১৯৫৯ সালে যারা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় (মানবিক) মেধা তালিকায় উপরে ছিল, তাদের অনেকে স্নাতক সম্মান পর্যায়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতি বা সমাজবিজ্ঞান বিষয় বেছে নেয়। আমরা মনে করতাম, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তীব্র প্রতিযোগিতা হবে। রওনক জাহান রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছিল। আমাদের জল্পনা মিথ্যা হয়নি। রওনক জাহান স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণী পায়। আমাদের পক্ষপাতিত্ব ছিল অবশ্য পুরুষ সহপাঠী বন্ধুর প্রতি, সে আমাদের আশাহত করেনি।

রওনক জাহান পেশা হিসেবে বেছে নেয় বিদ্যা অনুশীলন—সাফল্য এবং সুনাম অর্জন করেছে। তার অভিসন্দর্ভ ছিল জাতীয় সংহতি নির্মাণে পাকিস্তানের নেতৃত্বের ব্যর্থতা। ১৯৭০ দশকের শুরুতে তার গবেষণা বিশেষ গুরুত্ব ও পরিচিতি পায়। কেন্দ্রীয় সরকারের শোষণের ফলে পূর্ব বাংলার অগ্রগতি ব্যাহত হয়, দেশের দুই অংশের মধ্যে সৃষ্টি হয় ব্যাপক বৈষম্য। গবেষণার বিষয় ছিল শোষণ ও বৈষম্যের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক আঞ্জাম। বইটি দেশে-বিদেশে প্রকাশিত ও সমাদৃত হয়েছে।

রওনক জাহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ছিল; যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের উন্নয়ন কেন্দ্রে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছে। বর্তমানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো।

তার গ্রন্থের বিষয়বস্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিকাশ ও সমস্যাবলি এবং নারীর ক্ষমতায়ন নীতি ও কর্মসূচি মূলধারায় বা মূল উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সন্নিবেশ করা।

১৯৭০ দশকের প্রথম দিকে শিল্পোদ্যোগীদের সামাজিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে তার একটি প্রবন্ধ প্রকাশ হয়েছিল। রওনক জাহানের গবেষণার মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, তাই অজানা রয়ে গিয়েছে। ১৯৭০ দশকের শেষ দিকে আমি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে প্রবন্ধটি পড়েছিলাম। (যতদূর মনে পড়ে, সহপ্রণেতা ছিলেন হান্না পাপানেক।)

প্রয়াত অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের ইংরেজি ভাষায় রচিত ‘ভারতের রাজনৈতিক দল’ বিষয়ক গ্রন্থের মুখবন্ধে রওনক জাহান রচয়িতার পরিচয়, সন্দর্ভ রচনা কাহিনী এবং মূল বক্তব্য তুলে ধরেছে (২০২২)। অধ্যাপক রাজ্জাকের গবেষণার বিষয়বস্তু বিভক্তি-পূর্ব উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ‘সোশ্যাল ইকোনমি’ বা সমাজ-অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা ও বিকাশের সীমাবদ্ধতা। অধ্যাপক রাজ্জাক সন্দর্ভ রচনা শেষ করেন ১৯৫০ সালে, কিন্তু পিএইচডি লাভের আগে দেশে ফিরে আসেন। অধ্যয়নের বিষয় নির্বিশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন অধ্যাপক রাজ্জাক।

রওনক জাহান ও রেহমান সোবহান রচিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতি, বাঙালি জাতিসত্তা, ছয় দফা কর্মসূচিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান ও বঙ্গবন্ধুর অর্থনীতি ভাবনার সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা বিষয়ে একটি বই প্রকাশ হয়েছে (২০২২)। রাজনীতি বিষয়ে রওনক জাহান লিখেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পরিচয় পাওয়া যায়।

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ ১৯৬৩ সালে। রওনক জাহানের সঙ্গে পরবর্তী দেখা ১৯৭৬ সালে। রওনক তার গুরুসদন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিল। আমি তখন বয়স্ক শিক্ষা কর্মসূচিতে প্রশিক্ষণরত, থাকি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কামরার পারিবারিক আবাসনে। তাকে সন্ধ্যায় আমন্ত্রণ করি। শিকাগো থেকে তার টেলিফোন আসে। আলাপ শেষে রওনক জানায়, শিকাগোর বাসায় টেলিফোন রিসিভারটি ঠিকমতো রেখে আসেনি; বিপদ-আপদ হয়েছে কিনা নিশ্চিত হতে খোঁজখবর নিচ্ছে; শেষ টেলিফোনটি করেছিল আমার নম্বরে।

রওনকের সঙ্গে এরপরে দেখা একুশ শতকের শুরুতে। গুলশানের পারিবারিক বাসায় কয়েকজন সহপাঠীকে আমন্ত্রণ করেছিল, বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পরও যাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল। অধ্যাপক রেহমান সোবহানের ছাত্র ছিল কয়েকজন। স্মৃতিচারণ ও অর্থ-সমাজ-রাজনীতি আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে রওনকের সঙ্গে পরিচয় বিশ শতকের মাঝামাঝি; একুশ শতকের শুরুতে বন্ধুত্ব।

রওনক জাহানের দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন কামনা করি।

 

ড. মসিউর রহমান: অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বাংলাদেশ