অধ্যাপক রওনক জাহানের সঙ্গে আমার পরিচয় মোটা দাগে তিন পর্বে ভাবা যায়। প্রথম পর্বে তার সঙ্গে পরিচয় অপ্রত্যক্ষ, তাকে দূর থেকে জেনেছি তার খ্যাতির কল্যাণে। পরবর্তী পর্যায়ে তাকে জানার সুযোগ হলো তার লেখার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুবাদে। আর তারও পরে, ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠভাবে তাকে জানার সুযোগ হয়েছে যখন তিনি সিপিডির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হলেন এবং পরবর্তী সময়ে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো হিসেবে যোগ দিলেন সেই সূত্রে।

যখন মধ্য সত্তরের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হলাম তখন বিভাগের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কজন স্বনামখ্যাত অধ্যাপকের নাম বন্ধুদের আড্ডায় বিশেষভাবে শুনতে পেতাম তার মধ্যে অবধারিতভাবে অধ্যাপক রওনক জাহানের নাম উঠে আসত—জাঁদরেল শিক্ষক হিসেবে, গবেষক হিসেবে, পাকিস্তান শাসনামলের ক্ষুরধার রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বন্ধুদের কাছে তার কথা শুনতে পেতাম তার পাণ্ডিত্যের প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা এবং বেশ সমীহ ও কিছুটা ভয়ের সংমিশ্রণে।

তার লেখার সঙ্গে অবশ্য পরিচিত হয়েছি আরো পরে। তার রচিত গ্রন্থ ‘পাকিস্তান: ফেইলিউর ইন ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন’ বহুল পরিচিত ও বহুল উদ্ধৃত একটি প্রকাশনা, ষাটের দশকের শেষের দিকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে করা তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভের প্রকাশিত রূপ। গবেষক হিসেবে তিনি যে কত উঁচু মাপের তার ধারণা প্রথম পাই এ বই পড়তে গিয়ে। এ আকর গ্রন্থটি কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭২ সালে। আর বাংলাদেশে এর প্রথম প্রকাশ ১৯৯৪ সালে ইউপিএল থেকে। পাকিস্তানি শাসনামলে বুনিয়াদি গণতন্ত্রের প্রবর্তন ও পূর্ব পাকিস্তানের আর্থসামাজিক জীবনে তার প্রতিফলন, পাকিস্তানি শাসনামলে ‘দুই অর্থনীতি’র উদ্ভব ও বিকাশমান রাজনীতিতে প্রভাবক হিসেবে তার ভূমিকা, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্রমবিবর্তন ও শেষে ছয় দফা আন্দোলনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু কীভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নকে রাজনৈতিক অভীষ্ট ও অপ্রতিরোধ্য আন্দোলনে রূপ দিলেন—এসবের ওপর তার গ্রন্থে আছে বহুমাত্রিক ও তলদর্শী বিশ্লেষণ; যে থেকে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্বন্ধে আমরা গভীরভাবে জানতে পারি। ২০২২ সালে ইউপিএল কর্তৃক পঞ্চম সংস্করণ প্রকাশই বলে দেয় এ গ্রন্থের অনন্যতা ও গ্রন্থের লেখকের দূরদৃষ্টির কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পরবর্তী সময়ে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের নামকরা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যাপক রওনক জাহান অধ্যাপনা করেছেন, গবেষণা করেছেন। তাকে যখন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ সম্মাননা প্রদান করল, তা ছিল আমাদের সবার জন্যই এক অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের বিষয়।

অধ্যাপক রওনক জাহানকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হলো যখন তিনি সিপিডির সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেন ২০১০-এর দিকে এবং পরবর্তী সময়ে যখন সম্মাননীয় ফেলো হিসেবে সিপিডিতে যোগ দিলেন ২০১২ সালে। গবেষক হিসেবে তার উচ্চ মান ও মেধার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে পরিচিত হলাম যখন তিনি সিপিডি এবং নরওয়ের প্রখ্যাত ক্রিশ্চেন-মিখেলসন ইনস্টিটিউটের (সিএমআই) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণা প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ও বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ওপর দুটি মৌলিক গবেষণাকর্ম হাতে নিলেন। তখন দেখলাম কী অসাধারণ একাগ্রতা ও অভিনিবেশ সহকারে তিনি সে গবেষণাকর্মে ডুবে গেলেন। এবং এটাও তার থেকে জানলাম ও শিখলাম যারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক জ্ঞান ধারণ করেন তাদের কাছ থেকে নিজের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করে কীভাবে জেনে নিতে হয়। এর জন্য পূর্বপরিকল্পনা ও নিজের পূর্বপ্রস্তুতি যে খুবই জরুরি তাও প্রত্যক্ষ করলাম খুব কাছ থেকে। গবেষণাকর্ম পরিচালনায় পদ্ধতিগত দিকগুলো নিয়ে অধ্যাপক রওনক জাহানের কাছে অনেক বিষয়েই শিক্ষণীয় আছে। কিন্তু অধ্যাপক রওনক জাহান কেবল একজন প্রথাগত গবেষকই নন, তিনি একজন সচেতন নাগরিক, অ্যাক্টিভিস্ট এবং পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল। তার অধীত জ্ঞানের আলো সভা-সেমিনার-আলোচনার মধ্য দিয়ে বৃহত্তর পরিসরে নেয়ার জন্য শত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি যে সময় দিতে সবসময়েই আগ্রহী সেটাও অন্য অনেকের জন্য একটি শিক্ষণীয় ও অনুকরণীয় বিষয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গবেষণাকর্ম পরিচালনার সঙ্গে সঙ্গে জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্য সুবিধার অভিগম্যতা ও সম্প্রসারণ, এসব বিষয়ে তার বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, নীতি বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়নে সক্রিয় অবদান রাখতে তিনি সবসময় উদ্যোগী ও সচেষ্ট।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো হিসেবে সিপিডির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও গবেষণার গুণগত মান ও উত্কর্ষের উন্নয়নে তিনি মূল্যবান অবদান রেখে চলেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীকে সামনে রেখে ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে যে ব্যতিক্রমী ও বহুল প্রশংসিত আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়েছিল তিনি ছিলেন তার মূল উদ্যোগী, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেরণা ও সংগঠক।

 

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান: সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি