আমার মা, রওশন জাহান, স্নেহের সঙ্গে আমার খালা অধ্যাপক রওনক জাহানকে ডাকতেন, ‘লিটল টর্নেডো’ বলে। এমন একটি ডাকনাম প্রাপ্তির অর্থ কিন্তু মোটেও এটা নয় যে তিনি তার চারপাশের সবকিছুকে এলোমেলো বিধ্বস্ত করে দিতেন। বরং তিনি এমন এক সৃজনশীল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন, যা অতি অল্প সময়ে তার পরিবারের কাজের গতিপথকে পরিবর্তন করে দিয়েছিল। আমরা যারা রওনক জাহানের ভাতিজি ও ভাতিজা তারা তাকে ডাকি বড় খালা বলে, (যদিও তিনি তার বোনদের মধ্যে সবার বড় নন)। তিনি কখনই ‘মেজো’ বা বাড়ির দ্বিতীয়জন হতে চাইতেন না। যদিও পরিবারের অন্যান্য অনেক মেজো সন্তানের মতো তিনি স্বেচ্ছায় পরিবারের অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

আমি মনে করি, আমার খালা এক ধরনের প্রবর্তক স্পৃহার অধিকারী। তিনি চ্যালেঞ্জ নিতে ইচ্ছুক, কিন্তু একই সঙ্গে বাস্তববাদী এবং বিকল্প দিকগুলোর কথাও চিন্তা করতে পারদর্শী। তিনি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, সংগঠিত ও নিয়মনিষ্ঠ মানুষ। তাকে নিয়ে আমার শৈশবের স্মৃতি অনেকটা এমন যে তিনি বিদেশের কোনো একটি জায়গা থেকে জাতিসংঘে তার কর্মস্থল কুয়ালালামপুর কিংবা আইএলওর হয়ে জেনেভায় ফিরছেন। ওই সময় হাতে গোনা খুব অল্প কয়েকজন বাংলাদেশী নারী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করতে সমর্থ হয়েছেন। হঠাৎ করেই তিনি তার পরিবারের অন্য নারীদের চেয়ে আলাদা হয়ে উঠলেন। শৈশবে আমার কাছে তখন তার বিদেশ ভ্রমণকে ভীষণ রোমাঞ্চকর মনে হতো। বিষয়টি খুব তাত্পর্যপূর্ণ যে একজন ব্যক্তি তার মেধা, পরিশ্রম ও সাহসের ভিত্তিতে নিজেই নিজের পথ তৈরি করতে পারেন। অন্য নারীদের মতো বাংলাদেশে তিনি গার্হস্থ্য জীবন কাটাননি কিংবা কোনো পুরুষ আত্মীয়ের ওপরও নির্ভর করেননি।

অনেক পরে আমি যখন একজন উন্নয়ন গবেষক হিসেবে কাজ শুরু করেছি তখন বড় খালার সঙ্গে আমার বেশির ভাগ আলোচনাই হতো আন্তর্জাতিক তহবিল সংগ্রহ বা উন্নয়ন সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অসুবিধাগুলো নিয়ে। উন্নয়ন ইস্যুতে আমাদের আলোচনাগুলো হতো উদ্দীপক এবং তার প্রজ্ঞা আমাকে অনেক সমৃদ্ধ করেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ এবং জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নিয়ে তার পাণ্ডিত্য এবং প্রকাশনার বিষয়টি সর্বজনবিদিত। যুক্তরাজ্যের ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে স্নাতকোত্তর অধ্যয়নের সময় অনেকবার আমার শিক্ষক ও সহপাঠীরা তার কাজের রেফারেন্স দিয়েছেন। তার লেখা ‘দ্য ইলুসিভ এজেন্ডা’ বইটি ছিল আমাদের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। আমাদের শিক্ষক যখন জানতে পারলেন যে রওনক জাহান আমার খালা, তখন তিনি ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহকর্মীদের থেকেও আমি একই ধরনের প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। বাংলাদেশ নিয়ে তার করা কাজগুলো সবসময় স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমার সবসময় এটা ভেবে অবাক লাগে যে তিনি যে সময়ে তার গবেষণার মাধ্যমে পাকিস্তান ভেঙে যাবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, সে সময় তার বয়স মাত্র ২৫-২৬। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন আমার সিনিয়র সহকর্মীদের অনেকেই তার বিস্তৃৃত প্রকশনা—রাজনীতি, নারী অধিকার, নারী উন্নয়ন এসব বিষয়ে উল্লেখ করে বলতেন যে তারা রওনক জাহানকে নিয়ে গর্ব বোধ করেন।

তিনি ভীষণ স্নেহময়ী মানুষ। বিভিন্ন দেশ ভ্রমণকালে তিনি আমাকে ও আমার ভাইদের পোস্টকার্ড পাঠাতেন। সেখানে বড়জোর তিন-চারটি লাইন লেখা থাকত...‘হ্যালো, আমি ফ্লাইটে করে...স্থানে যাচ্ছি। তুমি কেমন আছ? অনেক আদর ও ভালোবাসা নিও।’ হতে পারে চিঠিগুলো খুবই সংক্ষিপ্ত, তবে তা থেকে বোঝা যায় যে তিনি কতটা ব্যস্ত এবং তার লেখা এ তিন লাইনের মানে হচ্ছে সবকিছুর পরও তিনি আমাদের কথা মনে রেখেছেন। তার সবচেয়ে প্রশংসনীয় গুণগুলোর একটি হচ্ছে তিনি কারো চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দেন। তা তিনি যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন কিংবা তার জীবনে যা-ই ঘটুক না কেন, তিনি ই-মেইল বা চিঠির জবাব দেবেন অথবা ফোন করবেন।

নতুন কোনো রেস্তোরাঁ বা কফিশপে খেতে যাওয়া কিংবা নতুন কোনো সিনেমা দেখতে নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে জীবনের নতুন, অভিনব ও ছোট ছোট আনন্দের সঙ্গে তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে নিজেও আনন্দ পেতেন। মনে আছে আমার ছোট ভাই ক্লাসে ভালো করায় বড় খালা তাকে আশির দশকের ওই সময়টাতে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে (পরবর্তী সময়ে শেরাটন) নিয়ে গিয়ে হট চকোলেট খাইয়েছিলেন, সেটা ছিল সেই যুগে একটা দুর্লভ প্রাপ্তি। এক গ্রীষ্মে আমি তার সঙ্গে নিউইয়র্কে। তিনি আমাকে গ্রিনিচ ভিলেজ যা দারুণ একটি টুরিস্ট এলাকা সেখানে খেতে নিয়ে গেলেন। এছাড়া লিংকন সেন্টারে ব্যালে নাচ ও সিনেমা দেখিয়েছিলেন। তিনি রান্নায় খুব একটা পটু ছিলেন না। মনে আছে, প্রথম রাতে তিনি যখন খিচুড়ি রান্নার চেষ্টা চালালেন, শেষমেশ চাল-ডাল মিলেমিশে একাকার হয়ে অনেকটা আটার মণ্ডের মতো তৈরি হলো। তা দেখে খালা হাসতে শুরু করলেন। এরপর আমরা রেস্তোরাঁয় খেতে গেলাম। এ ধরনের মুহূর্তগুলো হেসে উড়িয়ে দেয়ার দুর্দান্ত গুণ রয়েছে বড় খালার।

তিনি ভীষণ সাহসী একজন মানুষ। যত কঠিন পরিস্থিতিই হোক না কেন তিনি প্রশ্ন করতে পিছপা হন না। এটা তার কাজের ক্ষেত্রে এবং ব্যক্তিজীবনেও সত্য। আবার যখন কোনো প্রয়োজন হয়, তখন তিনি সাহায্য চাইতেও বিব্রত হন না, বিশেষ করে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে। তার জীবন থেকে আমরা দারুণ সব শিক্ষা নিতে পারি। একবার বড় খালা আমাকে বলেছিলেন, কেউ যদি তার পরিবার কিংবা বন্ধুদের সাহায্য করতে চায়, তাহলে কোনো কিছু প্রাপ্তির আশা এবং সাহায্যপ্রাপ্ত ব্যক্তির ওপর কখনো কোনো ধরনের বিরক্তি প্রকাশ না করেই তা করা উচিত। শুধু লোক দেখানোর জন্য কিছু করা উচিত নয়। এতে ব্যক্তির নিজের কাজের আনন্দ নষ্ট হয়ে যায়। তার এ কথাগুলো জীবনে আমাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছে।

 

ড. সোহেলা নাজনীন: যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের ফেলো