শৈশবে ছোটবুর (রওনক জাহান) সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা একটু কমই ছিল। বড়বু (রওশন জাহান) ও ছোটবু (রওনক জাহান) কাছাকাছি বয়সের হওয়ায় তাদের সখ্য যেমন বেশি, তেমনি তারা ছিল পরস্পরের বেস্ট ফ্রেন্ড। আমার বন্ধুত্ব ছিল ভাইদের সঙ্গে। এমনকি ভাইদের সঙ্গে মিলিয়ে নিজের নামও রেখেছিলাম, তাদের মতো ছেলেদের পোশাক পরে ঘুরতাম, যেন আমি তাদের সঙ্গে বাইরে গিয়ে খেলতে পারি। আমার বড় দুই বোনের গল্প করা আর তাদের পরস্পরের সিক্রেট ভাগাভাগির বিষয়গুলো দেখে ছোটবেলায় আমি খানিকটা ঈর্ষিতও হতাম, কারণ তাদের জগতে একেবারেই কোনো প্রবেশাধিকার ছিল না আমার। তাছাড়া বয়সে আমি তাদের তুলনায় এতটাই ছোট ছিলাম যে আমাকে একদমই তারা ‘পাত্তা’ দিতেন না।

১৯৭০ সালের নভেম্বরে ছোটবু যখন হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি নিয়ে এবং কলাম্বিয়া থেকে পোস্টডক্টরাল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন মূলত তখন থেকে আমাদের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। নির্বাচন নিয়ে ছিল উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা। আমার মনে পড়ে ছোটবু ও পরিবারের অন্যদের সঙ্গে আমরা পুরান ঢাকায় গিয়েছি শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে। ভীষণ ভিড়ের মধ্যে আমি ও ছোটবু রিকশার ওপর উঠে দাঁড়ালাম, যেন আমরা আমাদের ‘মুজিব ভাইকে’ দেখতে পারি। রিকশাচালক আমাদের ওপরে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেছিলেন। ছোটবু ক্যামেরা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবি তুলেছিলেন।

দুঃখজনকভাবে, ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে ছোটবু ঢাকায় ফিরে আসার দু মাসের মধ্যে বাবা আমাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে গেলেন। তার মৃত্যুতে আমরা শোকে বিহ্বল হয়ে পড়ি। ছোটবু তখন সত্যিকার অর্থেই পরিবারের প্রধানের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন। মার্চের শুরুতে পাকিস্তান সরকার জাতীয় সংসদ স্থগিত করলে গোটা বাংলাদেশ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। এরপর আসে ২৫ মার্চের ভয়াবহ কালরাত। রাস্তায় রাস্তায় সারিবদ্ধ ট্যাংক, পাকিস্তানি সেনাদের তাণ্ডব, নির্বিচার গোলাগুলির শব্দ ও আগুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নিউমার্কেট ও পিলখানা এলাকার কাছে আমাদের এলিফ্যান্ট রোডের বাসা থেকে আমরা দেখেছি এবং শুনেছি মা, ছোটবু, আমি ও ছোট ভাই।

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম শুরু হলো। মনে আছে, আমাদের পাশাপাশি মা-ও ছোটবুর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেছেন, যদিও তখন ছোটবুর বয়স মাত্র বিশের কোটায়। মা-বাবার কাছে আমরা পরম যত্নে বড় হয়েছি, সব ধরনের বিপদ থেকে তারা আমাদের রক্ষা করেছেন, বিভিন্ন সময় পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু হঠাৎ খুব অল্প বয়সেই আমাদের সুরক্ষা ঢালটি ভেঙে যায়, আমরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়ি এবং সত্যিকারের ভয়ংকর এক পৃথিবীর মুখোমুখি হই। নিপুণ দক্ষতায় ছোটবু পরিস্থিতির হাল ধরলেন। আমি মুগ্ধতার সঙ্গে দেখলাম, আমার বোন আমাদের পরিবারের অভিভাবক হয়ে উঠলেন, এমনকি আমার মায়েরও।

বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছোটবুর অগ্রগামী ভূমিকা উল্লেখযোগ্য, বিশেষ করে আমরা যদি নারী আন্দোলন প্রসঙ্গে বলি। স্বাধীনতার পর পরই তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে নারী অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, একই সঙ্গে গবেষণা পরিচালনা এবং নীতি প্রণয়নকে প্রভাবিত করার জন্য গবেষণানির্ভর তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করাটাও সমান গুরুত্বের। বিষয়টি উপলব্ধি করে তিনি সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে ১৯৭৩ সালে ‘ওমেন ফর ওমেন: আ রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডি গ্রুপ’ নামে একটি উদ্যোগ শুরু করেন। যার শুরু আমাদের বসার ঘর থেকে আমার মায়ের হাতে তৈরি চা-নাশতা খেতে খেতে।

তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের প্রথম ধাপ হিসেবে ১৯৭৩ সালে তিনি ‘বাংলাদেশে নারীদের অবস্থান’ শিরোনামে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। গ্রামীণ নারীদের কণ্ঠগুলো তুলে ধরা এবং এ বিষয়ক সংলাপ আয়োজনের মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করতে থাকেন। আমাদের দেশের বেশির ভাগ নারী, বিশেষ করে গ্রামীণ নারীরা তাদের প্রাত্যহিক জীবনে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন, এজন্য তারা নিজেদের ভাগ্যকেই দোষারোপ করতে থাকেন। সে সময় শহুরে শিক্ষিত নারীরা গ্রামীণ নারীদের এসব সমস্যার সঙ্গে খুব কম পরিচিত ছিল। ছোটবুর গবেষণাটি শহরের শিক্ষিত নারীদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে সমর্থ হয়। এটি তাদের নারী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহী করে তোলে। তাছাড়া এ ধরনের গবেষণা ও প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তগুলো লিঙ্গ সমতা প্রতিষ্ঠা এবং নারী অধিকার আন্দোলনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তার এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়েই নারীদের অবস্থার ওপর বিভিন্ন গবেষণা পরিচালনা ও প্রকাশনার মাধ্যমে লিঙ্গ সমতার বিষয়টি অগ্রসর হতে শুরু করে।

১৯৭৩ সালে ছোটবু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম নারী ও সর্বকনিষ্ঠ চেয়ারপারসন হিসেবে নিযুক্ত হন। অধ্যাপনা ও বিভাগ পরিচালনার পাশাপাশি তিনি প্রচুর লেখালেখি করতে শুরু করেন—যা আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃতি এনে দেয়। তিনি ১৯৭৪ সালে বুখারেষ্টে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক জনসংখ্যা সম্মেলন ও ১৯৭৫ সালে মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত নারীবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রিত হন। ১৯৭৭ সালে ঢাকায় প্রথম নারীবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেন তিনি।

নারী আন্দোলনের সঙ্গে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যা ছিল ভীষণ জরুরি। তার প্রকাশনাগুলোর মধ্যে একটিতে তিনি দেখান যে বিশ্বজুড়ে যেখানে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী ছেলেশিশুর মৃত্যুর হার বেশি, বাংলাদেশে সেখানে বিপরীত চিত্র বিদ্যমান। এখানে ছেলেশিশুদের তুলনায় মেয়েশিশুদের মৃত্যুর হার বেশি। যা পরিবারের বোঝা হিসেবে বিবেচিত মেয়েদের প্রতি বৈষম্যের বিষয়গুলোকেই তুলে ধরে। অবশ্য স্বাধীনতার পরে ক্রমান্বয়ে সরকারের পক্ষ থেকে মেয়েশিশুদের মৃত্যুর হার কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার বৈশ্বিক হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচিতে সরকারের পরামর্শক হিসেবেও তিনি অংশ নিয়েছেন। নীতি প্রণয়নকে প্রভাবিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান বিষয়ের ওপর গবেষণা, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা প্রসারের জন্য ছোটবু সবসময় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। অনেকগুলো মৌলিক ও যুগান্তকারী বই লিখেছেন, যার শুরুটা হয়েছিল ‘পাকিস্তান: ফেইলিউর ইন ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন’ (১৯৭২) দিয়ে, বইটি ১৯৬৯ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পিএইচডি গবেষণার প্রকাশিত সংস্করণ। ১৯৯৫ সালে আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ শুরুর দুই দশক পর প্রকাশিত হয় তার লেখা ‘দি ইলুসিভ এজেন্ডা: মেইনস্ট্রিমিং উইমেন ইন ডেভেলপমেন্ট’ বইটি, যেখানে উন্নয়ন ও অগ্রগতির বিপরীতে লিঙ্গ একটি কেন্দ্রীয় উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করে অর্জিত অগ্রগতির পর্যালোচনা করে বিভিন্ন দেশের উন্নয়ন এজেন্ডা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে—এমন শীর্ষস্থানীয় দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় দাতা সংস্থা তার সঙ্গে দুটি দেশের কার্যক্রমের মূল্যায়ন করা হয়। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ২৫ বছর এবং ২০২১ সালে ৫০ বছর উপলক্ষে দুটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেন তিনি। ২০০০ সালে প্রকাশ করেন ‘বাংলাদেশ: প্রমিজ অ্যান্ড পারফরম্যান্স’।

আমার বোন, রওনক জাহান শিশুসুলভ সরলতার অধিকারী। কোনো ধরনের অভিযোগ ছাড়াই তিনি সাধারণ সব বিষয় আর প্রাত্যহিক জীবনকে উপভোগ করেন। তিনি বহু দেশে গিয়েছেন, বিভিন্ন সময় আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তার সঙ্গী হতে। একজন পরিপাটি গোছানো মানুষ হিসেবে তিনি ভ্রমণবিষয়ক বই পড়ে কোথায় কীভাবে ঘুরতে যাবেন, সে বিষয়ক সিদ্ধান্ত নিতেন। আমার কাজ ছিল শুধু তাকে অনুসরণ করা। এসব নিয়ে আমি খুব একটা পরিকল্পনা করতাম না—এজন্য তিনি প্রায়ই হতাশা প্রকাশ করতেন।

ছোটবুকে আমি আমার রোল মডেল হিসেবে অনুকরণের চেষ্টা করেছি। আফসোস, সফল হইনি। ‘কঠোর পরিশ্রম করো, তোমার সেরাটা দাও, আর কোনো পুরস্কারের প্রত্যাশা করো না’—আমি সবসময় তার এ পরামর্শ অনুসরণের চেষ্টা করি। বাবা-মা, ছোটবু ও ভাইবোনদের কাছ থেকে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও নীতির পাঠ শিখতে পেরে আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ।

 

নিলুফার আহমেদ: পরিচালক, মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশন, ওয়াশিংটন ডিসি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সমাজবিজ্ঞানী