ করতে পারছি। কেরামত আলীর জন্ম পটুয়াখালী জেলায় ১-১-১৯২৬। খুঁজতে গিয়ে দেখি ড. আকবর আলি খানের জন্ম ২-৮-১৯৪৪ কুমিল্লা জেলায়, বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া। তিনি সিএসপি ১৯৬৭ ব্যাচের, পরে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দুই বছরের অ্যান্টিডেটেড সিনিয়রিটি পাওয়ায় তার যোগদানের তারিখ ১৬-১০-১৯৬৫ হয়েছে। তাদের ব্যাচের বাংলাদেশী অফিসারদের মধ্যে শাহ্ মোহাম্মদ ফরিদ, মামুন উর রশীদ, কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ রেজাউল হায়াতও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দুই বছরের এ সিনিয়রিটি পেয়েছেন অথচ আবদুল হামিদ চৌধুরী এবং আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী ১৬-১০-১৯৬৭ যোগদানের জ্যেষ্ঠতায়, মুক্তিযোদ্ধা সিনিয়রিটিতে ১০-১০-১৯৬৯ যোগদানকারী ১৯৬৯ ব্যাচের ড. সা’দত হুসেইনের জ্যেষ্ঠতা ১০-১০-১৯৬৭ এরও পেছনে পড়ে যান। চাকরিতে এসব মেনে না নিয়ে উপায় নেই।

অনেক চেষ্টার পর সৈয়দ শামীম আহসানের আগ্রহে যখন আমি বর্তমান পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৩ যোগদান করলাম, তখন দেখি এ ড. আকবর আলি খান এখানে উপসচিব। শাখায় পদায়নের পর তিনি আমার সরাসরি উপসচিব অর্থাৎ তার অধীনেই আমি কাজ করা শুরু করলাম। শামীম সাহেবের পিএস থাকতে অনাগ্রহী হওয়ার পর ড. আকবর আলি খানের অধীনে পদায়ন তারই ইচ্ছায় কিনা আজও জানতে পারিনি। তবে তিনি আমাকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করলেন। বললেন, বদিউর, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে রেগুলেটরি কাজ করেছেন, এখানে ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কে নতুনত্ব পাবেন, আপনার ভালো লাগবে। তার এ কথাগুলোর মধ্যে আন্তরিকতার ছোঁয়া আমি অনুভব করলাম, আমার ভালো লাগল। সরাসরি কাজ করতে গিয়েই আমি এ প্রথম টের পেলাম যে স্যার কত প্রজ্ঞার অধিকারী, বিষয়ের কত গভীরে যান, ঠিক রেলওয়ের টিকিটচেকার যেভাবে অনায়াসেই বিনা টিকিটিকে চিনে ফেলেন, ইনিও দেখি নথিতে পেশকৃত প্রস্তাবের ত্রুটি কোথায় তা চটজলদি ধরে ফেলেন। তবে অবাক হলাম, স্যার আমি যা ধরতে পারতাম না, এজন্য বকাঝকা করতেন না, ধীরস্থিরভাবে বিষয়টি বুঝিয়ে দিতেন। মূলত ১৯৬৭ থেকে হিসাব করলেও তাদের তখন চাকরির বয়স ১৬ বছরে, অথচ তাদের যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি, তাদের সিএসপিদের নিয়মে, বিলম্বিত হচ্ছে মর্মে তাদের ধারণা। তারা এ নিয়ে একটু হতাশও ছিলেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে আমাকে তড়িঘড়ি রিলিজ করানোর সময়ে সৈয়দ শামীম আহসান কাজী রকিবউদ্দীনকে আমার রিলিজ প্রস্তাব যেন হাতে হাতে নাসিমউদ্দিন আহমদ থেকে (তখন অতিরিক্ত সচিব) অনুমোদন করিয়ে নেন তা বলার সঙ্গে সঙ্গে এটুকু বললেন, শফিউল আজম সাহেবের নিকট তোমাদের পদোন্নতির বিষয়টি যে আলোচনা করব তা মনে থাকে যেন। হ্যাঁ, দক্ষতায় ড. আকবর আলি খান এত উচ্চ পর্যায়ের তখনই ছিলেন যে তিনি তখনই মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের দায়িত্বই শুধু পালন করতেন না, সৈয়দ শামীম আহসানের অনুপস্থিতিতে তিনি উপসচিব হয়েও ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্বও পালন করতেন। তাদের সময়ে তো যুগ্ম সচিবও মন্ত্রণালয়/বিভাগের ভারপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব অর্থাৎ সচিবের দায়িত্ব পেতেন। একটি অপ্রিয় সত্য কথা বলতে হয়, পাকিস্তানি তিন অক্ষরী সাহেবরা সিভিল সার্ভিসের যে মজা উপভোগ করেছেন তা এখন তো ভাবাই যায় না। তবে এটা অনস্বীকার্য, তাদের যৎসামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া, নিজে কাজ করার এবং কাজ আদায় করে নেয়ার দক্ষতা ও কৌশল অনস্বীকার্য। এর কারণও বোধ করি তাদের কম সংখ্যায় নিয়োগ, ভালো প্রশিক্ষণ, অঢেল সুযোগ-সুবিধা, দ্রুত পদোন্নতি ইত্যাদি তাদের ভিন্নমাত্রার উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের তখনকার রেওয়াজে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত টেন্ডার অনুমোদনের ক্ষমতা। তার ওপরে হলে মন্ত্রণালয়ে আসত। যতটুকু মনে পড়ে, ৫ কোটি টাকার ওপরে হলে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে প্রেরণ করতে হতো। একটি টেন্ডার অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে এল। সরবরাহকারীর এক বাংলাদেশী এজেন্ট লিরা এবং ডয়েটস মার্ক দুই মুদ্রায় দুই প্রিন্সিপাল থেকে দুটি অফার দিলেন। তার একটি অফার মূল্যায়নে সর্বনিম্ন হলো এবং তাকেই অনুমোদন দেয়া স্থির হলো। এমন পর্যায়ে সে অন্য মুদ্রার অফারে এ দর থেকেও কমে দেয়ার একটা আবেদন করে বসল। আমি তো বিষয়টির কোনো কূলকিনারা করে উঠতে পারছিলাম না। এ পর্যায়ে প্রস্তাবই বা বদলাব কীভাবে, একমাত্র যুক্তি পূর্বমূল্য থেকে বর্তমান মূল্য আরো কম ছাড়া তো অন্য কারণ দেখা যায় না। স্যারের কাছে সমাধান চাইলাম। অবাক হলাম, ড. আকবর আলি খান বললেন, স্থানীয় এজেন্টের কাছে ইতালীয় প্রিন্সিপাল বা জার্মান প্রিন্সিপাল বড় বিবেচ্য নয়, তার বিবেচ্য হচ্ছে, তার মোট কমিশন। বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়ে তাই প্রথম দরপত্র প্রদানের সময়ে এবং এখনকার প্রস্তাবের সময়ে লিরা এবং ডয়েটস মার্কের বিনিময় হারের পার্থক্য জেনে নিন, দেখুন কখন তার কমিশন বা লাভ-ক্ষতি কোন পর্যায়ে যায়। থলের বিড়াল বেরিয়ে গেল, স্যারের মেধায় আমি থ বনে গেলাম। আমরা অবশ্য রীতিবহির্ভূত হিসেবে দরপত্রদাতার পরবর্তী অফার বিবেচনায় নিইনি। এই যে বিষয়ের গভীরে গিয়ে কারণ বের করতে পারা এটা মেধা ও অভিজ্ঞতার বিকল্পে কী হতে পারে?

জীবনে প্রথম বিদেশ যাওয়া আমার দক্ষিণ কোরিয়া, ১৯৮৩, তা-ও ৯ দেশের প্রায় ৩০ জনের এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে—ইরিগ্রেশন ও ড্রেনেজের ওপর। মধ্যম ও উচ্চ পর্যায়ের কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, প্রধান প্রকৌশলী, নিদেনপক্ষে নির্বাহী প্রকৌশলী হতে হবে প্রার্থীদের। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন থেকে তেমন পদবির মনোনয়নই দেয়া হলো। সৈয়দ শামীম আহসান এ সেমিনারে আমাকেও প্রস্তাব করলেন। আমি তো ভয়ে না যেতেই আগ্রহী, একে তো জেনারেলিস্ট তদুপরি চাকরির বয়স মাত্র চার বছর পেরোল। উপদেষ্টা এজেডএম ওবায়দুল্লাহ খানের নিকট নথি গেলে তিনি ধরে বসলেন। শামীম সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন আমাকে কেন মনোনয়ন দেয়া হলো। তিনি জবাব দিলেন আইডা, সিডা, ইফাদ এবং জাপানের অর্থপুষ্ট প্রকল্পগুলো আমি ছয় মাস বেশ দক্ষতায় দেখেছি, অতএব আমি পারব। ডাক পড়ল ড. আকবর আলি খানেরও। স্যার জবাব দিলেন তার সঙ্গে আলাপ করেই তো সৈয়দ শামীম আহসান আমায় মনোনয়ন দিয়েছেন। আমি পরে উপদেষ্টার একান্ত সচিব আবদুল কাদির মাহমুদ ভাই থেকে বিস্তারিত জেনেছিলাম। সেদিন ড. আকবর আলি খান যদি জোরালোভাবে আমার পক্ষে না বলতেন, তাহলে উপদেষ্টার হয়তো ভিন্ন চিন্তাও হতে পারত। আমার উপদেষ্টার সঙ্গে ইন্টারভিউয়ের সময় তার কক্ষে উপস্থিত খালেদ শামসের আমার সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্যও সোনায় সোহাগা হয়েছিল। সেমিনার শেষে দেয়া আমার বক্তৃতা এডিসি, কোরিয়ার বার্ষিক ম্যাগাজিনে আমার ছবিসহ কোরিয়ান ভাষায় ছাপা হয়েছিল। আমি স্যারদের মুখ রক্ষা করতে পেরেছি।

আমার বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন আনতে গেলাম ড. আকবর আলি খানের পুরানা পল্টনের বাসায়। তার বাসার কাছেই ছিলেন তখন ড. ফসিহউদ্দিন মাহতাব—সে হিসেবে খুঁজে পেতে বেশি কষ্ট হয়নি। স্যার বললেন, বদিউর, আমি আপনাকে ১০০ থেকে ৩ নম্বর কম দিয়ে রাখলাম যাতে শামীম ভাইয়ের বাড়ানোর সুযোগ থাকে। আমিই ১০০ দিয়ে দিলে তিনি কী করবেন? আমার মনে পড়ল, মো. কেরামত আলী আমার গোপনীয় অনুবেদন ডেকে নিয়ে লিখে দিয়েছিলেন, আমি বদিউরের সঙ্গে কাজ করেছি...। সংস্থাপন সচিবের বিখ্যাত উপকারী একান্ত সচিব মরহুম সফিকউল্লাহ ভাই আমাকে তা দেখিয়েছিলেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো, খালেদা জিয়ার জোট সরকারের আমলে সচিব পদে পদোন্নতিতে খন্দকার শহীদুল ইসলাম-হালিমগণের রাজনৈতিক দলীয়করণে আমার কোনো এসিআরই তখন কাজে লাগেনি। আমাকে তারা আওয়ামী-মনা ঠাউরেছে, অতএব চার চারবার সচিব পদে পদোন্নতি থেকে বাদ। ‘আরো তথ্য প্রয়োজন’ বলেই শেষ। বারবার কারণ জানতে চেয়েও উত্তর পাইনি।

আমার বিবেচনায় ড. আকবর আলি খানের পর আমরা আর ভালো মেরুদণ্ডসহ নিরপেক্ষ মন্ত্রিপরিষদ সচিব পাইনি। ১৯৮১ ব্যাচের এক অফিসার সচিব পদে পদোন্নতির যোগ্য হওয়ায় তিনি তাকে সুপারিশ করেছিলেন। তখন কেউ বলেছিলেন, উনি অর্থাৎ ওই অফিসার বঙ্গবন্ধু হত্যার এক আসামির আত্মীয়, তাকে বাদ দেয়া উচিত। শুনেছিলাম, ড. আকবর জবাব দিয়েছিলেন, পদোন্নতি নীতিমালায় তো সে আত্মীয়তা তাকে অযোগ্য করে না। নাম বাদ দিলে সেটা প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। এখন তো শোনা যায় ড. আকবরের পর থেকেই পদোন্নতির খসড়া তালিকা নাকি আগে খালেদা-হাসিনাকে দেখিয়ে নিতে হয়। কী অবিশ্বাস্য কথা নয়? একজন যোগ্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব যে জনপ্রশাসনের এমনকি সরকারেরও কত প্রয়োজন তা আমরা টের পাই। ড. আকবর আলি খানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ গ্রহণ বা বিশ্বব্যাংকে যোগদান, মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পদের পরে, আমার অপছন্দনীয়। কিন্তু তার পরেও সেই উপসচিব থাকতেই যে তিনি আমার অনুসরণীয় হয়েছেন তাতে কিন্তু বিন্দুমাত্র ছেদ পড়েনি। আমার এখনো আনন্দ লাগে, কোনো বৈধ তদবিরেও আমি স্যারের কাছে যাইনি, এমনকি তার মন্ত্রিপরিষদ সচিব থাকাকালীন আমার ওই বিভাগের ইফাদ প্রকল্পের পিডি হিসেবে নিয়োগ বাতিল হলেও।

আজ মনে পড়ে ১৮-২-১৯৯৩ থেকে ২৭-১১-১৯৯৫ পর্যন্ত স্যার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, আমি ১৯৯২-এর ১ এপ্রিল থেকে ১৯৯৩-এর ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিজি প্রেসের উপনিয়ন্ত্রক। ১৯৯৩-এর বাজেটের সময়ে একদিন রাত ৩টার দিকে স্যারের টেলিফোন, বদিউর, রাজস্ব বাজেটের একটা অংশ (প্রায় এক চ্যাপ্টার) পুনর্মুদ্রণ করতে হবে, পারা যাবে না? আমি বললাম, স্যার, আমাদের তো বাঁধাইও হয়ে গিয়েছে, আগামীকাল সকালেই তো এগুলো অধিবেশনের জন্য নিয়ে যাবে অর্থ বিভাগ। তিনি বললেন, মন্ত্রীর ইচ্ছে তো, পরিবর্তনটা করতেই হবে। আপনি একটি ব্যবস্থা করেন, আপনি পারবেন। হ্যাঁ, বিজি প্রেসের সে সক্ষমতা রয়েছে। আমরা স্টাফ কোয়ার্টার থেকে কর্মচারী এনে সকাল ৮টার আগে তা সম্পন্ন করে দিয়েছিলাম। তারপর আমি ইআরডিতে অতিরিক্ত সচিব থাকাকালীন স্যারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দু-একবার অফিশিয়াল বিষয়ে কথা হয়েছে। আমি অবাক হয়েছি, স্যার তখনো বদিউরকে সেই সেচ, পানি উন্নয়ন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বিভাগের শাখাপ্রধানের মতো স্নেহশীল আবহেই রেখেছেন, তেমন আন্তরিকতায়ই কথা বলেছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যানদের, আমার আগের ২৩ জনের মধ্যে, কারো কারো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আমি নিজ আগ্রহে নথিতে দেখেছি। আরো দু-একজনের সঙ্গে ড. আকবর আলি খানের উচ্চ মানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ আমাকে মুগ্ধ করেছে। তার উত্তরসূরি হিসেবে রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান হতে পেরে আমি গর্বিত ছিলাম এই ভেবে যে এখানে আমার স্যারও ছিলেন, আমিও এসেছি; যেমন আইএমইডির সচিবদের অনার বোর্ডে সৈয়দ শামীম আহসানের নাম দেখে আমার গর্ব হয়েছিল। ড. আকবর আলি খানের সঙ্গে আমার অবসর-উত্তর বেশ কয়েকটা টেলিভিশন অনুষ্ঠানে সহ-আলোচক হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সে সময়েও আমার প্রাণটা ভরে গিয়েছিল এই ভেবে যে, আমি আমার একজন প্রিয় অফিসারের সঙ্গে অনুষ্ঠান করছি। লক্ষ করলাম, স্যার কখনো আমাকে অনুষ্ঠানে অনেক জুনিয়র হিসেবে খাটো করে দেখেনওনি, অবমূল্যায়নও করেননি, বরং উৎসাহব্যঞ্জক সুযোগ করে দিতেন। কেউ বড় হলে যে তার বড়ত্ব সবসময়েই থাকে—আমি ড. আকবর আলি খানের মধ্যে তা দেখেছি। আমার জানামতে, স্যার একজন সৎ অফিসার। মহাখালী তিতুমীর কলেজের পাশের মেডোনা টাওয়ারের মালিক মো. আক্তারুজ্জামান দরিদ্র মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের ভালো অংকের বৃত্তি দিতেন। আমার পরামর্শে তিনি একবার অনুষ্ঠানে স্যারকে প্রধান অতিথি করলেন। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মহিউদ্দিন আহমেদ, লেখক গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ, সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল, সাংবাদিক আনিসুল হক, আমি এবং আরো অরাজনৈতিক বেশ কয়েকজন আক্তারুজ্জামানের এ অনুষ্ঠানে যেতাম। তিনি অনেক চেষ্টা করেও স্যারকে কোনো গিফট দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এ-ই ড. আকবর আলি খান। এজন্য স্যার এখনো আমার শ্রদ্ধাস্পদেষু। একটা রসালো ব্যাখ্যা দিয়ে শেষ করি, স্যার যখন অর্থসচিব এবং শামস কিবরিয়া অর্থমন্ত্রী, তখন আমরা কিবরিয়া সাহেবকে ড. বলতাম, আমাদের যুক্তি ছিল সচিব থেকে মন্ত্রী বড়, অতএব সচিব ড. হলে মন্ত্রী তা না হয়ে পারেন না। কিন্তু হাল আমলের অনেক ড.-এর বাহুল্য দেখে স্যারের ভিন্ন মূল্যায়ন অন্য কারো প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ না হওয়ার কারণে আর উল্লেখ করলাম না। তত্ত্বাবধায়কের উপদেষ্টা পদ থেকে তার পদত্যাগ আমি সবসময়ে সম্মানের চোখে দেখি।

 

বদিউর রহমান: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান