পাকিস্তান
আন্দোলন তখন তুঙ্গে। মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার মুসলিম জাতীয়তাবাদী নেতারা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন কলকাতায়। ঢাকায় মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ছিলেন শামসুল হক। ছাত্রজীবনে মুসলিম লীগের সঙ্গে জড়িত হওয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক যাত্রা বর্তমান টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলার এ সূর্যসন্তানের। তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিকথা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র (দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, প্রথম প্রকাশ জুন-২০১২) বিভিন্ন স্থানে এ কীর্তিমানের উল্লেখ আছে। রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে শামসুল হকের মূল্যায়ন করতে গিয়ে আত্মজীবনীর ৩২ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু লেখেন—‘এই সময় শহীদ নজীর আহমেদ নিহত হবার পরে ঢাকার ছাত্রদের নেতৃত্ব দিতেন জনাব শামসুল হক সাহেব, শামসুদ্দিন আহমেদ, নোয়াখালীর আজিজ আহমেদ ও খোন্দকার মোশতাক আহমদ এবং আরও অনেকে। এরা সকলেই শহীদ সাহেবের ভক্ত ছিলেন। পরে হাশিম সাহেবেরও ভক্ত হন। এরা সকলেই ছাত্র আন্দোলনের সাথে সাথে মুসলিম লীগ সংগঠনকে কোটারির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য মুসলিম লীগের কাজে যোগদান করেছিলেন। ঢাকায় প্রাদেশিক লীগের একটা আঞ্চলিক শাখা অফিস হাশিম সাহেব খোলেন ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে। কমিউনিস্ট পার্টির মত হোলটাইম ওয়ার্কার হিসেবে এরা অনেকেই যোগদান করেন। শামসুল হক সাহেব এই অফিসের ভার নেন।’
পাকিস্তান হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে মুসলিম লীগে বিভাজন শুরু হয়। এক পর্যায়ে মুসলিম লীগ অভিজাতদের পকেটে ঢুকে যায়। ফলে বঙ্গবন্ধু, শামসুল হকের মতো ছাত্রনেতারা দলটিতে ব্রাত্য হয়ে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফিরে আসেন। ওঠেন মোগলটুলী অফিসে। সেখানে তখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ছিলেন শামসুল হক। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ৮৩ নম্বর পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু এ প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণা করেছেন—‘... ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে প্রথমে উঠব ঠিক করলাম। শওকত মিয়া মোগলটুলী অফিসের দেখাশোনা করে।... শামসুল হক সাহেব ওখানেই থাকেন। মুসলিম লীগ ও অন্যান্য দলের কর্মীদের সভা ডেকেছেন শামসুল হক সাহেব—রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে। আমাকে খবর দিয়েছেন পূর্বেই।... শামসুল হক সাহেব ও শওকত সাহেব আমাকে পেয়ে খুবই খুশি। ... তিন-চারদিন পরই কনফারেন্স হবে। বহু কর্মী এসেছে বিভিন্ন জেলা থেকে। অনেকেই মোগলটুলীতে উঠেছে। ... বিকালে হক সাহেব আমাদের নিয়ে বসলেন—কনফারেন্সে কি করা হবে সে সম্বন্ধে আলোচনা করতে।’
বঙ্গবন্ধুর
এ স্মৃতিচারণা থেকে স্পষ্ট শামসুল হক কেবল ভালো কর্মীই ছিলেন না, তিনি একজন বড় মাপের সংগঠকও ছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছাত্র-কর্মীদের করণীয় ঠিক করতে প্রথম কনফারেন্স তার উদ্যোগেই আয়োজিত হয়েছিল। সেখান থেকে তৈরি হয় মুসলিম লীগ বিরোধী রাজনীতির ভ্রুণ। এক পর্যায়ে মহীরুহ হয়ে সেটি রূপ নেয় শক্তিশালী এক সংগঠনে। প্রারম্ভিক পর্যায়ে নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রামে এ সংগঠন পালন করেছে প্রধান ভূমিকা।
তৎকালীন
মুসলিম লীগে কোটারি, পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্যসহ নানা সমস্যা ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা তাদের সিদ্ধান্ত এক তরফা চাপিয়ে দিত পূর্ব পাকিস্তানের ওপর। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেগুলো হতো অন্যায় ও খামখেয়ালিতে পরিপূর্ণ। একেবারে শুরু থেকেই মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এসব অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন শামসুল হক। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে তার সক্রিয় ভূমিকার কথা বঙ্গবন্ধু তার আত্মস্মৃতিতে উল্লেখ করেছেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের বড়লাট হওয়ার ফলে মুসলিম লীগের প্রধান হন চৌধুরী খালিকুজ্জামান। তিনি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ ভেঙে দিয়ে একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করেন। উদ্দেশ্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রভাব খর্ব করা। রাজনীতিতে তার অনুগতদের সরিয়ে খাজা নাজিমউদ্দিন পন্থীদের নেতৃত্বে তুলে আনা। চৌধুরী খালিকুজ্জামানের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একটি রিক্যুইজিশন সভা আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের কাউন্সিল সদস্যরা। তাদের অন্যতম ছিলেন শামসুল হক। অসমাপ্ত
আত্মজীবনীর ৯০ ও ৯১ পৃষ্ঠায় এ ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ আছে।
১৯৪৮
সাল। ফেব্রুয়ারি মাস। করাচিতে পাকিস্তান সংবিধান সভার বৈঠক চলছে। সেখানে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। উর্দুর পাশাপাশি পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা হিসেবে বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেয়ার দাবি উত্থাপন করেন বাবু ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। কুমিল্লার এ কংগ্রেস সদস্যের বক্তব্য আমলে নেয়া হলো না। বাংলাকে বাদ দেয়ার ষড়যন্ত্রে ক্ষিপ্ত হয় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। বিক্ষুব্ধ হয় বাংলার আপামর জনসাধারণ। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে যারা সংগ্রাম করেছেন, তাদের অন্যতম শামসুল হক। তিনি একজন ভাষাসৈনিক। ভাষা আন্দোলনে তিনি রাজপথে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ভাষার দাবিতে জেল খেটেছেন। সয়েছেন পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর অন্যায় অত্যাচার। রাজনৈতিক সহযোদ্ধা হওয়ায় এ সময় বঙ্গবন্ধু খুব কাছ থেকে দেখেছেন শামসুল হককে। উভয়ে একসঙ্গে জেলে ছিলেন। সে সময়ের কথা স্মরণ করে বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত
আত্মজীবনীতে লেখেন—‘... আমরা
দেখলাম, বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে বাংলাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও তমদ্দুন মজলিস এর প্রতিবাদ করল এবং দাবি করল বাংলা ও উর্দু দুই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। ... এই
সময় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও তমদ্দুন মজলিস যুক্তভাবে সর্বদলীয় সভা আহ্বান করে একটা “রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংগ্রাম পরিষদ” গঠন করল। ... পুরানা
লীগ কর্মীদের পক্ষ থেকে জনাব কামরুদ্দিন সাহেব, শামসুল হক সাহেব ও অনেকে সংগ্রাম পরিষদে যোগদান করলেন।’ (পৃষ্ঠা-৯২)
সংগ্রাম
পরিষদের সভার ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। পূর্ব ঘোষণা অনুসারে এ তারিখে সমগ্র ঢাকা শহরে হরতাল পালন করে সংগ্রাম পরিষদ। সে সময় ইডেন বিল্ডিংয়ের সামনে পিকেটারদের নেতৃত্বে ছিলেন শামসুল হক। সেখান থেকে তাকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু লেখেন—‘... এর
মধ্যে শামসুল হক সাহেবকে ইডেন বিল্ডিংয়ের সামনে পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। গেট খালি হয়ে গেছে। ... ইডেন
বিল্ডিংয়ের দরজায় আমরা বসে পড়লাম ...।
আমাদের উপর কিছু উত্তম মধ্যম পড়ল এবং ধরে নিয়ে জিপে তুলল। হক সাহেবকে পূর্বেই জিপে তুলে ফেলেছে। ...’(পৃষ্ঠা-৯৩) এ থেকে বোঝা যায়, শামসুল হক পলায়নবাদী মানসিকতার ছিলেন না। গোপন রাজনীতিও তিনি পছন্দ করতেন না। বরং গণতান্ত্রিক উপায়ে ন্যায়নিষ্ঠ আন্দোলনের মাধ্যমে অধিকার আদায়ের রাজনীতিতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন।
শুরু
হলো জেলজীবন। সেখানে একত্রে ছিলেন বঙ্গবন্ধু ও শামসুল হক। সহবন্দিত্বের দিনগুলোয় দুজনের জমেছে একান্ত কিছু স্মৃতি। সেসব কথা স্মরণ করে বঙ্গবন্ধু লেখেন—‘আমাদের এক জায়গায় রাখা হয়েছিল জেলের ভিতর। যে ওয়ার্ডে আমাদের রাখা হয়েছিল, তার নাম চার নম্বর ওয়ার্ড। তিনতলা দালান। দেওয়ালের বাইরেই মুসলিম গার্লস স্কুল। যে পাঁচদিন আমরা জেলে ছিলাম সকাল দশটায় মেয়েরা স্কুলের ছাদে উঠে স্লোগান দিতে শুরু করত, আর চারটায় শেষ করত। ছোট্ট মেয়েরা একটু ক্লান্তও হতনা। “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”, “বন্দি
ভাইদের মুক্তি চাই”, “পুলিশি
জুলুম চলবে না”—নানা ধরনের স্লোগান। এই সময় শামসুল হক সাহেবকে আমি বললাম, “হক
সাহেব ঐ দেখুন, আমাদের বোনেরা বেরিয়ে এসেছে। আর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করে পারবে না।” হক সাহেব আমাকে বললেন, “তুমি
ঠিকই বলেছ, মুজিব”।’ (পৃষ্ঠা-৯৫)
বঙ্গবন্ধু
ও শামসুল হক জেলে কর্মীদের সামলে রাখতেন। বঙ্গবন্ধু বর্ণিত সে সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে শামসুল হকের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার প্রমাণ মেলে। অসমাপ্ত আত্মজীবনের এক স্থানে বঙ্গবন্ধু লেখেন—‘...ছোট
ছোট কয়েকজন ছাত্র ছিল, তারা কারও কথা শুনতে চাইত না। গণনার সময় এক জায়গা ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যেত। আমি ও শামসুল হক সাহেব সকলকে ধমকিয়ে বসিয়ে রাখতাম। ...।’
(পৃষ্ঠা-৯৫) একবার জেলখানার জমাদার ভেতরে ঢুকে রাজবন্দিদের পেটাতে চাইল। সে প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু লেখেন—‘...জেলার,
ডেপুটি জেলার বা সুপারিনটেনডেন্ট সাহেব ভিতরে আসবার পূর্বেই আমরা বুঝতে পেরে সকলকে তাড়াতাড়ি যার যার জায়গায় বসতে বলে শামসুল হক সাহেব ও আমি দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাদের না মেরে ভিতরে যেন কেউ না আসতে পারে এই উদ্দেশ্যে। এ কথাও সকলকে বলে দিলাম যে, আমরা মার না খাওয়া পর্যন্ত কেউ হাত তুলবে না। যদি আমাদের আক্রমণ করে এবং মারপিট করে তখন টেবিল, চেয়ার, থালা, বাটি যা আছে তাই দিয়ে প্রতিরোধ করতে হবে। হক সাহেব ও আমি দুইজনই একগুঁয়ে ছিলাম। দরকার হলে সমানে হাতও চালাতে পারতাম ...।’
(পৃষ্ঠা- ৯৫ ও ৯৬)
জেল
থেকে বের হয়ে শামসুল হক আবারো ভাষা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় আসেন গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিনিধি হিসেবে শামসুল হক জিন্নাহর সঙ্গে আলাপ করেন। সে প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু লেখেন—
‘শামসুল হক সাহেবের সাথে জিন্নাহর একটু তর্ক হয়েছিল, যখন তিনি দেখা করতে যান বাংলা রাষ্ট্রভাষা করার বিষয় নিয়ে—শামসুল হক সাহেব আমাকে এসে বলেছিলেন। শামসুল হক সাহেবের সৎ সাহস ছিল, সত্য কথা বলতে কাউকেও ভয় পেতেন না।’
(পৃষ্ঠা-৯৯) শামসুল হককে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর এ মূল্যায়ন অক্ষরে অক্ষরে সত্য। তিনি ছিলেন নির্ভীক চিত্তের অধিকারী। ন্যায়ের প্রশ্নে আপসহীন।
১৯৪৮
সালেরই ঘটনা। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের ব্যানারে টাঙ্গাইলে এক সভার আয়োজন করা হয়েছে। সভায় বক্তৃতা দেবেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সভার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে শামসুল হক তখন টাঙ্গাইলে। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর ঢাকা ত্যাগে বাধা দিল প্রশাসন। প্রশাসনের এ অন্যায্য সিদ্ধান্তে বিক্ষুব্ধ বঙ্গবন্ধু তীব্রভাবে শামসুল হকের অভাব বোধ করেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ১০৯ পৃষ্ঠায় এর উল্লেখ আছে এভাবে—‘এই অত্যাচারের প্রতিবাদ করার মত ক্ষমতা তখন আমাদের ছিল না। আর আমরা প্রস্তুতও ছিলাম না। ছাত্ররা সামান্য প্রতিবাদ করেছিল। নেতৃত্ব দেওয়ার মত কেউ আমাদের ছিল না। ... ঐদিন
যদি শামসুল হক সাহেব ঢাকায় থাকতেন তবে আন্দোলন আমরা করতে পারতাম বলে আমার বিশ্বাস ছিল।’ এ উদ্ধৃতি শামসুল হকের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অগাধ আস্থারই বহিঃপ্রকাশ।
তৎকালীন
পূর্ব পাকিস্তানে শামসুল হক ছিলেন প্রথম সফল বিরোধী দলীয় নেতা। টাঙ্গাইলের উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়ার জন্য তার বিকল্প খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি নির্বাচন করলেন এবং জয়লাভ করলেন। মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে একটা গণজোয়ার তো ছিলই, তথাপি শামসুল হকের ব্যাপক জনসমর্থন এক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করে। তিনি ছিলেন সত্যিকার গণমানুষের নেতা। বঙ্গবন্ধুর কলমে তা ধরা পড়েছে এভাবে—‘১৯৪৯ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে অথবা এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে টাঙ্গাইলে উপনির্বাচন হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। আমরা ঠিক করলাম, শামসুল হক সাহেবকে অনুরোধ করব মুসলিম লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে লড়তে। শামসুল হক সাহেব শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন, কিন্তু টাকা পাওয়া যাবে কোথায়? হক সাহেবেরও টাকা নাই, আর আমাদেরও টাকা নাই। তবু যেই কথা সেই কাজ। শামসুল হক সাহেব টাঙ্গাইলে চলে গেলেন, আমরা যে যা পারি জোগাড় করতে চেষ্টা করলাম। কয়েক শত টাকার বেশি জোগাড় করা সম্ভব হয়ে উঠল না। ছাত্র ও কর্মীরা ঘড়ি, কলম বিক্রি করেও কিছু টাকা দিয়েছিল। ... মুসলিম
লীগের মন্ত্রীরা ও এমএলএরা টাকা-পয়সা, গাড়ি, সকল কিছু নিয়েই টাঙ্গাইলে উপস্থিত হয়েছিল। মুসলিম লীগ প্রার্থী করটিয়ার বিখ্যাত জমিদার খুররম খান পন্নী—যাঁর প্রজাই হল অধিকাংশ ভোটার। তাঁর সাথে আছে সরকারি ক্ষমতা এবং অর্থবল। আমাদের প্রার্থী গরিব, কিন্তু নিঃস্বার্থ, ত্যাগী কর্মী; আর আছে আদর্শ ও কর্মক্ষমতা। ...’ (পৃষ্ঠা-
১১৫) এ ‘আদর্শ ও কর্মক্ষমতা’ নিয়েই মুসলিম লীগ প্রার্থী খুররম খান পন্নীকে পরাজিত করে এমএলএ হন ‘গরিব, কিন্তু নিঃস্বার্থ, ত্যাগী কর্মী’ শামসুল হক। সেটাই ছিল পাকিস্তানে মুসলিম লীগের প্রথম পরাজয়। বিরোধীদের জন্য এ ছিল অনন্য মাইলফলক, যা অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল ভবিষ্যৎ আন্দোলনে। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়—‘শামসুল হক সাহেব ইলেকশনে জয়লাভ করে ঢাকা আসলে ঢাকার জনসাধারণ ও ছাত্রসমাজ তাঁকে বিরাট সম্বর্ধনা জানাল। বিরাট শোভাযাত্রা করে তাঁকে নিয়ে ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ করল। আমরা জেলে বসে বিজয়ের আনন্দ উপভোগ করলাম। শামসুল হক সাহেব ফিরে আসার পরেই পুরানা লীগ কর্মীরা মিলে এক কর্মী সম্মেলন ডাকল ঢাকায়—ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করার জন্য। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন সে সভা আহ্বান করা হয়েছিল।’ (পৃষ্ঠা-১১৯)
১৯৪৯
সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত কর্মী সম্মেলনেই গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। শামসুল হক হলেন এ সংগঠনের প্রথম সাধারণ সম্পাদক। তিনি তখন বিরোধীদলীয় রাজনীতির প্রাণপুরুষ। বঙ্গবন্ধু লেখেন—‘আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন হওয়ার কয়েকদিন পরেই আমার ও বাহাউদ্দিনের মুক্তির আদেশ এল। ... জেলগেট
থেকে বের হয়ে দেখি, আমার আব্বাও উপস্থিত। ... শামসুল
হক সাহেবকে কাছে পেয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানালাম এবং বললাম, “হক
সাহেব, আপনার জয়, আজ জনগণের জয়।” হক সাহেব আমাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বললেন, “চল,
এবার শুরু করা যাক”।’ (পৃষ্ঠা-১২১) এ সংগঠনের প্রথম ম্যানিফেস্টো ও গঠনতন্ত্রের রচয়িতা শামসুল হক। সংগঠন পরিচালনার বিষয়ে শামসুল হকের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ভালো বোঝাপড়া ছিল। বঙ্গবন্ধু তা এভাবে উল্লেখ করেন—‘জনাব শামসুল হক সাহেব একটু ব্যস্ত ছিলেন, কারণ তাঁর বিবাহের দিন ঘনিয়ে এসেছে। আমাকেই পার্টির সমস্ত কাজ দেখতে হত। যদিও তাঁর সাথে পরামর্শ করেই করতাম। তিনি আমাকে বললেন, “প্রতিষ্ঠানের
কাজ তুমি চালিয়ে যাও।” আমাদের মধ্যে এত মিল ছিল যে কোন ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনাই ছিল না।’
১৯৪৯
সালের অক্টোবরে শামসুল হক গ্রেফতার হলেন। বিয়ে করার মাত্র দেড় মাসের মাথায়। এ সময় থেকেই মূলত তার মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নামাজ পড়তেন। সারা রাত জেগে উচ্চৈঃস্বরে জিকির করতেন। ডিসেম্বরে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হন। জেলে শামসুল হক, মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু একত্রে থাকতেন। তাই শামসুল হকের এ পরিবর্তন তিনি কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ১৬৮-১৭৪ পৃষ্ঠায় এর বিস্তারিত বর্ণনা আছে। এ সময় তার শরীরও ভেঙে পড়ে। তথাপি আরো কয়েক বছর তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন। এ সময় থেকেই তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়। শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে তিনি তখন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। ১৯৫৩ সালের প্রথম দিকে তিনি জেল থেকে বেরিয়ে আসেন। তার শোচনীয় অবস্থা দেখে চিন্তিত হলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি লেখেন—‘আমি অনেকের সাথে পরামর্শ করে তাঁর চিকিৎসার বন্দোবস্ত করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। উল্টা আমার উপর ক্ষেপে গেলেন। আমি তখন তাঁকে প্রতিষ্ঠানের জেনারেল সেক্রেটারির ভার নিতে অনুরোধ করলাম। কার্যকরী কমিটির সভা ডেকে তাঁকে অনুরোধ করলাম, কারণ এতদিন আমি এ্যাকটিং জেনারেল সেক্রেটারি হিসাবে কাজ করছিলাম। ভাবলাম, কাজের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লে তিনি ভাল হয়ে যেতে পারেন। তিনি সভায় উপস্থিত হলেন এবং বললেন, “আমি
প্রতিষ্ঠানের জেনারেল সেক্রেটারির ভার নিতে পারব না, মুজিব কাজ চালিয়ে যাক”।’ (পৃষ্ঠা-২৩৭)
১৯৫২
সাল পর্যন্ত রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন শামসুল হক। ১৯৫৩ সাল থেকে তার তেমন কোনো খোঁজ আর পাওয়া যায় না। তবে ততদিনে তিনি আসীন হয়েছেন আপামর বাঙালির হূদয়াসনে। পেয়েছেন অমরত্ব। অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ২৩৬ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত বঙ্গবন্ধুর এ কথাগুলো যেন সব বাঙালিরই কথা—‘একজন নিঃস্বার্থ দেশকর্মী, ত্যাগী নেতা আজ দেশের কাজ করতে যেয়ে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে থেকে পাগল হয়ে বের হলেন। এ দুঃখের কথা কোথায় বলা যাবে? পাকিস্তান আন্দোলনে তাঁর অবদান যারা এখন ক্ষমতায় আছেন, তাঁদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। বাংলাদেশে যে কয়েকজন কর্মী সর্বস্ব দিয়ে পাকিস্তান আন্দোলন করেছে তাদের মধ্যে শামসুল হক সাহেবকে সর্বশ্রেষ্ঠ কর্মী বললে বোধহয় অন্যায় হবে না। ১৯৪৩ সাল থেকে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠানকে জমিদার, নবাবদের দালানের কোঠা থেকে বের করে জনগণের পর্ণকুটিরে যারা নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে শামসুল হক সাহেব ছিলেন অন্যতম।’
নিজাম আশ শামস: লেখক ও সাংবাদিক





