১৯৮৬ সালের কোনো এক দিনের ঘটনা। ড. আকবর আলি খান তখন সাভারের বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের এমডিএস (মেম্বার ডাইরেক্টিং স্টাফ)। সদ্য কানাডা থেকে পিএইচডি ডিগ্রি করে দেশে ফিরেছেন। তাই তাকে হয়তো সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তখন কর্মকর্তাদের ক্যাম্পাসে থাকা ছিল বাধ্যতামূলক; ড. খানও তাই করছেন। যেদিনের কথা বলা হচ্ছে সেদিন গেস্ট হাউজে দুপুরে খেতে বসেছেন তিনি; বিদেশী একজন অতিথিও আছেন; ফ্যাকাল্টির অন্য কিছু সদস্য এবং জুনিয়র কর্মকর্তার সঙ্গে আমিও ডাইনিং টেবিলে উপস্থিত। আলোচনায় প্রসঙ্গ উঠল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মুক্তিযুদ্ধে যোগদান নিয়ে। দ্বন্দ্বটা হলো রাষ্ট্রের প্রতি সরকারি কর্মচারীদের অঙ্গীকার নিয়ে; তারা যেহেতু চাকরি সূত্রে সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ, তাই স্বাধীনতাযুদ্ধে যোগদান তাদের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের এবং সরকারের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত করে কিনা, তা নিয়ে। সরকার আর রাষ্ট্রের কিছুটা সমধর্মী ও ভিন্নতর চরিত্র, তাদের পার্থক্য, রাষ্ট্রের প্রতি, সমাজের প্রতি নাগরিকের একাত্মতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে আলোচনা এগিয়ে চলছিল। খাবারের টেবিলে ড. আকবর আলি খানই সরাসরি প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানকারী একমাত্র কর্মকর্তা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তত্কালীন সরকার তাকে চৌদ্দ বছরের জেল দিয়েছিল। তিনি আলোচনায় কিছুটা নীরবই ছিলেন। একপর্যায়ে বললেন, ‘আমি সরকারি কর্মচারীর পরিচিতিতে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিইনি বা সরকারি কর্মচারী ছিলাম বলে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলাম, তেমন নয়। আমি দেখেছিলাম, পাকিস্তান রাষ্ট্র মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে এবং করে চলেছে। তাই বিবেকবান, সমর্থ মানুষ হিসেবে আমার দায়িত্ব দাঁড়িয়েছিল সেই অপরাধের প্রতিবাদ করা এবং নিজেকে, নিজের জাতিগোষ্ঠীকে রক্ষা করার চেষ্টা করা। সরকারি কর্মচারীর পরিচিতি তখন আমার কাছে ছিল গৌণ অথবা অর্থহীন।’ আমরা বুঝতে পারছিলাম যে, ড. খান তখন এই ভূমে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে অস্বীকার করেছিলেন; সেই রাষ্ট্রে জাঁকিয়ে থাকা পাকিস্তানের একটি সরকার আছে, অধিকৃত একটি ভূখণ্ড আছে, সেনাবাহিনী আছে, আমলাতন্ত্র আছে; কিছু মানুষের সমর্থনও হয়তো আছে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্র পরিচিতি আছে, কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে তা অন্য একটি জাতিরাষ্ট্র হয়ে উঠেছে, তার প্রসববেদনা চলছে তখন, তিনি তা বুদ্ধিবৃত্তিক এবং ভৌতিক স্তরে দেখতে পেয়েছিলেন। তাই যুদ্ধে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

ড. খান স্বাধীনতার সেই যুদ্ধ চলার সময় আমাদের জাতিসত্তার কথা, আমাদের জাতিরাষ্ট্রের কথা লেখেননি, লিখেছেন আরো পরে; তার সেই লেখা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। কিন্তু অনুমান করা যায়, ইতিহাসের ছাত্র আকবর আলি খানের মননে, চিন্তায় সেই জাতিরাষ্ট্রের ধারণা বহু আগে থেকেই জাগরূক ছিল। যে বইতে তিনি তার সেই ধারণা তুলে ধরেছেন তার নাম ‘Discovery of Bangladesh : Exploration into Dynamics of a Hidden Nation’ (বাংলা অনুবাদে বইটি ‘বাংলাদেশের সত্তার অন্বেষা: একটি প্রচ্ছন্ন জাতির গতিপ্রকৃতির অনুসন্ধান’)। জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের এ প্রচ্ছন্ন চরিত্র তিনি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছেন। প্রথাগত ইতিহাস যা করে, ঘটনা পরম্পরা বর্ণনা করে, কী ঘটেছিল এবং কী ঘটে থাকতে পারে, মূলত তার বর্ণনা করেননি তিনি, তিনি বাংলার গ্রামবসতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিভক্তি ও সংঘাত এবং ধর্মান্তরণের গতিপ্রকৃতি তুলে ধরেছেন এবং একটি জাতিরাষ্ট্র যে সেসব শক্তি ও বাস্তবতার ক্রিয়া-বিক্রিয়ায় অনিবার্য হয়ে উঠছিল, তা বর্ণনা করেছেন। হয়তো বইটিকে কেবল ইতিহাস নয়, সমাজতত্ত্বের পুস্তকও বলা যায়। বইটি রচনার আগে ড. খান পিএটিসিতে বাংলাদেশের উদ্ভব নিয়ে বক্তৃতা করতেন। তার সেসব অধিবেশনে যোগ দিয়ে আমাদের মনে হয়েছিল, তিনি প্রকৃতি ও জনগোষ্ঠীর মিথস্ক্রিয়া এবং তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্মের কথা বলতে চেয়েছেন। বাংলা অঞ্চলের ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হলো তার পানির প্রতুলতা। তাতে বসতকারী লোকজনের বসতি স্থাপন তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মগত স্বাতন্ত্র্য এবং বিচ্ছিন্নতা তৈরি করেছিল। কঠিন যূথবদ্ধতা থেকে কিছুটা মুক্ত অবস্থায়, উপমহাদেশে কেন্দ্র থেকে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে তাই এখানকার জনগণের পক্ষে প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের রাশ থেকে স্বাধীন থাকার, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। তা-ই হয়তো এদেশে প্রভূত পরিমাণে ধর্মান্তরণের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। বর্তমান বাংলাদেশের এ অঞ্চল তাই হয়তো ধর্মগতভাবে এবং রাজনৈতিকভাবে আলাদা রূপ পেয়েছিল। আরো অনেক কারণ ছিল, ঐতিহাসিকদের বিশ্লেষণে তা ধরা পড়েছে। কিন্তু তখন নবীন সরকারি কর্মকর্তা, আমাদের কাছে মনে হয়েছে, ড. খান যে বলছেন, বাংলাদেশের সৃষ্টির পেছনে কাজ করেছে পানি, পানির প্রতুলতা এবং আনুষ্ঠানিক সংঘবদ্ধতার ঘাটতি, তা কিছুটা চমক সৃষ্টিকারী তত্ত্ব বৈ কিছু নয়; তা কিছুটা স্ববিরোধীও বটে, কারণ, সংঘবদ্ধতার এ ঘাটতি সামাজিক পুঁজির সৃষ্টিকে বাধাগ্রস্ত করে; কিন্তু তা কী করে আবার তাকে স্ফুরিত করে, তা কী করে স্বাধীনতা যুদ্ধে এমন তীব্র সংঘবদ্ধতার সৃষ্টি করে। এ এক রহস্যই বটে। এখন দেখতে পাচ্ছি, ড. খানের তত্ত্ব গ্রহণীয় হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বিকাশ ও আবির্ভাবকে নতুন আলোকে উপস্থাপনকারী এ তত্ত্ব অনেক রহস্যের সমাধান দেয় বলে মনে করা যেতে পারে। সম্প্রতি প্রকাশিত তার একটি পুস্তক ‘বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্য: একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ’-এ ড. খান এ বিষয়টি অধিকতর স্পষ্ট করে তুলেছেন।

সামগ্রিক ও বৃহত্তর সামাজিক, ঐতিহাসিক পটভূমি ও গতিপ্রকৃতির কথা বিবেচনায় না নিয়েও বলা যায় বাংলাদেশের জন্মক্ষণ নির্ধারিত হয়েছিল রাজনৈতিক আন্দোলন এবং প্রতিরোধমূলক যুদ্ধে বিজয়লাভের মাধ্যমে। ড. খান সেই ঘটনাবলি তার উল্লিখিত পুস্তকে বর্ণনা করেননি, তিনি তার সমাজতাত্ত্বিক, দার্শনিক, মনোভুবনগত এবং ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরেছেন, বলতে চেয়েছেন যে, বাংলাদেশের জন্ম ছিল এক অনিবার্য পরিণতি। সম্প্রতি প্রকাশিত তার আত্মজীবনী ‘পুরনো সেই দিনের কথা’তে আমাদের সংগ্রাম ও স্বাধীনতা বর্ণনা করেছেন আমরা বাংলাদেশের জন্মের সেই ইতিহাস জানতে পাই।

তাকে আমাদের দেশবাসী, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিদ্বৎসমাজ, রাজনৈতিক পরিমণ্ডল, আমলাতন্ত্র বিভিন্নভাবে চেনেন ও জানেন। তিনি বেসামরিক আমলাতন্ত্রের সর্বোচ্চ পদ–মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পদে নিয়োজিত হয়েছিলেন, বিশ্বব্যাংকে বিকল্প নির্বাহী পরিচালক ছিলেন, বহুদিন অর্থসচিব ছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারে উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব বিষয় গৌণ। আমার কাছে মনে হয়েছে, তিনি যে কাজটি করার চেষ্টা করেছেন এবং করে চলেছেন, তা হলো এ জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিকতার উন্নয়ন সাধন। ড. খানের প্রচেষ্টাকে আমি যেভাবে দেখি তা হলো এ এলাকার একটি জনগোষ্ঠী, যারা মূলত ভূমিপুত্র, যারা তাদের আর্থসামাজিক মুক্তির জন্য কঠিন সংগ্রাম করেছে, যুদ্ধ করেছে, বারবার ধর্ম পরিবর্তন করেছে, তাদের প্রচ্ছন্নতার আবরণ উন্মোচন করে তিনি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে তাদের একটি জাতিগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত ও পরিচিত করেছেন; তার রাষ্ট্রীয় পরিচিতি তুলে ধরেছেন। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্তে যে রাষ্ট্র তারা নির্মাণ করেছে সেটিকে কী করে একটি নৈতিক, দক্ষ ও টেকসই রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা যায় তারও দিশা দিয়েছেন। তার লেখাজোখার সঙ্গে পরিচিত পাঠককুলের এমন ভাবাই স্বাভাবিক।

এদের মধ্যে কি কোনো সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়? কেউ কেউ হয়তো তার ইতিহাসবিদ বৈশিষ্ট্যের প্রতি দৃষ্টি দিতে চাইবেন, কেউ তার অর্থনীতিবিদ পরিচিতির ওপর, কেউ লোকপ্রশাসনগত, তার আমলাতান্ত্রিক পরিচিতির ওপর। কিন্তু ড. আকবর আলি নিজে কী বলেন? একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, তার কাছে যে সমস্যাই যখন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে, তিনি তা নিয়েই চর্চা করেছেন; তার সমাধানের কথা ভেবেছেন। তখন চট করে আমার কার্ল পপারের একটি দার্শনিক রচনার কথা মনে পড়েছিল–All Life is Problem-Solving. আকবর আলি খান যেসব সমস্যার কথা ভেবেছেন, যা নিয়ে আলোচনা করেছেন, তা সেটি ইতিহাস হোক, অর্থনীতি হোক, লোকপ্রশাসনিক, আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা হোক, পানি ব্যবস্থাপনা হোক, সাহিত্য সমালোচনা হোক, কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে নয় ব্যবহারিক স্তরেও তিনি তার সমাধান দেয়ার চেষ্টা করেছেন। তাই তিনি রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের ভূমিকা, অপরিহার্যতা, তার উন্নয়নের কথা ভেবেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে (বিগত ১৯১৮ সালের) তার যে পুস্তকটি বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তার নাম ‘অবাক বাংলাদেশ: বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’। এটি একজন দার্শনিকের কাজ। সেই সূত্রে আমি ড. আকবর আলি খানের অন্য সব পরিচয় ছাপিয়ে একজন দার্শনিক বলে গণ্য করি। দার্শনিকের আদতেই নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নেই; সব বিষয়ই তার বিষয়। তিনি সমস্যার রূপকার ও সমাধানকারী। তিনি যখন বিশেষ বিষয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন, তখন তিনি আর দার্শনিক থাকেন না। আমি ড. খানের লেখালেখি এবং কৃত্যের মধ্যে এ বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই। তার একটি নমুনা দিই। তিনি সাহিত্যের পরিমণ্ডলে জীবনানন্দ দাশের কবিতার ওপর একটি বই লিখেছেন (‘নতুন আলোকের জীবনানন্দের বনলতা সেন’)। অনেকে আমাকে বলেছেন, এটি তার অনধিকারচর্চা হয়েছে। এমন সুন্দর একটি রোমান্টিক কবিতার ব্যবচ্ছেদ করে তিনি জীবনানন্দ দাশ ও কবিতার মুগ্ধ পাঠককুলের প্রতি সুবিচার করেননি। আমার কাছেও এক সময় তা-ই মনে হতো। ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা বলি। ড. খান যে কেবল এই পরিপক্ব বয়সে এসে জীবনানন্দ চর্চা করছেন, তা নয়। আমরা যখন নবীন আমলা, তিনি যখন যুগ্মসচিব, বিপিএটিসি এমডিএস, তখন যুগ্মসচিবদের এক কোর্সের শিক্ষা সফরে তার সঙ্গে বগুড়ার দিকে যাচ্ছিলাম গাড়িতে চড়ে। হঠাৎ একসময় ড. খান আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এমন কি মনে করা যায় যে, বনলতা সেন একজন দেহোপজীবিনী ছিলেন?’ আমার কাছে মনে হলো আমি বিষাক্ত সাপের ছোবল খেলাম। তিনি তখন বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছিলেন জীবনানন্দ দাশের ইতিহাস-চেতনার আলোকে। এখন তার বইতে যেমন লেখা আছে প্রায় তেমন করেই তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছিলেন। আমি যে সেটি সম্যক উপলব্ধি করেছিলাম তা বলতে পারি না। আমার কেবল মনে হয়েছিল বনলতা সেনের এমন রূপ তুলে ধরলে সাহিত্যের কী লাভ? কিন্তু প্রথাগত সাহিত্যপাঠে প্রেমের যে রূপ ধরা পড়ে, আবেগের যে চিত্র উঠে আসে, যার দোলায় আমরা দুলি, তাই কি প্রেম নিয়ে সারকথা? সাহিত্যের পাঠক, সাহিত্য সমালোচক হয়তো তার সেই দৃষ্টিভঙ্গির সমঝদার ও সাধক। কিন্তু দার্শনিক? আমরা জানি দার্শনিক প্রেম নিয়ে তেমন কথা বলেন না। তিনি বাস্তবতাকে সত্যি মানেন। প্রেমের দুই বড় তাত্ত্বিক প্লেটো ও ফ্রয়েড তাই মেনেছেন। ড. খানের কোনো প্রেমতত্ত্ব নির্মাণের চেষ্টা করেননি; একটি কবিতায় জীবনানন্দ দাশ প্রেম নিয়ে তার ভাবনার যে প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন, তার একটি বাস্তব ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন তিনি। তা এক অভিনব ব্যাখ্যা বই কি! হয়তো বলা চলে একটি বুদ্ধিদীপ্ত, বাস্তববাদী ব্যাখ্যা। বনলতা সেনের প্রেম শুধু নয়, প্রেম কী, সাধারণভাবে তা অনুধাবন করার জন্য কি আমরা আকবর আলি খানের এ ব্যাখ্যার কাছে যাব?

আমলাতন্ত্রে জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ, নিয়ন্ত্রক-নিয়ন্ত্রিত কর্মকর্তা থাকেন কিন্তু ছাত্র-শিক্ষকও থাকেন, সেকথা কেউ বলেন না, কারণ, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বাদে অন্যত্র তারা মূলত কর্মবৃত্তেই আবদ্ধ থাকেন। কিন্তু আমি বলব ড. আকবর আলি খান আমার একজন মূল শিক্ষক ছিলেন। প্রথমে বাংলাদেশে লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কর্মসহযোগী করে (আমি যখন উপপরিচালক তখন তিনি আমার দুই ধাপ ওপরের কর্মকর্তা এমডিএস ছিলেন), তার গবেষণা-সহযোগী করে, তার বই অনুবাদ করার সুযোগ দিয়ে তিনি আমাকে যথার্থই তার ছাত্র হওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। আমি প্রথমে অনুবাদ করেছিলাম তার গ্রামোন্নয়নের ওপর একটি মনোগ্রাফ, তারপর তার সঙ্গে গবেষণা সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিলাম ‘Sustainability of Rural Development Projects’ এবং পরবর্তীকালে ‘Performance Appraisal System of Class1 Offices of Government of Bangladesh’ নামের গবেষণার কাজে। Performance Appraisal System-এর ওপর গবেষণার কাজে গবেষণাকর্মটি সম্ভবত এখনো বাংলাদেশে একমাত্র গবেষণা, যা বাস্তবে কৃতকর্মেও মূল্যায়নের ওপর রচিত হয়েছে। তার ইতিহাসবিষয়ক একটি মৌলিক গ্রন্থ Discovery of Bangladesh-এর এ লেখকের অনুবাদে বাংলাদেশের সত্তার অন্বেষা নামে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এ বইটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ জুগিয়েছে বলে আমি মনে করি। এখনো তা নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা, বিতর্ক জাগরূক আছে। তিনি সম্প্রতি তার আরেকটি বই ‘বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্য: একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ’-এ বাংলাদেশের ধর্মান্তরণের পেছনের কারণ ও প্রেক্ষাপট নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। তার ইতিহাসবিষয়ক পুস্তকাদি তাকে বাংলাদেশের ইতিহাসবিদদের প্রথম কাতারে দাঁড় করিয়েছে বলা যায়। এসব বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকা যে আমার জন্য শ্লাঘার ব্যাপার তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

তিনটি প্রধান সমস্যা আকবর আলি খানকে সবসময় তাড়া করেছে বলে মনে হয়। প্রথমত, আমাদের আলাদা ও সুস্পষ্ট পরিচিতি; দ্বিতীয়ত, আমাদের দারিদ্র্য এবং তৃতীয়ত, আমাদের অব্যবস্থাপনা (তার সঙ্গে যুক্ত নৈতিকতার নিম্নমান তো বটেই)। তাই তিনি আমাদের ইতিহাস, আমাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মান্তরণ, আমাদের দারিদ্র্য, দারিদ্র্য নিরসন এবং সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে বেশকিছু পুস্তক রচনা করেছেন। একবার তিনি কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন (নিশ্চিতই তা তার ইতিহাসপাঠের ধারণাসঞ্জাত) আমরা যে পরাধীন হয়েছিলাম তা আমাদের সমরশক্তির অভাবে নয়, আমাদের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে। যে ষড়যন্ত্রের কথা বলা হয় তা-ও সেই ব্যবস্থাপনারই দুর্বলতা। সাম্প্রতিককালে রচিত তার পুস্তক ‘দারিদ্র্যের অর্থনীতি: অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ আমাদের দেখতে সাহায্য করে আমাদের দারিদ্র্যের কারণ কী, তা থেকে উত্তরণের উপায় কী।

 

আমিনুল ইসলাম ভুইয়া: সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার