আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাংলাদেশের অন্যতম রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. রওনক জাহান আমার শিক্ষাগুরু। তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ১৯৭৩ সালে প্রথম বর্ষে ভর্তির মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সময়। তখন তিনি বিভাগের সভাপতির দায়িত্বরত ছিলেন। ছাত্র হিসেবে বিভাগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তাঁর জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য বিমুগ্ধ হয়ে শুনেছি। বিভাগীয় সভাপতি হিসেবে তাঁর দক্ষতা সদা প্রশংসিত হয়েছে।

রওনক ম্যাডামকে সরাসরি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাঠ গ্রহণের সময়। ‘সামাজিক পরিবর্তন ও রাজনৈতিক উন্নয়ন’ কোর্সে রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়নের সাম্প্রতিক পদ্ধতিগুলো নিয়ে তার বিশ্লেষণ আমাদের নতুন জ্ঞান অন্বেষণে পথনির্দেশ করে।

স্নাতক সম্মান শ্রেণীতে ছাত্র অবস্থায় ড. রওনক জাহান রচিত পাকিস্তান: ফেইলিউর ইন ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন গ্রন্থটি যুক্ত পাকিস্তানের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা, তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে ‘অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ’ এক স্বাধীন বাংলাদেশের উত্থান পর্ব বিষয়ে আলোচনা ব্যাপক সাড়া জাগায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কালক্রম ও পরাশক্তি এবং ভারতের ভূমিকা ইত্যাদি ও উল্লিখিত বিষয়গুলো ম্যাডামের এ বইয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে, যা আমাদের পাঠ্যসূচির অংশ ছিল এবং অদ্যাবধি আছে। এছাড়া অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কোর্সে তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ বাংলাদেশ পলিটিকস: প্রবলেম অ্যান্ড ইস্যুজ। অন্যতম প্রধান পাঠ্য হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ড. রওনক জাহান রচিত বিভিন্ন গ্রন্থ ও অসংখ্য প্রবন্ধ সমাজবিজ্ঞান গবেষণার কাজে উৎস, পাথেয় ও অনুসরণীয় হিসেবে থেকে গিয়েছে। আমার নিজস্ব গবেষণাকাজে এবং একাডেমিক প্রয়োজনে ম্যাডামের ঢাকায় এলিফ্যান্ট রোডের বাসভবনে বিভিন্ন সময় গিয়েছি এবং তাঁর নির্দেশনা ও গাইডেন্স পেয়ে উপকৃত হয়েছি।

আমি ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক পদে যোগদান করি। এ পদের জন্য নির্বাচনী বোর্ডে রওনক ম্যাডাম বহিস্থ বিশেষজ্ঞ হিসেবে থাকেন, যা ছিল আমার জন্য নিঃসন্দেহে গৌরবের। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসি এবং ম্যাডামের গবেষণা ও পেশাগত কারণে বিদেশে অবস্থানের বিষয়ে অবগত হই। ১৯৯১-৯২ সেশনে আমি সিনিয়র ফুলব্রাইট স্কলার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি গেলে ম্যাডামের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। ওই ভার্সিটির সাউদার্ন এশিয়ান ইনস্টিটিউটে তিনি অ্যাডজাঙ্কট প্রফেসর ও গবেষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দায়িত্ব পালনের জন্য বিভিন্ন দেশে অবস্থান করলেও তাঁর প্রকাশিত লেখনীগুলো আমরা পড়ার সুযোগ পেয়েছি।

ম্যাডাম সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগে (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো হিসেবে যোগ দেয়ার পর বিভিন্ন সময়ে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে। সিপিডিতে তার বাংলাদেশের সংসদ ও রাজনৈতিক দলের ওপর গবেষণাকালে আয়োজিত ওয়ার্কশপে তিনি আমাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। প্রথমা প্রকাশন থেকে ড. রওনক জাহানের পলিটিক্যাল পার্টিজ বইটি প্রকাশের পর প্রথম আলো আয়োজিত বুক লঞ্চিং অনুষ্ঠানে ওই বইয়ের ওপর একজন আলোচক হিসেবে থাকতে পেরে গর্ব অনুভব করি।

২৭ জানুয়ারি ২০১৮ সালে ড. রওনক জাহান জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক গুণীজন বক্তৃতা পর্ব-৪ এ ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ মুভমেন্টস, ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’-এর ওপর নিজস্ব গবেষণাধর্মী মনোগ্রাফ পেশ করেন। ওই অনুষ্ঠানে ‘ইন্ট্রোডিউসিং প্রফেসর ড. রওনক জাহান’ শিরোনামে আমি তার পরিচিতি বক্তব্য দিতে পেরে গর্বিত হয়েছি। এছাড়া সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (এসইউএসটি) আয়োজিত ‘বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন’ শিরোনামে ম্যাডাম লিখিত নিবন্ধ পেশ করেন, যার ওপর আমি আলোচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সৌজন্যে ড. রওনক জাহানকে প্রধান বক্তা হিসেবে পাই এবং আমাদের এ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক আলাপচারিতা হয়, যা নিঃসন্দেহে অনবদ্য।

আমি বলতে পারি যে ম্যাডামের একজন সরাসরি ছাত্র হিসেবে আমি অবশ্যই ভাগ্যবান। তার মতো ক্ষণজন্মা একাডেমিশিয়ানের জন্য কোনো রকম ভূমিকার প্রয়োজন হয় না। নিজস্ব কৃতিত্বে তিনি একাডেমিক বিশ্বে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিলাভ করেছেন। বস্তুত পক্ষে তাকে ‘অধ্যাপকদের অধ্যাপক’ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। গভীরতর জ্ঞানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি ‘অ্যাপ্রোচেবল স্কলার’ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশ প্রসঙ্গের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অনুসন্ধানে ড. রওনক জাহানের গবেষণালব্ধ জ্ঞানের প্রায়ই উদ্ধৃতি দেয়া হয়।

রওজক জাহানের প্রকাশিত গবেষণাধর্মী প্রবন্ধগুলো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর রচিত, যেমন গণতন্ত্র নির্মাণ, জেন্ডার সমতা, বাংলাদেশে গণহত্যা, আঞ্চলিক ইস্যু, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, নির্বাচনী প্রক্রিয়া ইত্যাদি। ড. রওনক জাহান একাডেমিক অর্জনের উল্লেখযোগ্য যেসব পদে দায়িত্ব পালন করেন তা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে টিচিং ফেলো, কেনেডি ইনস্টিটিউটে রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, জাতিসংঘের নারী উন্নয়ন কর্মসূচির প্রথম সমন্বয়কারী, আইএলতে গ্রামীণ নারী প্রোগ্রামের প্রধানের দায়িত্ব পালন, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সে (এসআইপিএ) সিনিয়র রিসার্চ স্কলার এবং অ্যাডজাঙ্কট অধ্যাপক, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান এবং উইমেন ফর উইমেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। কর্মসূত্রে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এবং সম্মেলনে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

ড. রওনক জাহানের একাডেমিক অর্জন এবং পেশাগত সাফল্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তার রচিত সব প্রকাশনা রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান ডিসকোর্সের সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। ম্যাডামের প্রতি রইল আমার অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। তার সুস্বাস্থ্য এবং সুখী সুন্দর দীর্ঘ জীবন কামনা করছি।

 

ড. আল মাসুদ হাসানউজ্জামান: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়