ব্যক্তিগতভাবে ঠিক কবে ও কোথায় ড. রওনক জাহানের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে, তা মনে নেই। ষাটের দশকে আমরা দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম। তবে পরস্পরের সঙ্গে আমাদের পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়নি। তাছাড়া আমাদের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপরীত লিঙ্গের কারো সঙ্গে পরিচিত হওয়াটাও খুব একটা সহজ ছিল না।

আমি তার সম্পর্কে জানতাম। কারণ ভালো ছাত্রী হিসেবে রওনকের সুখ্যাতির পাশাপাশি তাকে ঘিরে এক ধরনের চর্চা ছিল, যা তাকে আলাদা করে তোলে। রওনক ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী, আমি পড়তাম ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে, আমরা দুজনই উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় পাড়ি জমাই। রওনক হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আর আমি পড়তে গেলাম শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইউওসি)। আমাদের দেখা হলো শিকাগো ক্যাম্পাসে। কেননা সে সময় সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের অন্যতম কেন্দ্র ছিল এটি। আর রওনক তখন এই ফিল্ডের উদীয়মান একজন গবেষক। তবে রওনকের সঙ্গে আমার সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিটি হচ্ছে ১৯৭০ সালের গ্রীষ্মে, আমরা যখন নিউইয়র্কের রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই তখন। আমি গিয়েছিলাম সামার স্কুলের শিক্ষক হিসেবে, আর রওনক এসেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট আয়োজিত সেমিনারে অংশ নিতে। সেমিনারের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল পাকিস্তান। ততদিনে ‘পাকিস্তান: ফেইলিয়র ইন ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন’ নামে যুগান্তকারী পিএইচডি থিসিসের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষস্থানীয় গবেষক পণ্ডিত হয়ে উঠেছেন রওনক।

তাই স্বাভাবিকভাবেই সেমিনারে রওনক ছিলেন একজন তারকা বক্তা। আমেরিকার পাশাপাশি অন্যান্য দেশের গবেষক-পণ্ডিতরাও সেদিন ওখানে উপস্থিত ছিলেন। যেমন ঢাকা থেকে গিয়েছিলেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। যদিও আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই যে অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সঙ্গে রওনক জাহানের ওটাই প্রথম পরিচয় কিনা, যার সূত্র ধরে ২০০৫ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সময়টি তাই বিভিন্ন কারণেই স্মরণীয় হয়ে আছে। পাকিস্তানের আসন্ন বিপর্যয় নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো এ বৈঠকের মাধ্যমেই আলোচনা শুরু হয়। এমনকি এ বৈঠকের এক বছরের মধ্যেই ধ্বংসের চূড়ায় পৌঁছে পাকিস্তান। রওনক তার গবেষণায় পাকিস্তান ভূখণ্ডের সুদূরপ্রসারী দুটি ডানাকে একত্র করতে নীতিনির্ধারকদের ব্যর্থতার অন্তর্নিহিত কারণগুলোকে খুব সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেছিলেন। যার সূত্র ধরে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ ঘটে এবং বাংলাদেশের জন্ম হয়।

বিশ্লেষাত্মক দক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা ও বিচক্ষণতা দিয়ে বুদ্ধিজীবী মহলে রওনক নিজের জায়গা তৈরি করেন। কিন্তু আমি মনে করি রওনকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হচ্ছে বাংলাদেশ সৃষ্টিতে তার গবেষণাকাজের বাস্তবিক প্রভাব। ১৯৭১ সালে আমরা যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেছি, তারা আমেরিকান সাধারণ জনগণকে প্ররোচনা করতে ও আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে রওনকের কাজকে ব্যবহার করেছি, তার গবেষণার যুক্তিগুলোকে তুলে ধরেছি। তার গবেষণা আমেরিকার পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবীদের কাছে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি ব্যর্থ একত্রকরণের বিপরীতে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে সাহায্য করেছিল। এমনকি পাকিস্তানের নিষ্ঠুর শাসকদের প্রতি তত্কালীন নিক্সন সরকারের প্রবল সমর্থন থাকা সত্ত্বেও তারা বাংলাদেশের স্বার্থকে শক্তিশালীভাবে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৯৭০ সালে রচেস্টারে ওই স্মরণীয় বৈঠকের পর, রওনককে আরো ভালোভাবে জানার সুযোগ হয় আমার। এভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বও গাঢ় হয়েছে। তারপর বিভিন্ন সময়ে আমাদের বহুবার দেখা হয়েছে। ১৯৭২ সালে রওনক হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার ফিরে আসার পর বিভিন্ন আয়োজনে তিনি আমার অতিথি হয়ে এসেছেন। আর আমিও ত­­­ার বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নিয়েছি। পরবর্তী ৫০ বছর রওনক ও আমি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কিন্তু একই শহরে একই সময়ে বসবাস করেছি। দেশ স্বাধীনের পর ঢাকা ছাড়াও আমরা সুইজারল্যান্ডের জেনেভা ও মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে একই সময়ে অবস্থান করি। কুয়ালালামপুরে ১৯৮২-৮৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের এশিয়া প্যাসিফিক ডেভেলপমেন্ট সেন্টারে (এপিডিসি) ইন্টিগ্রেশন অব ওমেন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি, আমি তখন এখানে ইউএনএইচসিআরের আঞ্চলিক প্রতিনিধি ছিলাম। জেনেভায় ১৯৮৫-৮৯ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হয়ে গ্রামীণ নারী, কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন বিভাগের প্রোগ্রামপ্রধান হয়ে কাজ করেন রওনক, আর আমি কর্মরত ছিলাম জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) অফিসে।

জাতিসংঘ থেকে অবসর গ্রহণ করে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসার পর রওনক ও আমি আমাদের অভিন্ন স্বার্থগুলো নিয়ে একত্রে কাজ করতে উদ্যোগী হই। এরপর ২০০২ সালে আমরা আমাদের অন্যান্য সতীর্থ সহযোগী ও দেশের বরেণ্য আলোকিত ব্যক্তিদের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশে দারিদ্র্যবিষয়ক গবেষণা প্রচারে নিবেদিত বেসরকারি উদ্যোগ রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ (আরআইবি) প্রতিষ্ঠা করি। কোনো ধরনের শর্ত ছাড়াই আমরা আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে নেয়ার জন্য ডাচ সরকারের কাছ থেকে কয়েক দফা তহবিল পাই। সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হওয়ার পাশাপাশি কীভাবে সবচেয়ে সেরা সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করা যায়, সে বিষয়ে রওনক আমাদের বড় ধরনের সহযোগিতা করেছেন। রওনক ও আমি ছাড়া আরআইবির অন্যান্য প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও যারা পরে আমাদের পরিচালনা পর্ষদে যোগ দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন ড. হামিদা হোসেন, অধ্যাপক আনিসুর রহমান, মনোয়ারুল ইসলাম, ড. জাফর ইকবাল, অধ্যাপক মইনুল ইসলাম, লেখক সেলিনা হোসেন, অধ্যাপক এমএম আকাশ এবং অধ্যাপক গীতিয়ারা নাসরীন, যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপরিচিত ও দেশবরেণ্য।

আমরা একসঙ্গে মিলে দেশ থেকে দারিদ্র্য বিমোচনে একটি অনন্য পথ তৈরি করেছি। আমাদের প্রাথমিক ফোকাস ছিল দেশের সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দিকে, যারা সে সময়ে ‘নিখোঁজ দারিদ্র্য’ হিসেবে পরিচিত ছিল, কারণ দেশের উন্নয়ন কর্মসূচিতে তাদের অন্তর্ভুক্তি ছিল না। আমরা অংশগ্রহণমূলক কর্মগবেষণা (পিএআর) পদ্ধতি গ্রহণ করি। যার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আমাদের পরিচালনা পর্ষদ সদস্য অধ্যাপক আনিসুর রহমান। আমাদের স্বপ্নকে বাস্তবায়নে এ উদ্যোগ নেয়া হয়। আমাদের স্বপ্নের অন্যতম লক্ষ্য, ওই সব দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করা যাদের অবস্থার উন্নয়নে আমরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার পাশাপাশি তাদের দুরবস্থা পরিবর্তনে তাদের নিজেদের অন্যতম এজেন্ট হতে সাহায্য করতে চেয়েছি। কর্ম গবেষণার ক্ষেত্রে অবদানের জন্য এবং যে সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে কাজ করেছে তাদের পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রভাব রাখার জন্য আরআইবি আজ বাংলাদেশের পাশাপাশি বিদেশেও স্বীকৃত। আমাদের কর্মপদ্ধতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিশ্চিত করতে রওনকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

অধ্যাপক রওনক জাহানের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের বয়স আজ অর্ধশতাব্দীরও বেশি। কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনে আমরা অনেক ভালো বন্ধু। যেকোনো অনুষ্ঠানে বা সামাজিক আয়োজনে রওনক চমত্কার একজন সঙ্গী। তার সহজাত হাসি ও মজার সব মন্তব্য আমাদের অনেক আড্ডা-আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। বুদ্ধিবৃত্তিক সাধনার ক্ষেত্রে তার সক্রিয় অংশগ্রহণের সঙ্গে আগামী অনেক বছরের জন্য আমি তার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।

 

ড. শামসুল বারী: চেয়ারম্যান, আরআইবি