একটা সময় ছিল, যখন রুপালি পর্দা শুধুই ‘উচ্চবর্ণ’ আর ‘উচ্চশ্রেণির’ জন্য বরাদ্দ ছিল। নারী সেখানে শুধু দর্শকের আসনেই থাকতেন। কিন্তু সেই সময়েই এক তরুণী সাহস করে পর্দায় উঠে এলেন। এক শতাব্দী আগে, সমাজ যখন নারীর অভিনয়কে অশ্লীলতার সঙ্গে একসূত্রে গেঁথে রাখছিল সেই সময় একজন দলিত নারী পর্দায় অভিনয় করলেন। ইতিহাস তাকে মনে রেখেছে পি কে রোজি নামে। ১৯২০-এর দশকে কেরালায়, মালায়ালাম ভাষার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ভিগাথাকুমারন–এ তিনি মুখ্য নারী চরিত্রে অভিনয় করেন। কিন্তু রুপালি আলো তার জন্য বরাদ্দ ছিল না। বরং জুটেছিল ঘৃণা, বর্ণবিদ্বেষ আর এক নির্মমভাবে একঘরে হয়ে যাওয়া। নিজেকে আড়াল করতে নাম পাল্টে হয়ে যান রাজাম্মা।
রাজম্মার জন্ম ১৯০০ সালের শুরুর দিকে, তৎকালীন ত্রিবাঙ্কুর রাজ্যের (বর্তমান কেরালা) একটি নিপীড়িত দলিত পরিবারে। তারা ছিলেন পুলায়া সম্প্রদায়ের ঘাস কাটার শ্রমজীবী মানুষ। যারা মানুষ নয়, বরং ‘সম্পত্তি’ হিসেবে বিবেচিত হতো। ভূমির সঙ্গে বিক্রি হতো পুলায়া সম্প্রদায়ের মানুষ।
এই ভয়ঙ্কর বাস্তবতার মাঝে পালাবদলের ভাষা হিসেবে অভিনয়কে বেছে নেন রাজাম্মা। একটি থিয়েটারপ্রেমী পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি স্থানীয় নাট্যদলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সেখানেই তাকে খুঁজে পান পরিচালক জে.সি. ড্যানিয়েল, যাকে মালায়ালাম সিনেমার জনক বলা হয়।
১৯২৮ সালে নির্মিত হয় ভিগাথাকুমারন — ভারতের ইতিহাসে প্রথম মালায়ালাম ভাষার পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ছবিতে রোজি অভিনয় করেন ‘সরোজিনী’ চরিত্রে, যিনি ছিলেন উচ্চবর্ণের নারী। এই সাহসী নির্বাচনই রোজির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়— না, গৌরবের দিকে নয় বরং বঞ্চনার দিকে।
দলিত জনগোষ্ঠীর বলে প্রিমিয়ারের দিন সিনেমা হলে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি রোজিকে। সমাজ মেনে নিতে পারেনি একজন দলিত নারীর রুপালি পর্দায় উচ্চবর্ণের নারীর চরিত্রে অভিনয়। সিনেমা চলাকালীন দর্শকরা ক্ষুব্ধ হয়ে পাথর ছুঁড়তে থাকেন পর্দায়, ভাঙচুর করা হয় থিয়েটার, পরিচালককে মেরে তাড়িয়ে দেয়া হয়। এরপর জে.সি. ড্যানিয়েল আর কোনো সিনেমা নির্মাণ করেননি।
এরপর শুরু হয় রোজির নিঃসঙ্গতা। তার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। বাধ্য হয়ে তিনি নিজের শহর ছেড়ে পালিয়ে যান। পরিচিতি থেকে দূরে থাকতে তিনি তার পুরনো জীবন ও পরিবারের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এক উচ্চবর্ণের পুরুষকে বিয়ে করে নাম পরিবর্তন করে হন রাজাম্মা। নাগেরকোয়েল শহরে তার জীবন কাটে নিঃশব্দে। এক সময়, রোজির সন্তানরাও তার অতীতকে অস্বীকার করে।
রোজির জীবনের প্রমাণ আজ প্রায় বিলুপ্ত। ভিগাথাকুমারন চলচ্চিত্রের কোনো রিল অবশিষ্ট নেই। তার ছবি বলতে রয়েছে শুধু একটি সাদাকালো প্রতিকৃতি। এমনকি তার ১২০ তম জন্মদিনে গুগল ডুডলের করা প্রতিকৃতিটিও তার নয় বলে জানিয়েছেন পরিবার ও গবেষকরা।
রোজির জীবনের উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে বই, তৈরি হয়েছে তথ্যচিত্র। কিন্তু আজও তাকে ভারতের চলচ্চিত্র ইতিহাসে স্বীকৃতি দেয়া হয় অপ্রতুলভাবে। ১০ দিনের অভিনয়ের জন্য পাওয়া দৈনিক পাঁচ টাকা তাকে এনে দিয়েছিল সমাজের ক্রোধ, নিঃসঙ্গ জীবন এবং ইতিহাসে চাপা পড়ে যাওয়া এক অধ্যায়।
পি কে রোজি শুধুমাত্র একজন অভিনেত্রী নন, তিনি ছিলেন প্রতিরোধের প্রতীক। সমাজ যখন ‘না’ বলেছিল, তিনি অভিনয় দিয়ে ‘হ্যাঁ’ বলেছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সেই হ্যাঁ-র গলা চেপে ধরা হয়েছিল কালের নিষ্ঠুরতায়।
বিবিসি অবলম্বনে










