ড. আকবর আলি খান শারীরিক অবয়বে হয়তো তেমন চিত্তাকর্ষক নাও হতে পারে, কিন্তু তার বুদ্ধিবৃত্তিক দার্ঢ্য এবং পেশাগত উত্কর্ষ এসব সীমাবদ্ধতাকে ছাড়িয়ে যায়। বন্ধুবান্ধব এবং চেনাজানাদের কাছে তিনি ব্যতিক্রমী গুণের অধিকারী একজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি একাধারে লেখক, অর্থনীতিবিদ, আমলা এবং অধ্যাপক। শুরু থেকেই তার সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ না থাকলেও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র এবং সিভিল সার্ভিসের সাবেক আমলা হিসেবে আমি তাকে প্রায় ৫০ বছর ধরে চিনতাম। সিভিল সার্ভিসে তিনি আমার দুই বছরের সিনিয়র, কিন্তু চিন্তা ও অভিজ্ঞতায় আমার চেয়ে অনেক বেশি পরিপক্ব। ৩০ বছর ধরে তার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল এবং ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি। তার অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব দেখে আমি বরাবরই বিমুগ্ধ হয়েছি। আমি তাকে এমন এক ব্যক্তি হিসেবে পেয়েছি, যাকে সাধারণ ছাঁচে ফেলা যায় না। জীবনের যাত্রাপথে এটিই তাকে অন্যদের চেয়ে অনন্য করেছে। শহর থেকে বহু দূরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের এক গ্রামের স্কুলে তার পড়াশোনার হাতেখড়ি। উচ্চ মাধ্যমিক ঢাকা কলেজে। এরপরে ভর্তি হন দেশের শীর্ষ উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। সেখানে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। রাজশাহীতে সহকারী কমিশনার হিসেবে তিনি তার সিভিল সার্ভিস ক্যারিয়ার শুরু করেন। এরপর তিনি হবিগঞ্জের এসডিও হন, যেখান থেকে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। নিজের আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়াটা ছিল তার জীবনের অন্যতম সঠিক সিদ্ধান্ত। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হলো, তখন তাকে ডেপুটি কমিশনার হিসেবে সিলেটে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। খুব চিন্তাভাবনা করে তিনি এ পদে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। কারণ ওই জেলার ক্ষমতাশালী এমপি তাকে তার পক্ষে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছ থেকে যেকোনো অনুরোধ প্রত্যাখ্যানের কথা বলেছিলেন। কাজেই কর্মজীবনের শুরুর দিকেই তিনি ভয়ভীতিহীনভাবে নিরপেক্ষতা মূলনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।

বৃদ্ধ বয়সে দৃষ্টির সমস্যা ও চলাফেরায় কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তিনি বই পড়া ছাড়েননি। শৈশবে তিনি একটা অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে, ছাপানো যেকোনো বিষয়ই জ্ঞানের উৎস। স্কুলের দিনগুলোয় সংবাদপত্রের কাগজ দিয়ে ঠোঙা বানানো এবং মুদির দোকানে পাওয়া যেকোনো ছাপা কাগজ পড়ার অভ্যাস ছিল তার। সাধারণ যেকোনো মানুষের কাছে এটা ‘বই পোকার’ সংজ্ঞার সঙ্গে সত্যিই মিলে যায়। তার লেখার সঙ্গে যারা পরিচিত তারা সহজেই বুঝতে পারেন, তিনি কতটা সুদক্ষ নন-ফিকশন লেখক। কলকাতায় বেড়ে ওঠা একজন কিশোর হিসেবে অমর্ত্য সেন যেমন কোনো কিছু বিনা প্রশ্নে গ্রহণ করেননি, তেমনি আকবর আলি খানও একই মূলনীতি অনুসরণ করেছেন। তিনি ইতিহাস, অর্থনীতি, জনপ্রশাসন, সুশাসন, রাজনীতি, সাহিত্য বিচিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং নিজের বিশ্লেষণী মতামত দিয়েছেন। এমনকি দেশের পানিসম্পদ নিয়ে তার নিজস্ব অন্তর্দৃষ্টি তুলে ধরতেও তিনি কুণ্ঠিত হননি। আত্মজীবনীতে তিনি তার জীবনের মিশন কী সেটা লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, শুধু বাঁচা-মরার জীবন নয়, জীবন থেকে অবশ্যই শিখতে হবে। তিনি অনুভব করেছেন জীবনের অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা। এটি সব মানুষের জন্য নির্দেশনামূলক। আকবর আলি খান ইতিহাসে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক হয়েছেন বটে, তবে বিস্মিতভাবে অর্থশাস্ত্রের প্রতিও বিশেষ আগ্রহ অনুভব করেছেন—স্কটিশ ইতিহাসবিদ টমাস কার্লাইল যে শাস্ত্রকে ‘নিরস বিজ্ঞান’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। ইতিহাসের একজন পণ্ডিত থেকে এক জীবনে নিজেকে অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক নীতির একজন পণ্ডিত ও অনুশীলনকারীতে রূপান্তর করাটা চাট্টিখানি কথা নয়। আমরা যারা আংকিক অর্থনীতি ও ইকোনমেট্রিকসের নানা জটিল বিষয় পড়ে অর্থনীতিতে পিএইচডি অর্জন করেছি তারা ভাবতাম যে, বাংলাদেশ থেকে ইতিহাসের একজন স্নাতকের জন্য একই ডিগ্রি অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু আকবর আলি খানের জন্য তা মোটেই অসম্ভব হয়নি। কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে দিনের পর দিন পড়াশোনা করে তিনি অবশেষে সব বাধা অতিক্রম করেছেন এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন। অর্থনীতির ওপর তার দখল কতটা সেটি পুরোপুরি প্রকাশ ঘটে, যখন তাকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব দেয়া হয়। ১৯৮০-এর দশকের শেষ সময়ে দেশ বড় অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছিল। ১৯৯৩ সালে এনবিআরের চেয়ারম্যানের পদ তিনি তার পূর্বসূরি ড. মসিউর রহমানের কাছ থেকে বুঝে নিয়েছিলেন। ড. মসিউর আসলে এনবিআরে কর সংস্কারের সূচনা করেছিলেন। ১৯৯০-৯১ সালে দেশের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি এবং লেনদেন ভারসাম্যের সংকট থেকে বেরিয়ে আসার প্রচেষ্টা চলছিল। বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ, আমাদের দেশে সবচেয়ে গভীর অর্থনৈতিক সংস্কারগুলো শুরু করতে সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছিল। এটা ছিল বাণিজ্য উদারীকরণের সবচেয়ে কঠিন ধাপ। ১৯৯১-৯২ সালে দেশের অর্থনীতি অভ্যন্তরমুখী আমদানি বিকল্প বাণিজ্য নীতিই শুধু অনুসরণ করছিল না; তদুপরি রাজস্ব এবং উচ্চমাত্রায় শিল্প সুরক্ষা বাড়াতে কিছু উচ্চতর শুল্কেও ভারাক্রান্ত ছিল। ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানগুলোর মনে যা-ই থাকুক না কেন, অর্থনীতিতে নিজের প্রশিক্ষণের কারণে আকবর আলি খান বাণিজ্য শুল্ক-করে স্থিতাবস্থা আদৌ কোনো সঠিক পথ কিনা তা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং শিল্পায়নের লক্ষ্যগুলো অনেকটা অনিশ্চিত গন্তব্যে যাচ্ছিল। ওই সময়ে রফতানিমুখী প্রবৃদ্ধি যা সবচেয়ে জনপ্রিয় উন্নয়ন প্যারাডাইমে পরিণত হয়েছিল—আমাদের দেশের কোথাও দেখা যাচ্ছিল না। তিনি বেশ দ্রুত বুঝলেন যে, লোক দেখানো নয়, এটি মৌলিক রূপান্তরের সময়। এ সংকটের সময়ে একজন আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা হিসেবে বিদ্যমান কর কাঠামোর সমস্যা চিহ্নিত করা এবং মধ্যম মেয়াদের জন্য কর যৌক্তিকীকরণের একটা পথনকশা তৈরিতে তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। বিশেষায়ণের দিক থেকে তিনি বাণিজ্য অর্থনীতিবিদ না হলেও আমি তাকে সমস্যাগুলো তীক্ষ্মভাবে বুঝতে এবং দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সক্ষম একজন চৌকস ব্যক্তি হিসেবে পেয়েছি। ১৯৯৩-৯৬ সালে এনবিআরে তার মেয়াদকালে কর কাঠামোর যৌক্তিকীকরণের পাশাপাশি কর উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমানো হয়েছিল। এতে যেমন সমরূপতা এসেছিল, তেমনি কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতাও এসেছিল। বাণিজ্য ব্যবস্থার ‘খুব বেশি মাত্রার অত্যন্ত ত্বরিত’ উদারীকরণ এবং তার ফলে রাজস্ব হারানো নিয়ে সমালোচকদের যা-ই সমালোচনা থাকুক না কেন বাণিজ্য উন্মুক্তকরণের মাধ্যমে রফতানি ও প্রবৃদ্ধি চাঙ্গা করতে যে কর কমানো প্রয়োজন সেই বিশ্বাসে তিনি অটল থাকলেন। যেটিকে আমরা বলি রফতানিমুখী প্রবৃদ্ধি মডেল। এটা একটা রেকর্ডের বিষয় যে, ১৯৯০-এর দশকের পুরো সময়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কর কমানো সত্ত্বেও শুল্ক রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। এসব মৌলিক সংস্কারের ফল এমনকি আজকের দিনেও দৃশ্যমান। গত ৩০ বছরে রফতানিতে যা গতিশীলতা এসেছে তার কৃতিত্ব ১৯৯০-এর দশকের মৌলিক বাণিজ্য সংস্কারের ওপর দেয়া যেতে পারে। সত্যি বলতে কী, পরবর্তী বছরগুলোয় জোরালো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচন, রফতানি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উত্পত্তি অনেকটাই নিহিত ছিল নব্বইয়ের দশকের সংস্কারে। শুল্ক সংস্কার সার্বিক বাণিজ্য উদারীকরণ গল্পের (আমদানি, বিনিময় হার নমনীয়তা, চলতি হিসাবে লেনদেনযোগ্যতার ওপর পরিমাণগত বিধিনিষেধ কমানো এবং আরো কিছু বিষয়) শুধু একটা অংশ হলেও এটা সন্দেহাতীতভাবে বাণিজ্য উদারীকরণের সবচেয়ে জটিল উপাদানও ছিল। বর্তমানে শুল্ক এখনো বেশি এবং ডব্লিউটিও বাংলাদেশের বাণিজ্য নীতির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে শুল্ক ও অর্ধশুল্ককে স্বীকার করে। আজকে কয়েক শতাংশীয় পয়েন্টও গড় শুল্ক কমানোর পদক্ষেপ নেয়া মনে হয় অসম্ভব—যে পদক্ষেপ রফতানিবিরোধী নীতির পক্ষপাত কমাবে এবং অভ্যন্তরীণ বিক্রির চেয়ে রফতানিকে প্রণোদিত করবে। এখন মনে হয় ১৯৯০-এর দশকে শুল্ক কমানোর পদক্ষেপগুলো নেয়া আকবর আলি খান ছাড়া সম্ভব হতো না। সেটি নিশ্চয় তাকে বাংলাদেশে বাণিজ্য উদারীকরণের অন্যতম মূল কারিগরে পরিণত করেছিল। এটি এমন এক নীতি ছিল, যা অবশেষে বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশ থেকে ব্যয়-প্রতিযোগিতামূলক রফতানির পথ উন্মুক্ত করেছিল। এটি আজ পর্যন্ত রফতানি মোমেন্টাম ধরে রাখতে সহায়তা করেছে। এতে শুধু উচ্চ প্রবৃদ্ধিই হয়নি, লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকেও বেরিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছে। সততা ও একনিষ্ঠতার প্রশ্নে যে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা কুখ্যাতি অর্জন করেছিল, সেই এনবিআরের প্রধান হিসেবে সর্বোচ্চ সততা ও একাগ্রতা নিয়ে আকবর আলি খান কীভাবে অন্তর্মুখী লড়াই চালিয়েছিল, তা আমার মনে পড়ে। তিনি একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘সংস্কারের মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠান মেরামত করা সম্ভব নয়, সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে হবে, তার চেয়ে ভালো হবে সম্পূর্ণ এক নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।’ যারা চেনেন তারা জানেন, আকবর আলি খানের অনেক স্বতন্ত্র মানবিক গুণ ছিল, যা তাকে অনন্য করেছে।

 

ড. জাইদী সাত্তার: চেয়ারম্যান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)