অধ্যাপক রওনক জাহানের সঙ্গে আমার পরিচয়ের পর থেকে দীর্ঘ ও ধারাবাহিক যোগাযোগের বিষয়টি আমাকে সবসময়ই আনন্দিত করে। অদম্য—এ একটি শব্দের সাহায্যে আমি হয়তো তার ব্যক্তিত্বের কিছুটা নির্যাস তুলে ধরতে পারি। তার অনন্য কর্মজীবন বাংলাদেশ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও মানবাধিকার সংস্থা, বিশেষ করে জাতিসংঘ পরিবার পর্যন্ত বিস্তৃত।

এ অর্থে তিনি একজন প্রায়োগিক পণ্ডিত, যিনি রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি সামাজিক ক্ষেত্রের লিঙ্গ ও স্বাস্থ্যসম্পর্কিত অন্যায়-অবিচারের বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে তাড়িত। বাংলাদেশে আমার প্রজন্মের ‘বিদেশী’দের জন্য তার লেখা অন্যতম গ্রন্থ, ‘পাকিস্তান: ফেইলিউর ইন ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন’ যা ১৯৭২ সালে প্রকাশ হয় তা বাংলাদেশের মুক্তির গল্প বুঝতে সাহায্য করে। যুগান্তকারী এ কাজ তিনি করেছেন বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগ মুহূর্তে, সে সময় যা ছিল অনেক বড় একটি সাহসী পদক্ষেপ। সেই সময়কাল থেকে আমার অধ্যাপনা ও গবেষণার পাশাপাশি অন্যান্য সক্রিয় সামাজিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রগুলোয় আমি তার সূক্ষ্ম পাণ্ডিত্য ও অন্তর্দৃষ্টি সম্পর্কে উল্লেখ করে আসছি।

নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রওনকের দীর্ঘ সম্পর্ক শুরু হয় পরে। প্রথমে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের জন্য প্রথাগত গণ্ডির বাইরে গিয়ে নেতৃত্বের স্থান তৈরি করেন। এ কাজ করেন তার গবেষণা ও লেখার মাধ্যমে। কারণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে তিনি শুধু বর্ণনার মধ্যে বেঁধে রাখেননি, বরং বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অগ্রসর হয়েছেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর অধ্যয়নের সময় তিনি তার সমালোচনামূলক ও বিশ্লেষণাত্মক লেখার ধারা শুরু করেন। আমি মনে করি, তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে অর্থনীতি ও ইতিহাসের মধ্যে একটি আন্তঃযোগাযোগ স্থাপন করেন, যা তাঁকে দক্ষিণ এশিয়াসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনৈতিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়াগুলোর ব্যাখ্যা বিষয়ক বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে সাহায্য করে।

লিঙ্গ সবসময়ই এ ধরনের গভীর কাঠামোগত বোঝাপড়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান ছিল এবং থাকবেও। তবে আচরণগতভাবে কঠোর নারীবাদীর ভূমিকায় অবতীর্ণ না হয়েও জেন্ডার স্টাডিজের ক্ষেত্রে রওনক ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করেন। অধ্যাপনা ও গবেষণাকাজের মাধ্যমে নারী উন্নয়ন বিষয়ে তার অবস্থান সুস্পষ্ট। পাশাপাশি তিনি তুলে ধরেন, স্বাস্থ্য ও লিঙ্গের মধ্যকার মূল সংযোগের সঙ্গে প্রজনন স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য দুটোই জড়িত, যা তার পরবর্তী কাজের একটি স্থায়ী বিষয় হয়ে ওঠে।

বিভিন্ন সংস্থায় তার দীর্ঘ কাজের তালিকার মধ্যে রয়েছে ১৯৯৫ সালে ইউএনডিপির পক্ষ থেকে বাংলাদেশে বন্যা কর্মপরিকল্পনা মূল্যায়নবিষয়ক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ। মূলত বিষয়টিকে ঘিরে বাংলাদেশের সুশীল সমাজের আন্দোলনের ফলে উদ্যোগটি গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কাজটি করতে গিয়ে অনেকটা কাকতালীয়ভাবে আমরা কয়েক সপ্তাহের জন্য পরস্পরের অনেক কাছে চলে আসি। কারণ এ সময় আমাদের বেশ বড় পরিসরে নথিপত্র জোগাড় করা ও লিপিবদ্ধ করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। অধিকাংশ ভৌত অবকাঠামো প্রকল্প ঘিরে যে বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থ (ইউএস ডলার) ব্যয় করা হয়েছে, তার ন্যায্যতা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, যা ইংল্যান্ডের রাজা ক্যানুটের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

বিষয়টি দলের সদস্যদের (বাংলাদেশী ও বিদেশী) মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বিতর্ককে প্ররোচিত করছিল। রওনক তখন স্টেকহোল্ডারদের কার্যক্রম বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেশের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক স্বার্থের মাধ্যমে পরিচালিত ব্যক্তিগত লাভের দিকগুলো তুলে ধরেন। এটা স্পষ্ট যে আমাদের প্রবৃত্তি ও মূল্যবোধের অবস্থান ছিল একই বিন্দুতে। কিন্তু একজন বাংলাদেশী হিসেবে দেশের মধ্যে এ ধরনের স্বার্থগত বিষয়গুলো মোকাবেলা করাটা তার জন্য অনেকটাই কঠিন ছিল। (যদিও তার পেছনে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে)। তবে ক্ষমতার কাছে গিয়ে সত্যটা তুলে ধরাটা মোটেও সহজ ছিল না। রওনক সত্যটা তুলে ধরেছিলেন, যা ছিল তার আরো একটি সাহসী কাজ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ ও কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক ভার্চুয়াল কনফারেন্সে রওনকের শক্তিশালী প্রভাবগুলো আরো স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। রওনকের প্রথম রচনা শুরু হয় গণহত্যার ভয়াবহতা, ক্র্যাকডাউনের আতঙ্ক ও যুদ্ধকালীন অবস্থার মধ্য দিয়ে, তারপর গত ৫০ বছরে তিনি গবেষণার কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন, শেষ করলেন গত ৫০ বছরের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সংস্কৃতির পরিবর্তনের পর্যালোচনা দিয়ে। রওনক প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত গঠনমূলক ও সাহসী।

 

ড. জেওফ উড: বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক