১৯৬২ সালের কথা। আমরা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র। বছরটি ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নবজাগরণের গৌরবোজ্জ্বল সময়কাল। স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকারের গণবিরোধী শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন নব কলেবরে সর্বত্র বিকশিত ও সংগঠিত হচ্ছে। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে একঝাঁক তরুণ কর্মী ছাত্র ইউনিয়নের পতাকাতলে সমবেত হয় এবং হল সংসদ নির্বাচনে এককভাবে অংশগ্রহণ করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। অল্পের জন্য নির্বাচনে হেরে গেলেও এ ছিল সবার জন্য এক বিরাট বিস্ময়। আমাদের এ নবাগত ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীদের মধ্যে সেদিন সবার মধ্যমণি ছিলেন আকবর আলি খান। সে যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মেধাবী ছাত্র, ক্ষুরধার লেখনীর অধিকারী ও সারগর্ভ বিশ্লেষণাত্মক বক্তৃতার জাদুকর আকবর আলি খান হল সংসদের নির্বাচনে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

আমরা আমাদের নির্বাচনী মঞ্চের নাম দিয়েছিলাম ‘জাগৃতি’। নির্বাচনের পরে ‘জাগৃতি’ নামে একটি ম্যাগাজিনও বের করেছিলাম আমরা। আকবর আলি খান ছিলেন সম্পাদক। আমি ছিলাম প্রকাশক। এই ম্যাগাজিনে ‘অন্য আমেরিকা’ নামে আকবর আলি খানের একটি অসাধারণ তথ্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, নয়া উপনিবেশবাদের বিশ্বজোড়া শোষণ নির্যাতনের পাশাপাশি খোদ আমেরিকার সাধারণ নিরীহ মানুষ, বিশেষত অশ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মানবেতর জীবনযাপনের মর্মন্তুদ কাহিনী সেই প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছিল। নিঃসন্দেহে তা ছিল এক প্রচণ্ড প্রতিবাদী আওয়াজ। সারা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবন্ধটি সেদিন অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

আকবর আলি খান ও আমি একই বিভাগের ছাত্র ছিলাম। সেই সময় আমাদের ইতিহাস বিভাগের আরো যারা উল্লেখযোগ্য ছাত্র ছিলেন তারা হলেন শরীফউদ্দীন আহমেদ কচি, এটিএম আফসার, আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, ইসমাইল হোসেন, কামরুল আহসান চৌধুরী, আবু মোহাম্মদ সিরাজ, সোলায়মান খান মজলিশ প্রমুখ। কিন্তু আমাদের সবার চেয়ে আকবর আলি খান ছিলেন একটু স্বতন্ত্র ও আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। পাণ্ডিত্যের অহংকার বর্জিত তার দৈনন্দিন জীবনধারায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত বন্ধুবৎসল। আমরা যারা প্রায় সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে ক্লাসের দৈনন্দিন পাঠ অনুধাবন এবং টিউটোরিয়াল কাজে অবধারিতভাবে পশ্চাত্পদ হয়ে পড়তাম তাদের জন্য একমাত্র ভরসাস্থল ছিল আকবর আলি খান। আমার আজও মনে পড়ে অনার্স ও এমএ দুটি পরীক্ষাতেই আকবর আলি খানের নোট ছিল আমার একমাত্র সম্বল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সমাপনান্তে আকবর আলি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগদান করবেন এবং সেখানে সাফল্যের বরমাল্য অর্জন করবেন সে কথা ছিল একদম নিশ্চিত। বাস্তবে ঘটেছিলও তাই। একজন দক্ষ ব্যুরোক্র্যাট হিসেবে আকবর আলি খান জীবনের সর্বক্ষেত্রে তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রথমে ইতিহাসের ছাত্র হয়েও পরে অর্থনীতি শাস্ত্রে কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। সরকারের অর্থসচিব, কেবিনেট সচিব, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা তথা সর্বক্ষেত্রে আকবর আলি খান অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সার্থকতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দীন সরকারের উপদেষ্টা পদ থেকে তার পদত্যাগের বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত সেদিন দেশবাসীকে বিস্মিত করেছিল।   

অত্যন্ত কঠোর নীতিপরায়ণ মানুষটি জীবনে কখনো পথভ্রষ্ট হননি, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। তাদের সময়ের ব্যুরোক্রেসি আজকের মতো পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছিল না। কিছুকাল আগে দৈনিক প্রথম আলোর সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে কঠোর ভাষায় তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সমালোচনা করে প্রশাসনকে রাহুমুক্ত করার পরামর্শ দান করেন। অন্য এক সাক্ষাত্কারে বিগত ২৩ জুলাই তিনি বলেন, সেন্ট্রালাইজেশন অব পাওয়ার ইজ আ ব্যাড ওমেন ফর ডেমোক্রেসি।

বস্তুত আকবর আলি খান অবসর জীবনেও তার সীমিত পরিসরে আমাদের চিন্তা ও চেতনার জগতে যে উজ্জীবনী শক্তি হিসেবে কাজ করে গিয়েছেন তার তুলনা হয় না। মহান আল্লাহ তাকে দীর্ঘ জীবন দান করুন।  

 

মোস্তফা জামাল হায়দার: রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী