ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন অলি আহাদ। রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তার রচিত ‘জাতীয় রাজনীতি-১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫’ বইয়ের (বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লিঃ, প্রথম প্রকাশ, ১৯৮২) কিছু অংশে শামসুল হকের সঙ্গে তার বিভিন্ন স্মৃতি তিনি উল্লেখ করেছেন। তারা একই সঙ্গে জেল খেটেছেন। শামসুল হকের সঙ্গে অলি আহাদের প্রথম পরিচয় ঘটে ১৯৪৪ সালে। ১৫০ নম্বর মোগলটুলী লেনে মুসলিম লীগ কর্মীশিবিরের কার্যালয়ে।

মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবিতে ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ পালন করে মুসলিম লীগ। এদিনে কলকাতায় হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা হয়। তবে ঢাকা শহর ছিল এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। অলি আহাদের মতে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হওয়ার সব ধরনের উপকরণ থাকা সত্ত্বেও শামসুল হকের মতো নেতাদের সুদক্ষ পরিচালনার কারণে এখানে তেমন কোনো ঘটনা সংঘটিত হয়নি। তিনি লিখেন—‘অথচ পাশাপাশি দৃষ্টান্ত ঢাকা শহরে ১৬ই আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস পালনকালে কোন প্রকার সাম্প্রদায়িক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে নাই, যদিও ঢাকাই ছিল হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আখড়া। ইহাই হইল ঢাকার অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতা শামসুল হক ও শামসুদ্দিন আহমেদের স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন নেতৃত্বের কৃতিত্ব।’ (পৃষ্ঠা-১৭)

১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। শামসুল হক ছিলেন এর অন্যতম সদস্য। ৬ ফেব্রুয়ারি মোগলটুলী অফিসে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে এ পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি হলে করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। অধিকাংশ সদস্য ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরুদ্ধে মত দেন। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে নবাবপুর রোডে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সদর দপ্তরে আরেকটি বৈঠক হয়। সেখানেও ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। শামসুল হক নিজেও আইন ভঙ্গের পক্ষে ছিলেন না। তবে তার উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। কোনো ধরনের ভয় কিংবা পলায়নবাদী মানসিকতা থেকে তিনি এমন সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু অলি আহাদসহ আরো কয়েকজন ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে ভোট দেন। যাই হোক, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন ছাত্ররা। এরপর শামসুল হকের সঙ্গে অলি আহাদের দেখা হওয়ার স্মৃতি তিনি এভাবে তুলে ধরেছেন— ‘গুলির কিছুক্ষণ পর আনুমানিক অপরাহ্ন চার ঘটিকার দিকে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব শামসুল হক খবর পাঠাইলে আমি সেই শোকাভিভূত মুহূর্তে মেডিকেল কলেজের হোস্টেল হইতে হাসপাতাল ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের গেটের সম্মুখের চত্বরে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করি। সদ্য সংঘটিত মর্মান্তিক ও নৃশংশ হত্যাকাণ্ডে আমরা উভয়েই মর্মাহত। হূদয়বিদারক পরিস্থিতি আমাদের উভয়েরই বাকশক্তি যেন হরণ করিয়া নিয়াছিল। প্রকৃতিস্থ হইবার পর অত্যন্ত ধীর ও শান্ত কণ্ঠে উদ্ভূূূত পরিস্থিতির মূল্যায়নে নিবিষ্ট হইলাম।’ (পৃষ্ঠা- ১৪১)

শামসুল হকের মানসিক বিপর্যস্ততার কথা উল্লেখ করে অলি আহাদ লিখেন, ‘...মানসিক ব্যাধি হইতে আরোগ্য লাভ না করায় রাজনৈতিক গগন হইতে জনাব হকের মত একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র খসিয়া পড়ে।’ (পৃষ্ঠা-২১৩)

সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দীনও মোগলটুলি অফিসে প্রথম পরিচিত হন শামসুল হকের সঙ্গে। শামসুল হক প্রসঙ্গে আবু জাফর শামসুদ্দীন ‘আত্মস্মৃতি’র (সাহিত্য প্রকাশ ২০১৬) ২২৪ থেকে ২২৭ পৃষ্ঠায় লিখেন—‘টাঙ্গাইলের উপনির্বাচন হয় ১৯৪৯ সালে। শামসুল হক নবীন যুবক। অল্প আগে বিএ. পাস করেছেন। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। একমাত্র সম্বল তাঁর আদর্শনিষ্ঠা এবং সততা। শামসুল হক মুসলিম লীগের দুঃশাসন হতে পাকিস্তানকে, পূর্ব বাংলাকে মুক্ত করতে চান। প্রতিষ্ঠা করতে চান—‘‘রাব্বানীয়াত’’, আল্লাহর আধিপত্য, কিংডম অব গড—যেখানে সব মানুষ সমান অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে।... জয়লাভ সম্বন্ধে পূর্ণ আস্থাবান সত্ত্বেও মুসলিম লীগ টাঙ্গাইলের উপনির্বাচনে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল—প্রচুর টাকা-পয়সাও ঢেলে ছিল। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। পূর্ব বাংলার নিরক্ষর জনসাধারণ অন্তঃসারহীন স্লোগানে বিভ্রান্ত হয়নি। ভোট গণনার পর দেখা গেল, নিঃসম্বল শামসুল হক বিপুল ভোটাধিক্যে জয়লাভ করেছেন। শামসুল হক আমার প্রিয়ভাজন ছিলেন। তাঁর বিজয় কামনা করছিলাম। কিন্তু মনে মনে সন্দেহ ছিল। ...শামসুল হক আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু মুসলিম লীগ সরকার তাঁকে রাজনীতি করতে দেয়নি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তাঁকে আটক করা হয়। তখন তিনি বিবাহিত, একটি কন্যাসন্তানের পিতা। জেলখানায় তাঁর মস্তিষ্ক বিকৃতির সূত্রপাত হয়। তাঁর মন আপন পরিবারসহ সবকিছুর ওপর সন্দিগ্ধ হয়ে পড়ে। আফিয়া খাতুন তাঁকে ত্যাগ করেন। আফিয়া এখন পাকিস্তানে মিসেস আফিয়া দিল। ... শামসুল হক সম্পূর্ণ বিকৃত মস্তিষ্ক অবস্থায় জেলখানা হতে বেরিয়ে আসেন। অর্থাভাবে তাঁর চিকিৎসা হয়নি। আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক শামসুল হকের চিকিৎসার জন্য আওয়ামী মুসলিম লীগ কোনো উদ্যোগ নিয়েছিল বলেও মনে পড়ে না। শামসুল হক ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন — কখনো কখনো বন্ধু-বান্ধবদের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে টাকা ধার চাইতেন, কেউ সমাদর করলে আহার করতেন। একদিনের ঘটনা মনে পড়ে। আমি আমার বইয়ের দোকানে বসে আছি। বেলা দুপুর। হঠাৎ কোথা থেকে এসে উপস্থিত হলো শামসুল হক। পরনে পুরনো কালো আচকান, নিচে ময়লা পায়জামা এবং জরাজীর্ণ ইংরেজি জুতো। সালাম জানিয়ে আমার সামনের চেয়ারে বসলেন। আচকানের পকেট থেকে বের করলেন একটি কাগজের বান্ডিল। খুলে ধরলেন। দেখলাম এটি ইংরেজি ভাষায় রচিত একটি দরখাস্তের অথবা বলা যায় মেমোরান্ডামের খসড়া। ফুলস্কেপ সাইজের ২৫/৩০ পৃষ্ঠায় টাইপ করা এই দরখাস্তের প্রাপক—His Imperial Majesty the Almighty Allah. আবেদনকারী শামসুল হক। উল্টেপাল্টে কিছু কিছু পাঠ করেছিলাম। পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক অবস্থা এবং পূর্ববঙ্গবাসীর অভাব-অভিযোগ জ্ঞাপন করে আল্লাহতালার হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। শামসুল হক সাহেব বললেন, ‘এটি কয়েক কপি টাইপ এবং প্রাপকের কাছে ডাকযোগে প্রেরণের জন্য টাকা পয়সা আবশ্যক। তিনি আমার কাছে ৫০ টাকা চাঁদা চাইলেন। আমি তাঁকে ১০টি টাকা দিয়ে বললাম, আমার আর্থিক অবস্থা ততো ভালো নয়, অনুগ্রহ করে দশ টাকাই নিন। শামসুল হককে চা-বিস্কুট আনিয়ে দিয়েছিলাম। তিনি খেয়েছিলেনও। দশ টাকা নিয়েই তিনি চলে গেলেন। বেশির জন্য পীড়পীড়ি করেননি। আমি দোকান থেকে বেরিয়ে চেয়ে রইলাম। আচকান-পাজামা ও জিন্নাহ-টুপি পরিহিত শামসুল হক মুখ নিচু করে কাছারির দিকে চললেন। একবারও পিছু ফিরে তাকালেন না।’

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে গ্রেফতার হয়েছিলেন ভাষাসংগ্রামী ফজলুল করিম। তিনি তখন নোয়াখালীর চৌমুহনী কলেজের আইএ ক্লাসের ছাত্র ছিলেন। তিনি প্রথমে নোয়াখালী জেলে, পরে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বন্দি ছিলেন। ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে থাকাকালীন তার সঙ্গে শামসুল হকের পরিচয়। পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডে একত্রে থাকতেন তারা। বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি ‘বায়ান্নর কারাগার’ (অনুপম প্রকাশনী, ২০১৪) নামে একটি আত্মস্মৃতি লিখেন। সেখানে শামসুল হককে নিয়ে তিনি কিছু স্মৃতিচারণা করেছেন।

৫৩ পৃষ্ঠায় ফজলুল করিম লিখেন— ‘একদিন দুপুর বেলা ওয়ার্ডের প্রায় সবাই দিবানিদ্রায় মগ্ন, সে সময় স্যার (অধ্যাপক মুজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী) তার খাটের পাশে একখানা চেয়ারে বসে পড়ছিলেন। তাঁর পাশের খাটে থাকতেন হক ভাই (শামসুল হক)। হক ভাই তার খাটের পাশে দাঁড়িয়ে ধ্যান করছেন। বেশ কিছুদিন থেকেই তার পাগলামির লক্ষণসমূহ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। হক ভাই হঠাৎ স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, “শুনতে পেয়েছো মুজাফ্ফর?” স্যার জবাব দিলেন, “কিসের কথা বলছ?” হক ভাই বললেন- “একটা আওয়াজ শুনেছো?” স্যার বললেন, “একটা গাড়ির আওয়াজ শুনলাম।” হক ভাই হেসে বললেন, “গাড়ি নয়-অহি এসেছে। স্যার হক ভাইয়ের দিকে খানিক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, “তোমার মাথা।” স্যার এবং হক ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় হলে একই কক্ষে থাকতেন। উভয়ের মধ্যে হার্দিক সম্পর্ক, একে অপরকে তুমি করে সম্বোধন করতেন।’

আত্মস্মৃতির ৪২ থেকে ৪৫ পৃষ্ঠা পর্যন্ত শামসুল হককে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ফজলুল করিম। তিনি লিখেন—‘ ... হক সাহেব জেলখানায় মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। তিনি বিশিষ্ট মুসলিম লীগ নেতা ইসলামী চিন্তাবিদ জনাব আবুল হাসেমের ভাবশিষ্য ছিলেন। জনাব আবুল হাসেমের The Creed of Islam গ্রন্থ পড়ে সে চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেও একখানা গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। সারা বিশ্বে একদিন ইসলামী খেলাফত কায়েম হবে এটাই ছিল উক্ত গ্রন্থের প্রতিপাদ্য বিষয়। এ চিন্তা এবং পারিবারিক কিছু ঘটনা মিলে তার মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। ঢাকা জেলে প্রথম এর প্রকাশ ঘটে। তিনি নিজের খাটের পাশে পশ্চিমমুখী হয়ে একটানা ৭/৮ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতেন। সমস্ত গা-বেয়ে গরমের দিনে দরদর করে ঘাম ঝরত। গেঞ্জি পায়জামা ভিজে ছুপছুপে হয়ে যেত। সেই দিকে তার কোনো খেয়াল নেই। তিনি বলতেন তার কাছে আল্লাহর অহি আসত। আল্লাহর দিদার তিনি লাভ করতেন। ...হক সাহেবের মানসিক অবস্থার অবনতি হতে থাকল দিন দিন। কিন্তু তার মুক্তি ও চিকিৎসার ব্যাপারে বাইরে কেউ তেমন উচ্চবাচ্য করল না। তিলে তিলে জেলে এভাবে শেষ হতে লাগলেন। মুসলিম লীগ সরকার তার চিকিৎসারও কোনো ব্যবস্থা করল না এবং জেল থেকেও মুক্তি দিল না। সরকার অবশ্য এটাই চেয়েছিল। মুসলিম লীগের বিকল্প শক্তি হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ তখন মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিল। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তখন সভাপতি এবং জনাব শামসুল হক সম্পাদক। এদের নেতৃত্বকে মুসলিম লীগ ভীষণ ভয় করত। তাই অন্তত একজনকে শেষ করতে পারা কম কথা নয়। ...একদিন স্থানীয় দৈনিক ইত্তেফাকে খবর বেরুল যে, শামসুল হক সাহেব ইন্তেকাল করেছেন। এর পরদিন গুলিস্তানের বিপরীত দিকের ফুটপাতে হক সাহেবকে চাঁদার খাতা হাতে নিয়ে হাঁটতে দেখে আমি ভূত দেখার মতো আঁতকে উঠলাম। কিছুক্ষণ তাকে আপাদমস্তক অবলোকন করে খবরের কাগজে তার মৃত্যু সংবাদের কথা জানালাম। তিনি বললেন, এর প্রতিবাদ করার জন্য তিনি ইত্তেফাক অফিসে যাচ্ছেন।

তারপর কয়েক বছর তিনি বেঁচে ছিলেন। তারপর নিরুদ্দেশ। তার আর কোনো খবর নেই। খবর নেয়ার মতো কারোর কোনো গরজ ছিল না। এবং তাকে তখন কেউ চিনতও না। একসময় ধরে নেয়া হলো তিনি আর জীবিত নেই। তিনি মারা গেছেন এমন কোনো খবরও আর কোথায়ও ছাপা হয়নি।’

 

গ্রন্থনা: রবিউল হোসাইন