ড. আকবর আলি খানের আকস্মিক মৃত্যুতে দেশ হারিয়েছে তার এক কৃতী সন্তানকে এবং আমি হারালাম একজন শুভাকাঙ্ক্ষীকে। তার আরব্ধ কিছু কাজও অসমাপ্ত থেকে গেল। এর মধ্যে ছিল বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস, তার আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খণ্ড এবং বাংলাদেশের পানিসম্পদ বিষয়ক গবেষণা গ্রন্থ। মৃত্যুর মাস দুয়েক আগে তার বাসায় আলাপ প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন ওই তিনটি বিষয়ে তিনি লেখা শুরু করেছেন, তবে তা শেষ করতে হয়তো চার-পাঁচ বছর লাগবে। আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খণ্ড সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, চাকরিজীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকার সুবাদে বিচিত্র যেসব অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছিলেন এবং যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন ও কীভাবে সেগুলোর মোকাবেলা করেছিলেন তা লিখে রেখে যাবেন। তিনি আরো বলেছিলেন, বইটিতে এমন কিছু চমকপ্রদ ঘটনার উল্লেখ থাকবে, যা কারো কারো কাছে হয়তো প্রীতিকর হবে না। তাই তিনি বইটি তার মৃত্যুর পর যাতে প্রকাশিত হয় সে ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়ে যাবেন। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশের ইতিহাস ও পানিসম্পদ সম্পর্কে তার গবেষণার ফলাফল ও তার নিজস্ব সিদ্ধান্তসহ চাকরিজীবনের অনেক তথ্য অজানাই রয়ে গেল।

তার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে মাস্টার্স শেষ বর্ষের ক্লাসে। আমি পাস কোর্সে বিএ পাস করে একই বিভাগে ১৯৬৩ সালে এমএ প্রথম পর্বে ভর্তি হওয়ায় একই বিভাগের ছাত্র হলেও এর আগে তার সঙ্গে পরিচয় ছিল না। তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। ক্লাসে শিক্ষকদের তার প্রশ্ন করার ধরন থেকেই তার বুদ্ধিমত্তা ও তিনি যে প্রচুর পড়াশোনা করতেন তার প্রমাণ পাওয়া যেত। তিনি অনার্স ও মাস্টার্স উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। জ্ঞানার্জন ও গবেষণার জন্য তার প্রবল আগ্রহের কারণে আমরা ভেবেছিলাম তিনি হয়তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকতা করবেন, যদিও তখন বেশির ভাগ মেধাবী ছাত্রের লক্ষ্য ছিল তদানীন্তন সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে যোগ দেয়া। তার আত্মজীবনী ‘পুরনো সেই দিনের কথা’ থেকে জানা যায়, তিনি সহকারী অধ্যাপকের শূন্য পদে নিয়োগের জন্য দরখাস্ত করেছিলেন কিন্তু ইতিহাস বিভাগের তত্কালীন শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে তার চাকরি হয়নি। যা হোক, তিনি কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা পাস করে মেধার ভিত্তিতেই সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে ১৯৬৭ সালে যোগ দেন। আমি প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে ১৯৬৮ সালে তদানীন্তন পূর্ব পকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগদান করি।

আকবর আলি খানের সঙ্গে পুনরায় দেখা হয় ১৯৬৮ সালে রাজশাহীতে একত্রে ভূমি জরিপ ও বন্দোবস্ত প্রশিক্ষণ নেয়ার সময় এবং পরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগরে।

তার আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তিনি হবিগঞ্জের এসডিও হিসেবে কর্মরত থাকাকালে আনসারদের জন্য ট্রেজারিতে থাকা অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিতরণের আদেশ দেন এবং হবিগঞ্জে কর্মরত সরকারি কর্মচারীদের তিন মাসের অগ্রিম বেতন প্রদানের আদেশ দেন। এছাড়া তত্কালীন ন্যাশনাল ব্যাংকে থাকা ট্রেজারির প্রায় ৩ কোটি টাকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে আগরতলায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন এবং সরকারি খাদ্যগুদাম থেকে খাদ্যসামগ্রী বিনামূল্যে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিতরণের আদেশ দেন। এসব আদেশ তিনি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে এসডিও হিসেবে দিয়েছিলেন। তার এসব সাহসী পদক্ষেপ অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী হবিগঞ্জের কাছাকাছি এলে তিনি প্রথমে আগরতলা যান এবং সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর বদলি হয়ে মুজিবনগরে গিয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

উল্লেখ্য, ঢাকার বিশেষ সামরিক আদালত ১৯৭১ সালের নভেম্বরে আকবর আলি খানসহ ১৩ জন সিএসপি অফিসার এবং আমিসহ ৪২ জন ইপিসিএস অফিসার, যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার করে প্রত্যেককে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে এবং তাদের ৫০ ভাগ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন।

তার সঙ্গে কাজ করার এবং তাকে কাছ থেকে দেখার কিছুটা সুযোগ হয় যখন তিনি অর্থসচিব ছিলেন। আমি তখন প্রথমে যুগ্ম সচিব এবং পরে অতিরিক্ত অর্থসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে তার তীক্ষ বিচারবুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যেত। মোটামুটি বড় আকারের কোনো রিপোর্ট বা প্রস্তাব অতি অল্প সময়ের মধ্যে পড়ে করণীয় ঠিক করতে এবং জরুরি ক্ষেত্রে কোনো প্রস্তাব বা রিপোর্টের ভালো ও দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে দ্রুততার সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের জন্য তার সুচিন্তিত মতামত এবং সুপারিশ উপস্থাপন করার ব্যাপারে তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন, যেটা তার অসামান্য ধীশক্তির পরিচায়ক।

শান্তভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার ব্যাপারেও তিনি যথেষ্ট কুশলী ছিলেন। শুধু একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করছি। একবার একটি অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাদের দাবি-দাওয়া সম্পর্কিত এক বৈঠকে প্রতিনিধিরা তাদের দাবিগুলোর ব্যাপারে অর্থবিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয় অবস্থানের অভিযোগ তুলে অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় সমালোচনা এবং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে থাকেন। তিনি কোনো বাধা প্রদান না করে ধৈর্য সহকারে তাদের বক্তব্য শোনেন। তাদের বক্তব্য শেষে তার বক্তব্যের শুরুতেই বলেন, তাদের অবস্থানে তিনি থাকলে তিনিও হয়তো তাদের মতোই ক্ষুব্ধ হতেন। তার এ সহানুভূতিপূর্ণ প্রারম্ভিক বক্তব্য উত্তেজনা প্রশমনে অনেকটাই সহায়ক হয়। এরপর তিনি সার্বিক পরিস্থিতি এবং অর্থবিভাগের অবস্থান ব্যাখ্যা করে যৌক্তিক দাবিগুলো পুনরায় পরীক্ষা করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়ে তাদের শান্ত করতে সক্ষম হন।

এছাড়া সহকর্মীদের প্রতিও তিনি সহানুভূতিশীল ছিলেন। চাকরিসংক্রান্ত বা দাপ্তরিক কোনো কাজে কেউ তার সহায়তা চাইলে তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতেন। এমনকি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়েও অনেকের উপকার করেছেন, যেমন আমার ক্ষেত্রেও ঘটেছে। এজন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে ঋণী।

আকবর আলি খান সিভিল সার্ভিসের সর্বোচ্চ পদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। আমার জানা মতে, তিনি কোনোদিন কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে নিরপেক্ষভাবে ও দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পালন করে গেছেন, যা প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারীর কাছ থেকে রাষ্ট্রের স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে নানা কারণে অনেকেই সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন না। দলনিরপেক্ষ অবস্থানে থেকেও কীভাবে কর্তব্যনিষ্ঠা, সততা, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে এবং বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়া যায়, তার এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত আকবর আলি খান।

 

মানিক লাল সমদ্দার: সাবেক সচিব এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী