দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়ে নবীনগরের প্লাবনভূমিতে ভাইয়ের (আকবর আলি খান) জন্ম। প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রগুলো থেকে অনেক দূরে অবস্থিত হওয়ায় আমাদের ছোট্ট শহরে কোনো গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়নি। এটা এমন এক সময় ছিল, যখন ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীসৃষ্ট দুর্ভিক্ষে বাংলা অঞ্চল পর্যুদস্ত হয়েছিল। মূলত অগ্রসরমাণ জাপানি সেনাবাহিনীরকে রুখতে খাদ্য সরবরাহ বন্ধের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।

জন্ম থেকেই ভাই একটা ক্রান্তিকালের মধ্যে পড়েছে। আমাদের পরিবারকে গ্রামবাংলার একটা গ্রামীণ জীবনের উত্তরণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে এবং নতুন দেশের বিরুদ্ধস্রোতে খানিকটা অবহেলিতও হতে হয়েছে। তার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো বাংলার স্বাধীনতার লড়াইয়ের উত্তাল সময়ের ভেতর দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। কর্মজীবনের প্রাথমিক বছরগুলোও পড়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে। হবিগঞ্জের এসডিও থাকাকালীন তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ হোন এবং দেশকে স্বাধীন করতে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে লড়াই করেন। আবার চাকরিজীবনের উচ্চ পদে আসীন থাকার সময় তিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচনে নিজেকে নিবিড়ভাবে ব্যাপৃত রাখেন এবং দেশের জনগণের সেবায় গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন।

এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা যাক। নবীনগরের প্লাবনভূমিতে বেড়ে ওঠার কারণে সাঁতার জানাটা ভাইয়ের জন্য খুবই স্বাভাবিক ছিল, অথচ তিনি সাঁতার জানেন না। আসলে পঞ্চাশের দশকে দুই দফা বন্যার সময়ে আমাদের বাড়ির আঙিনা অনেকটা সুইমিং পুলে পরিণত হওয়ার কারণে তিনি সাঁতার শেখার কোনো চেষ্টাই করেননি। কিন্তু সাঁতার জানে না বলে তিনি পরবর্তী জীবনে কখনো বন্যাকে ভয় পাননি। বর্ষা মৌসুমে আমরা ভাঙাচোরা রাস্তা পার হয়ে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যেতাম। তিনি কখনো ভয় পাননি, বরং সাহসের সঙ্গে প্রতিকূলতা মোকাবেলা করেছেন।

আমরা দুজনই নবীনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে যেতাম। ভাই উচ্চতর শ্রেণীতে পড়তেন। ওই বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শাখা পড়াতেন দখিনা বাবু। ভর্তির জন্য তখনো বয়স না হলেও আমি মাঝে মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সম্মিলিত ক্লাসে যেতাম এবং ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে বসে বড়দের কী নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে, তা লক্ষ করতাম।

সম্ভবত চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণী হবে, তখন বর্ষাকালে আমাদের বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ বন্যার পানিতে ডুবে যায়। ক্লাস শুরু হওয়ার আগে আমাদের বন্ধুদের একটা দল একটা ধোড়া সাপের বাচ্চাকে ঘিরে দিয়েছিল। ওই ছোট প্রাণীটা পানি থেকে একটা উঁইঢিবিতে ওঠার চেষ্টা করছিল এবং তার মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট স্বর বেরোচ্ছিল। প্রতিবার যখনই সাপটি ওঠার চেষ্টা করছিল, আমরা তাকে লেজ ধরে টেনে নিচে নামাচ্ছিলাম। অবশেষে কোনো উপায় না পেয়ে সে আমার পায়ে কামড় দিল এবং পালিয়ে গেল। একটু ব্যথা ছিল, কিন্তু আমি নির্বিকারভাবে ক্লাস করতে গেলাম। এরই মধ্যে সাপে কাটার খবর দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ল এবং যথারীতি সেটা ভাইয়ের কানেও পৌঁছতে সময় লাগেনি। প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে ভাই দ্রুত আমাদের ক্লাসে এসে আমাকে বাড়ি নিয়ে গেলেন এবং সেখান থেকে কার্বলিক অ্যাসিড দিয়ে ক্ষতস্থানে ছ্যাঁকা দিতে একটা স্থানীয় ওষুধের দোকানে পৌঁছলেন। ভাই সাধারণত ক্লাসে প্রথম হতেন, কিন্তু খেলাধুলা ও অন্যান্য বিনোদনমূলক কাজে খুব একটা সক্রিয় থাকতেন না। অন্যদিকে ডিস্টিংশন ছাড়া এক শ্রেণী থেকে আরেক শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হতে পারলেও আমি বরং খেলাধুলা, স্কাউটিং এবং পরবর্তী সময়ে শিকারে অধিক আগ্রহী ছিলাম।

আমরা নবীনগরে একসঙ্গে স্মৃতিমধুর ১৩টি বছর কাটিয়েছি। আমরা তাকে শুধু ভাই বলি, কোনো বিশেষণ যোগ করি না, কিন্তু এটিই তার প্রতি আমাদের অনুরাগ ও প্রশংসার মেলবন্ধনের সুতা। ভাইবোনদের প্রতি তার আদর-যত্ন ও সহানুভূতি ছিল আমাদের জন্য পরম আশীর্বাদস্বরূপ। তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

 

জিয়া খান: ড. আকবর আলি খানের ভাই