আমরা তিন বোনের পর আমাদের একটি ভাইয়ের জন্ম হয়। সেই হলো ড. আকবর আলি খান। তিন বোনের পর একজন ভাই হলে সবার অবস্থা কেমন হয়, তা সহজেই অনুমেয়। অতি আদুরে এক পরিবেশে আমাদের শৈশব কাটে। তার ডাক নাম ছিল খসরু। পুরো নাম বাবা রেখেছিলেন আকবর আলি খান। বাবা অবশ্য এ নাম আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন। তার জন্ম ১৯৪৪ সালে। সে হওয়ার দুই বছর পর আমাদের আরেকটি ভাই হয়। তার নাম জিয়া খান। দুটি ভাই পরপর হওয়ায় বড় ভাইয়ের দেখাশোনার দায়িত্ব পড়ল আমার বড় বোনের ওপর। বিয়ের আগে পর্যন্ত একেবারে আদুরে-আহ্লাদে তাকে দেখাশোনা করত সে। বলে রাখি, তার বিয়ে হয় ড. করিমের সঙ্গে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। আমাদের পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনি আমার মা-বাবাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করতেন। এটা গেল ছোটবেলার কথা।

ছোটবেলায় আকবরের খেলাধুলার চেয়ে পড়াশোনার দিকে বেশি মনোযোগ ছিল। আমি করাচি থেকে টাইম ম্যাগাজিনসহ বিভিন্ন বই পাঠাতাম। সেগুলো সে পড়ত। আর কলেজের পরে সে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল তখন সেখানে বিতর্ক করত। বিতর্কে সে প্রায়ই প্রথম হতো। সে একটু শান্ত প্রকৃতির ছিল। খুব বেশি আড্ডা দিয়ে সময় কাটাত তা নয়। বিতর্কের সময় সবাই অবাক হয়ে যেত এ ছেলেটি এতটা জ্ঞান কীভাবে অর্জন করল। যথারীতি সে সিএসপি অফিসার হয়। অনেকেই সিএসপি হয়, কিন্তু কাজ ও দক্ষতায় সে অনেককেই ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আমাদের খাবারে নানা বৈচিত্র্য ছিল। সে এটা পছন্দ করত। আমরা যখন কানাডায় গিয়েছিলাম তখন আকবর ক্যানড ফুড আর শুঁটকি কিনেছিল। ঢাকা থাকাকালে আমরা টেবিলে একসঙ্গে খেতাম। নানা গল্প-গুজব করতাম। প্রতিদিন সে আমাকে একটা সিনেমা দেখাত। পরে আবার একসঙ্গে আমেরিকায় আসি। আকবর, আমি এবং আমার ছোট ভাই কবির। এখানে তার পূর্বপরিচিত ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের লোক, আইএমএফের লোক সবাইকে নিয়ে একটা বড় পার্টি করেছিলাম। আর বিভিন্ন জায়গায় আমরা ঘুরেছি এবং খাওয়া-দাওয়া করেছি। এর আগে ঢাকায় যখন আমরা একত্রিত হয়েছিলাম, তখন কলকাতায় যাই। আমি, আকবর, জিয়া এবং তার স্ত্রী চারজন মিলে। কলেজ স্ট্রিটে যেসব বইয়ের দোকান আছে, সেখানে অনেক সময় কাটিয়েছিলাম এবং সে অনেক বই কিনেছিল। এত বই কিনেছিল যে সব একসঙ্গে আনতে পারেনি এবং সেগুলো পরে পাঠিয়ে দিয়েছিল কলকাতার পরিচিত এক লোক। আরো অনেক জায়গায় ঘুরেছিলাম। ছবি তুলেছিলাম। পারিবারিক অনেক স্মৃতিমেদুর সময় কাটিয়েছিলাম।   

­আমাদের পারিবারিক বন্ধনটা এত নিবিড় যে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। সেটা হলো শর্তহীন ভালোবাসা ও বন্ধন। তার ওপর আমার মা-বাবা দুজনের প্রভাব রয়েছে। বাবার প্রভাবটা ছিল পড়াশোনার দিক থেকে। বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে। আমার বাবা খুব জ্ঞানদীপ্ত মানুষ ছিলেন। তিনি ১৯২৪ সালে বিএলএলবি অর্জন করেছিলেন। পড়াশোনায় অনেক মেধাবী ছিলেন এবং অনেক ভাষায় তিনি দক্ষ ছিলেন। এমন ছিলেন, সবাই হয়তো ঘুমিয়ে আছেন। কিন্তু তিনি পড়ছেন। আমার মা ছিলেন সাংঘাতিক প্র্যাক্টিক্যাল। বাবার চেয়ে অনেক বেশি প্র্যাক্টিক্যাল ছিলেন। অনেকভাবে আমার মা থেকে বাবা উপকৃত হয়েছেন।

খাবারের মধ্যে মাছটা তার খুব প্রিয়। মাংস এবং মিষ্টিও খেত। ডায়াবেটিস থাকায় মিষ্টি হয়তো তেমন খায় না। তার প্রিয় একটা খাদ্য হলো আম। আমের মৌসুম এলে সে খুব খুশি হয়। আমি যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটা আমের খবর দিয়েছিলাম। এখন তো বাংলাদেশে অনেকেই ছাদ কৃষি করে এবং আমের অনেক ফলন দেখেছি। এর মধ্যে আমার একবার কথা হলো। আমি তাকে একটা আমের কথা উল্লেখ করলাম। সে বলল, কী নাম আপা। আমি বললাম, নিয়াজি নামে জাপানি একটা আম আছে, খুব ব্যয়বহুল। তখন সে বলল তাহলে তো এটা সীমিতসংখ্যক একটা গোষ্ঠী খাবে। লকডাউনের সময় আমাদের দেশের বাড়ি থেকে প্রচুর আম আসত। সেটা আমাদের  ডিস্ট্রিবিউট করে রাখতে হতো যে কতগুলো পাকা আম, কতগুলো কাঁচা আম, কোনটা কবে পাকবে, আকবর কোনগুলো খাবে, কাকে কাকে দেয়া হবে, সেটা পরিকল্পনা করতে হতো।

এবার আসা যাক, পোশাক-পরিচ্ছদ প্রসঙ্গে। আমি সবসময় দেখি সে নর্মাল কাপড়চোপড় পরতে পছন্দ করে। তার গলার মাপে সাধারণত শার্ট পাওয়া যায় না। আমি একটা শার্ট কিনে দিয়েছিলাম। তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, গলার মাপ কত। সে বলেছিল, সাড়ে আঠারো। সে অনুযায়ী শার্ট কিনে এনেছিলাম। কোনো একটা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন নিয়ে একটা অনুষ্ঠান ছিল। সেটি পরেই সে অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। মতিয়ার রহমানসহ অনেকে এসেছিল। আমিও গিয়েছিলাম। তখনই পরে বলেছিল, আপা, এ শার্টটা খুব লেগেছে। একদম ঠিকমতো হয়েছে। প্রথম কথা হলো, কাপড়চোপড়ের ব্যাপারে আমি যা দিতাম তা তার পছন্দ হতো। দ্বিতীয় কথা, বিশেষ  করে অফিসিয়াল কারণে সে গরমের সময়ও শুট পরে যেত। তবে অবসরের পরে সে অনেকটা ক্যাজুয়াল হয়ে গেল।

তার বিয়ের প্রসঙ্গে কিছু কথা না বললেই নয়। আকবরের প্রথম পোস্টিং হয়েছিল সিলেটের হবিগঞ্জে এসডিও হিসেবে। ঢাকায় আসার পর সে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল এবং সেখান থাকাকালে সে স্কলারশিপ পেয়েছিল। পিএইচডি করতে গিয়েছিল কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন আমার মা-বাবা ভাবলেন, তাকে বিয়েথা করে দেয়া ভালো। আবার কবে আসবে, আমার বাবাও খুব অসুস্থ। কখন সম্ভব হবে, সেটি নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তখন আমি করাচি থেকে এসেছিলাম। আমার স্বামী তখন স্টেট ব্যাংক পাকিস্তানে ডেপুটি গভর্নর পদমর্যাদায় ছিলেন। ওখান থেকে আমরা পালিয়ে আসি ঢাকায় এবং এখানে আসার পর তখন বিয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়। আমি তখন আমার মেজ ভাই জিয়ার বাসায় উঠি। তার বাসা ছিল ধানমণ্ডিতে। তারপর তার বিয়ে নিয়ে কথাবার্তা হলো। অনেকেই এসেছিল। এর মধ্যে একজন ছিল ঘটক। সম্পর্কে সে আমাদের খালাত ভাই হয়। সে ভাই-ই একটা বিয়ের কথা আনলেন এবং সেটি আমার মায়ের মনে ধরল। পরে আমরা মেয়ে দেখতে গেলাম। দেখে আকবরকে জানানো হয়েছে, আমরা পাত্রী দেখছি। তোমার কানাডা যাওয়ার আগে বিয়েটা হবে। যুদ্ধ পরিস্থিতি। ঢাকায় কিছু পাওয়া যায় না। তখন আমি কলকাতায় গেলাম বিয়ের সদাই করতে। ন্যূনতম যা প্রয়োজন তা নিয়ে ঢাকায় এলাম এবং অবশেষে ওর বিয়ে হলো। আমরা তখন এক বাড়িতে। আমার দুই ছেলেমেয়ে আছে। আমার স্বামী আছে। আকবরও সেখানে ছিল জিয়া খানের বাড়িতে। দেশে থেকে ওখানে আমার মা-বাবাও আসত। তখন আমরা সবাই একসঙ্গে।

 

নিলুফার আহমদ: ড. আকবর আলি খানের বোন