সত্তরের দশকের শেষ দিকের কথা। আকবর আলি খানকে প্রথম দেখি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন কলা ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।। তার পছন্দের ইন করা হাফ শার্ট, কালো ফ্রেমের চশমা চোখে, অনুমান করি, হয়তো বাহনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন নির্বিশঙ্ক। কেউ একজন বললেন, ‘ইনি হচ্ছেন আকবর আলি খান, ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক, তিনি সিএসপি এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা। মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দেবেন।’

তার অনেক দিন পর। তিনি অর্থ সচিব থাকাকালে আমি সচিবালয়ে গেলে ডাকসাইটে আমলা তথা তত্কালীন অর্থ সচিব খানের সঙ্গে কুশল বিনিময় হতো—হায়, হ্যালো পর্যন্তই। তখনো নামডাকে তেমনটি ছিলেন না। কিন্তু তিনি সমগ্র দেশবাসীর দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দীনের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দিয়ে। লম্বা কাহিনী খাটো করে বলতে হয়, গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ইয়াজউদ্দীনের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র রুখে দিতে তিনি এবং তার অন্য ক’জন সহকর্মী যে ‘বিপ্লবী’ ভূমিকা রেখেছিলেন, কেউ স্বীকার করুক আর না-ই করুক, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে এবং থাকবে। বলা বাহুল্য নয় যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে প্রধান উপদেষ্টার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির প্রতিবাদে সে সময় তিনি পদত্যগ করেছিলেন। প্রসঙ্গত বলে নেয়া দরকার যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদী পদক্ষেপ নতুন কিছু নয়—যেমন তারও বহু আগে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণে পাকিস্তানের সামরিক আদালত তার অনুপস্থিতিতে তাকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন।

সত্যি কথা বলতে কি, তত্কালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে তার নিরপেক্ষ ভূমিকা আমলে নিয়ে আমি এই প্রকৃত দেশপ্রেমিকের একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে উঠি। তিনি শুধু একজন দক্ষ আমলা ছিলেন না, ছিলেন একজন খোঁজারু গবেষক এবং লেখক। এ পর্যন্ত তার লেখা বইয়ের সংখ্যা বোধ করি ১৫। সবই পাঠকনন্দিত বই। তবে মনে হয় বাজার মাত করেছে ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’, ‘আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি, ‘অবাক বাংলাদেশ বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’ ইত্যাদি বই। তার বাংলা রচনা সম্পর্কে কলকাতার দেশ পত্রিকার মন্তব্য ছিল এ রকম—‘এই লেখক লিখতে জানেন।’

দুই.

তিনি মূলত ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও এমএতে ফার্স্ট। পরবর্তীকালে কানাডার কুইনস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিভাগে এমএ ও পিএইচডি ডিগ্রি শেষ করে, তার ভাষায়, ‘অর্থনীতির বুলি ও দুরধিগম্য পদ্ধতি’ রপ্ত করে অর্থনীতিবিদ হয়ে ওঠেন। তবে তিনি এক ভিন্ন ধাঁচের অর্থনীতিবিদ, যার কাছে ‘গণিতের বিভীষিকা ও লেখাচিত্রের কণ্টক এড়িয়ে রম্যরচনার অবয়বে অর্থনীতির অপ্রিয় বক্তব্য অধিকতর গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।’ তিনি আরো মনে করেন, ‘হালকা ও চটুল ভঙ্গি অর্থনীতির বক্তব্য লঘু করে দেয় না, বরং অনেক ক্ষেত্রে গভীরতর দ্যোতনা দেয়। কবির ভাষায় বলতে গেলে, ‘আমারে পাছে সহজে বোঝ তাইতো এত লিলার ছল, বাহিরে যাহার হাসির ছটা, ভিতরে তাহার চোখের জল।’

তিন.

বাংলাদেশের পাঠকের কাছে অর্থনীতি নামে জটিল একটা বিষয় জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে তার অবদান দুদিক থেকে—প্রথমত, আড্ডার আমেজে হাস্যকৌতুক দিয়ে কঠিন বক্তব্যের সরল উপস্থাপন তিনি পাঠকপ্রিয় এবং দ্বিতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বাংলা ভাষায় তার চিন্তাগুলো প্রকাশ করে অন্যান্য বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ থেকে আলাদা। যা-ই হোক, সময়ের আবর্তনে একসময় অর্থনীতির জটিল বিষয় গল্পচ্ছলে উপস্থাপনের তার এ ‘বাতিকটা’ আমাকেও গ্রাস করতে থাকে। আমি লিখে ফেলি ‘রঙ্গরসে অর্থনীতি’, ‘গল্পে গল্পে অর্থনীতি’, ‘বিশ গেরামের গল্প’ ইত্যাদি পাঠকনন্দিত বই। কঠিন অর্থশাস্ত্র রম্যরচনায় উপস্থিত; ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে আমার প্রদেয় ম্যানেজারিয়াল ইকোনমিকস বা ম্যাক্রো ইকোনমিকস গলদ্ঘর্মহীন গল্পে গল্পে শেষ হয় আকবর আলি খানের অনুশাসনের পথ ধরে। মোট কথা, অর্থনীতি পাঠে নতুন ধারা সৃষ্টিতে আকবর আলি খানের কথা স্মরণ করতেই হয়।

চার.

২০১১ সাল। ভাবেসাবে গুরুগম্ভীর কিন্তু অর্থনীতি লেখায় নিতান্তই রসিক আকবর আলি খানকে একবার আমি ফোন করেছিলাম। ওই ফোনে অনুরোধ জানাই জাবি বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ আয়োজিত ‘Bangladesh at 40 Changes and Challenges’ শীর্ষক সেমিনারে একটা প্রবন্ধ উপস্থাপনের জন্য। ভাবতে অবাক লাগে যে নামগোত্রহীন আমার অনুরোধে তিনি তাত্ক্ষণিক সাড়া দিয়ে আমাকে কৃতার্থ করেছিলেন। সে সময় তিনি কিছুটা অসুস্থ এবং ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটতেন। অথচ কষ্ট করে সশরীরে ক্যাম্পাসে এসে পাঠ করলেন কালজয়ী এক নিবন্ধ ‘Bangladesh Conundrum A Tapestry of Light and Shadow’—গত চার দশকের অর্জন আর হতাশার বিবরণ। অবশ্য ওই সেমিনারে আমার অনুরোধে সাড়া দিয়ে আমাকে যারা কৃতার্থ করেছিলেন তাদের নাম উল্লেখ না করলেই নয়—আবুল মাল আব্দুল মুহিত, প্রফেসর ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, মাহবুব হোসেন, রিজওয়ানুল ইসলাম, হোসেন জিল্লুর রহমান, এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, খন্দকার মুস্তাহিদুর রহমান, গোলাম মোয়াজ্জেম, তৌফিক ই-ইলাহী চৌধুরী, ইসমাইল হোসেন, আনু মুহাম্মদ, শুদ্ধস্বত্ব রফিক, এসএম হাসেমী, সুভা সামা, ইফতেখারুজ্জামান, আল মাসুদ হাসানুজ্জামান, আসিফ নজরুল প্রমুখ।

আকবর আলি খান তার উপস্থাপিত প্রবন্ধের ভূমিকায় সবার মন ভুলালেন—চীনের বিপ্লবী নেতা চৌ এন লাইকে ফরাসি বিপ্লবের দ্বিশতবার্ষিকীতে এর প্রভাব নিয়ে মন্তব্য করতে বললে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘Too soon to tell.’ ফরাসি বিপ্লবের মূল্যায়নের জন্য ২০০ বছর যদি যথেষ্ট না হয়, বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের বিপ্লব মূল্যায়নে ৪০ বছর (কিংবা ধরুন ৫০ বছর) নিশ্চয় নগণ্য। তার মধ্যে আছে তথ্য ঘাটতি এবং নাটকীয় ও মর্মান্তিক বাঁক, যা গত চার দশকের সংঘর্ষমূলক রাজনীতির উৎস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকছে। এ কথায় হাসির রোলের ভেতর তিনি আরো বললেন, একই ঘটনার ব্যাখ্যা নির্ভর করে ব্যাখ্যাকারীর চিন্তারীতির ওপর (Idiosyncrasy of interpreter)। উদাহরণস্বরূপ টানলেন লর্ড অচিনলেকের দ্বিতীয় বিয়ের বিতর্ক। কেউ বলল, দ্বিতীয় বিয়েটি অচিনলেকের প্রথম স্ত্রীর স্মৃতির প্রতি চরম অবমাননা। অন্যপক্ষ বলল, না এটা তা নয়, বরং যদি তিনি দ্বিতীয় বিয়ে না করতেন তাহলে ধারণা করা হতো যে অচিনলেকের প্রথম স্ত্রী তার ব্যবহারে বিয়ের প্রতি নিদারুণ বিরক্তি সৃষ্টি করেছিল। দ্বিতীয় বিয়ে করে তিনি তার প্রথম স্ত্রীর প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করলেন এ অর্থে যে তিনি প্রথম স্ত্রীর কাছ থেকে এমন বিয়ের আনন্দ পেয়েছেন যে দ্বিতীয় বিয়ে করে সেই আনন্দটুকু ধরে রাখতে চেয়েছেন মাত্র। অতএব বাংলাদেশের অগ্রগতি আর অধোগতি নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে।

পাঁচ.

তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে প্রমাণ করেছেন বাংলাদেশের অগ্রগতি সন্তোষজনক, যা আলোকিত এবং সর্বজন গ্রহণযোগ্য দিক। আবার পরবর্তী সময়ে তুলে ধরেছেন আশার আলো এবং সন্দেহের ছায়ায় ঘেরা আধো আলোকিত এলাকা। মাথাপিছু আয়ের নিরিখে দারিদ্র্য কমেছে, কিন্তু সরকারি হিসাব অতিরঞ্জিত এবং আপেক্ষিক দারিদ্র্য উপেক্ষিত। দ্বিতীয়ত, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এখনো সংহত হয়নি। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তার ছাপ রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সুশাসন দ্বারা সমর্থিত নয়। উন্নয়নের নিচু স্তরে খারাপ শাসন প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা নয়। অর্থাৎ এ স্তরে প্রবৃদ্ধি ও সুশাসনের সম্পর্ক নেই, কিন্তু প্রবৃদ্ধির উঁচু স্তরে সুশাসনের অনুপস্থিতি ধীরে ধীরে বড় বাধা হিসেবে আবির্ভূত হয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন টেকসই হবে যদি শাসন ব্যবস্থার উন্নতি ঘটানো যায়। এবং সবশেষে বাংলাদেশের অন্যতম প্যারাডক্স হচ্ছে এই যে তার রাজনীতি আর অর্থনীতি বিপরীতমুখী পথে চলছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল দুর্বল, কিন্তু অপূর্ব সমজাতি নিয়ে যেকোনো রাজনৈতিক ঝড় মোকাবেলায় রাজনীতি ছিল শক্ত। আজ অর্থনীতি স্পন্দমান, কিন্তু বিভাজিত রাজনীতির কালো ছায়ায় আবৃত। দুটো অশুভ প্রবণতার কথা বলতেই হয়—এক. আনুক্রমিক সরকারগুলো ভালো ও মন্দের তফাত করতে ব্যর্থ হয়ে সমাজের উৎসাহ কাঠামো ধ্বংস করেছে এবং দুই. ক্ষয়িষ্ণু ধৈর্যের মাত্রা মারামারি ও কাটাকাটির রাজনীতি এবং সংঘর্ষের দুষ্টচক্র তৈরি করেছে। এ অলক্ষুনে প্রবণতাগুলো রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দুষ্ট শক্তির জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশের উচিত হবে খুব দ্রুত তার বিগত ৪০ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়া। জর্জ সান্তায়না নামে এক দার্শনিক হুঁশিয়ার করে বলেছেন, ‘যারা অতীত স্মরণ করতে পারে না, ভুল পুনরাবৃত্তি করতে তারা বাধ্য।’

 

আব্দুল বায়েস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতির অধ্যাপক

বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক