বাঙালি জাতির ইতিহাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা শ্রেষ্ঠতম অর্জন। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ যেসব রাজনৈতিক আন্দোলন করেছিলেন তার মধ্যে ভাষা আন্দোলনই ছিল সবচেয়ে ব্যাপক, তীব্র ও গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ভাষা আন্দোলনই ছিল পাকিস্তান শাসনামলের প্রথম গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং এই আন্দোলনের মধ্যে ছিল অবচেতন বাঙালি জাতীয়তাবাদী অনুভব। মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হকসহ ওই সময়ের রাজনীতিবিদরা ভাষা আন্দোলনকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখেছিলেন। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিলেন বাঙালির সাহিত্য, সংস্কৃতি, চাকরি তথা অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, ভাষার ভিত্তিতে পাকিস্তানে বাঙালির মর্যাদা, এভাবে বাঙালির সমগ্র ভবিষ্যৎই রাষ্ট্রভাষা চিন্তার অন্তর্গত বিষয়। যেটা ১৯৪৭ সালের তদানীন্তন মুসলিম সরকারকে দিয়ে বাঙালির এ ভবিষ্যৎ সংরক্ষিত হবে না।

ভাষা আন্দোলন মূলত দুটি পর্যায়ে হয়েছিল। প্রথম পর্যায় ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ এবং দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত পর্যায় ১৯৫২ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত। ভাষা আন্দোলনকে সাংগঠনিকভাবে একটা কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছিল সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। এর উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শামসুল হক। ১৯৪৮ সালে ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে তমদ্দুন মজলিস ও মুসলিম ছাত্রলীগের যৌথ সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠন করে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ছিল সব রাজনীতিকদের ঐক্যবদ্ধ রাখার একটি মহৎ প্রয়াস, যা অনেককেই সেদিন ভীষণ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। শামসুল হক দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বে গঠিত দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১১ মার্চ ১৯৪৮-এ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে দেশব্যাপী হরতাল পালনের কর্মসূচি গ্রহণ করে। তিনি নিজেও ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের হরতাল কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। মিছিল ও পিকেটিংয়ে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে সেক্রেটারিয়েটের সামনে অবস্থান করেন এবং একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে বচসায় লিপ্ত হলে শেষ পর্যন্ত পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। শামসুল হক সাহেবের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও ১১ মার্চের আন্দোলনে গ্রেফতার হন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তার সাক্ষ্য পাওয়া যায়, ‘নতুন কর্মী নিয়ে ইডেন বিল্ডিংয়ের দিকে ছুটেছি। এর মধ্যে শামসুল হক সাহেবকে ইডেন বিল্ডিংয়ের সামনে পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। গেট খালি হয়ে গেছে। তখন আমার কাছে সাইকেল। আমাকে গ্রেফতার করার জন্য সিটি এসপি জিপ নিয়ে বারবার তাড়া করছে, ধরতে পারছে না। এবার দেখলাম উপায় নেই। একজন সহকর্মী দাঁড়ানো ছিল। তার কাছে সাইকেল দিয়ে চার-পাঁচজন ছাত্র নিয়ে আবার ইডেন বিল্ডিংয়ের দরজায় আমরা বসে পড়লাম এবং সাইকেল যাকে দিলাম তাকে বললাম শিগগির আরো কিছু ছাত্র পাঠাতে। আমরা খুব অল্প, টিকতে পারব না। আমাদের দেখাদেখি আরো কিছু ছাত্র ছুটে এসে আমাদের পাশে বসে পড়ল। আমাদের ওপর কিছু উত্তম-মধ্যম পড়ল এবং ধরে নিয়ে জিপে তুলল। হক সাহেবকে আগেই জিপে তুলে ফেলেছে। বহু ছাত্র গ্রেফতার ও জখম হলো।’

কিন্তু একদিকে আন্দোলন ও অন্যদিকে মুসলিম লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের পরিপ্রেক্ষিতে খাজা নাজিমুদ্দিন ১৫ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সব দাবি মেনে নেন। সেই সঙ্গে তাদের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। আট দফা চুক্তি স্বাক্ষর হলে চুক্তির শর্তানুসারে অন্যান্য বন্দির সঙ্গে শামসুল হক মুক্তি লাভ করেন।

১৯৪৮ সালের মার্চ যখন পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে উত্তাল, তখন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা সফরে আসেন। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রসঙ্গে তার বক্তৃতা ছাত্রসমাজকে আরো উত্তাল করে তোলে। ফলে ক্ষুব্ধ হন সবাই। পূর্ব পাকিস্তানবাসীর আশার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পদক্ষেপ হিসেবে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নেতারা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে দেখা করেন এবং এই সাক্ষাতে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতা শামসুল হকও ছিলেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘শামসুল হক সাহেবের সাথে জিন্নাহর একটু তর্ক হয়েছিল, যখন তিনি দেখা করতে যান বাংলা রাষ্ট্রভাষা করার বিষয় নিয়ে, শামসুল হক সাহেব আমাকে এসে বলেছিলেন। শামসুল হক সাহেবের সৎসাহস ছিল, সত্য কথা বলতে কাউকেও ভয় পেতেন না।’

ভাষা আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায় অর্থাৎ ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির ঘটনায়ও শামসুল হকের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ দেখতে পাওয়া যায়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক আমতলায় ছাত্রদের সভার শুরুতে শামসুল হক উপস্থিত ছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় পরবর্তী সময়ে অনন্যদের সঙ্গে শামসুল হককেও জননিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হন।

১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সাহসী ভূমিকার জন্য শামসুল হক রাজনীতি অঙ্গনে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ভাষা আন্দোলনের পর ১৯৪৯ সালের উপনির্বাচন তাকে সেই সুযোগ করে দেয়। ১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল টাঙ্গাইলে পূর্ব বাংলার প্রথম উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ থেকে টাঙ্গাইলের প্রখ্যাত জমিদার পন্নী সাহেব প্রার্থী হলেন। তার বিপক্ষে প্রার্থী হলেন শামসুল হক। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, ‘১৯৪৯ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে অথবা এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে টাঙ্গাইলে উপনির্বাচন হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। আমরা ঠিক করলাম, শামসুল হক সাহেবকে অনুরোধ করব মুসলিম লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে লড়তে। শামসুল হক সাহেব শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন, কিন্তু টাকা পাওয়া যাবে কোথায়? হক সাহেবেরও টাকা নেই, আর আমাদেরও টাকা নেই। তবু যেই কথা সেই কাজ। শামসুল হক সাহেব টাঙ্গাইলে চলে গেলেন, আমরা যে যা পারি জোগাড় করতে চেষ্টা করলাম। কয়েক শত টাকার বেশি জোগাড় করা সম্ভব হয়ে উঠল না। ছাত্র ও কর্মীরা ঘড়ি, কলম বিক্রি করেও কিছু টাকা দিয়েছিল।’ চলতে থাকল তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। মওলানা ভাসানীর আহ্বানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ এটাকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করল। মুসলিম লীগের বা পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীনের ধর্মীয় প্রচারণাকাজে লাগেনি। শেষ পর্যন্ত এ উপনির্বাচনে শামসুল হক বিপুল ভোটাধিক্যে পন্নীকে পরাজিত করেন। অতঃপর শামসুল হককে টাঙ্গাইলের ‘বিজয়ী বীর’ খেতাবে ভূষিত করা হয় এবং এ বিজয় মুসলিম লীগের বিদ্রোহী গ্রুপের প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে মুসলিম লীগের মূল প্রার্থী পরাজিত হওয়ার পর সরকার এবারো জঘন্য পন্থায় নির্বাচন বানচাল করার ষড়যন্ত্র করে। শামসুল হকের বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয় এবং মামলার মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত সংসদে তাকে আসন গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়। শুধু নির্বাচনী মামলাই নয়। শামসুল হক সরকারি ও অন্যান্য হয়রানিরও শিকার হন। ক্ষমতাসীনদের এ-জাতীয় কাজকর্মে মুসলিম লীগের সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা দলের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন।

শুধু তা-ই নয়, এ উপনির্বাচনই মুসলিম লীগের ভাঙন ত্বরান্বিত করে। তখন প্রাদেশিক মুসলিম লীগের নেতৃত্বে ছিলেন খাজা নাজিম উদ্দিন, মওলানা আকরম খাঁ, নূরুল আমিন, ইউসুফ আলী চৌধুরী মোহন মিয়া প্রমুখ। অন্যপক্ষে প্রগতিশীল নেতারা মুসলিম লীগের বাইরে একটা দল কীভাবে গঠন করা যায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেন। মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শামসুল হককে সঙ্গে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন সংগঠন তৈরিতে। মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক প্রাথমিক পর্যায়ে ছাত্র-যুবসমাজের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। হাশিম-সোহরাওয়ার্দী জোট সমর্থক মুসলিম লীগের তরুণ ও ছাত্র-কর্মীরা কলকাতা ও অন্যান্য স্থান হতে ঢাকার মোগলটুলী অফিসকে কেন্দ্র করে একত্রিত হতে থাকেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেও শামসুল হক ও মোগলটুলী অফিসের বিবরণ পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে প্রথমে উঠব ঠিক করলাম। শওকত মিয়া মোগলটুলী অফিসের দেখাশোনা করে। মুসলিম লীগের পুরানা কর্মী। আমার বন্ধুও। শামসুল হক সাহেব ওখানেই থাকেন। মুসলিম লীগ ও অন্যান্য দলের কর্মীদের সভা ডেকেছেন শামসুল হক সাহেব সাহেব, রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও মোগলটুলী অফিসেই শওকত মিয়া ও শামসুল হক সাহেবের সঙ্গে থাকা শুরু করলেন।

 ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকায় আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা ছিল তৎকালীন পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে একটি মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র ২২ মাসের মধ্যেই ঢাকায় মুসলিম লীগের প্রতিপক্ষ হিসেবে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয়। দলটি ছিল ব্রিটিশ শাসনোত্তর পূর্ব বাংলার প্রথম নতুন ও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে এ দল গঠন সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, ‘মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তখন সদ্য আসাম থেকে চলে এসেছেন। তাকে পূর্ব বাংলার জনসাধারণ তেমন জানত না। শুধু ময়মনসিংহ, পাবনা ও রংপুরে কিছু কিছু লোক তার নাম জানত। কারণ তিনি আসামেই কাটিয়েছেন এতটা সময়। তবে শিক্ষিত সমাজের কাছে কিছুটা পরিচিত ছিলেন। একজন মুসলিম লীগের নেতা হিসাবে তিনি আসামের “বাঙ্গাল খেদা” আন্দোলনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এবং জেলও খেটেছিলেন। টাঙ্গাইলের লোকেরা তাকে খুব ভালোবাসত। শামসুল হক সাহেব তাকে ভালোভাবে জানতেন। কারণ হক সাহেবের বাড়িও সেখানে। তিনি মওলানা সাহেবের সাথে পাকাপাকি আলোচনা করবেন বলে ঠিক হলো।’

পরে (১৯৫৫) এ দলই ‘আওয়ামী লীগ’ নামে আত্মপ্রকাশ করে এ দেশের সব রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেতৃত্ব প্রদান করে। মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক সদ্যগঠিত দলটিতে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুবসমাজকে সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে ঢাকাসহ পূর্ব বাংলার নানা এলাকা সফর করেন।

বলা বাহুল্য, সেই ১৯৪৮ সালে যখন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সংগঠিত হচ্ছে এবং আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী, শামসুল হক প্রমুখদের নিয়ে পূর্ব বাংলা সফর করছেন তখন ঢাকায় পাকিস্তান পুলিশের ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ শেখ মুজিবের নামে একটি ফাইল খোলে। পাকিস্তানি আমলের গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ বইয়ে এ জনসভাগুলোর বিবরণ পাওয়া যায়। যেমন ১৯৪৮ সালের ১৭ মে নারায়নগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরিতে আওয়ামী মুসলিম লীগের এক মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। এ জনসভায় মওলানা ভাসানী, শামসুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহামনসহ আরো যারা উপস্থিত ছিলেন তারা হলেন অধ্যক্ষ কাজী কামরুজ্জামান, বরিশালের শমসের আলী, ঢাকার আতাউর রহমান, আবদুল আওয়াল, খান সাহেব ওসমান আলী প্রমুখ। ১৯৪৮ সালের ২৮ মে শেরপুর টাউন, জে কে বিদ্যালয় মাঠে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৯ সালের ১০ আগস্ট জামালপুর ঈদগাহ ময়দানে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান পুলিশের ইনটেলিজেন্স উল্লেখ করে—

Sheikh Mujibur Rahman, Maolana Bhasani & Shamsul Hoque delivered speeches on nepotism & corruption prevailing among the Govt. Officials levy scheme, abolition of Zamindari system etc.

ঠিক একইভাবে চট্টগ্রামের জনসভায়ও মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শামসুল হক উপস্থিত ছিলেন। শামসুল হক তখন আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়—

A public meeting (10,000) was held at Laldighi Park on 26th August with Maulana Abdul Hamid Khan of Bhashani (para 1326) in the chair. Mvi. Bazlus Satur (Para 860) Zahur Ahmad Chaudhuri (Para 1266) both of Chittagong. Sk Mujibur Rahman (para 1302) Jt. Secy. East Bengal Awami League, Mvi. Shamsul Haq M.L.A. (Para 1302) and the President, in course of their speeches severely ericised the present Ministry in regard to the food and cloth crisis and the deplorable condition of the mass. They urged the audience to join Awami League. The president asked the members of the Minority Community not to leave this country.

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন শামসুল হককে। তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-তে শুরুর দিকে প্রায়ই উল্লেখিত হয়েছে এ মহৎ রাজনীতিপ্রাণ মানুষটির নাম। অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে শেখ মুজিব বারবার স্মরণ করেছেন তাকে। বায়ান্নর উত্তাল ভাষা আন্দোলনের সময়ে রাজবন্দি হিসেবে দীর্ঘ সময় তাকে কাটাতে হয়েছে জেলের অভ্যন্তরে। সে সময় শামসুল হকের অনুপস্থিতি অনুভব করেছেন শেখ মুজিব। তিনি তার লেখায় শামসুল হককে নিয়ে প্রতি মুহূর্তের উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব লিখেছেন, ‘পাকিস্তান আন্দোলনে হক সাহেবের অবদানে যারা এখন ক্ষমতায় আছেন, তাদের চেয়েও অনেক বেশি ছিল তার অবদান। বাংলাদেশের যে কয়েকজন কর্মী সর্বস্ব দিয়ে পাকিস্তান আন্দোলন করেছেন তাদের মধ্যে শামসুুল হক সাহেবকে সর্বশ্রেষ্ঠ কর্মী বললে বোধহয় অন্যায় হবে না। ১৯৪৩ সাল থেকে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠানকে জমিদার, নবাবদের দালানের কোঠা থেকে বের করে জনগণের কুঠিরে যারা নিয়ে গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে হক সাহেব ছিলেন অন্যতম।’

শামসুল হক দুটি কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন: এক. ১৯৪৮ সালের শুরুতে বাংলা ভাষা আন্দোলনকে সর্বসাধারণের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা এবং দুই. আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত থেকে এর প্রথম সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হওয়া। আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় রোজ গার্ডেনের সম্মেলন উপলক্ষে তিনি ‘মূল দাবী’ নামে ছাপা বক্তব্যে কর্মসূচিবিষয়ক কতগুলো প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তার এ প্রস্তাবগুলো সম্মেলনে সামান্য পরিবর্তিত অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম কর্মসূচিরূপে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়। তৎকালীন রাজনীতিতে অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন শামসুল হক। তার সাংগঠনিক তত্পরতা ও দূরদর্শিতার কারণে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনৈতিক অভিযাত্রা শুরু হয়।

বলা চলে, ব্যক্তিস্বার্থ উপেক্ষা করে শামসুল হক জেল-জুলুম বরণ করে বাঙালি জাতিকে আপন সত্তা জাগ্রত করে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব দিয়ে এবং ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বাইরে এসে আওয়ামী মুসলিম লীগের ব্যানারে সবাইকে সংগঠিত করে দেখিয়েছেন মুক্তির পথ।

 

ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়