কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তায় নতুন এক চ্যালেঞ্জ দেখা দিচ্ছে। এ চ্যালেঞ্জ মানুষ নয়, বরং স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হওয়া নন-হিউম্যান আইডেন্টিটি (এনএইচআই), যেমন সার্ভিস অ্যাকাউন্ট, বট, স্ক্রিপ্ট বা এআই এজেন্ট। সাইবার সিকিউরিটিভিত্তিক নিউজ ওয়েবসাইট সাইবার সিকিউরিটি ইন্টিটিলিজেন্সের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এনএইচআই বা মানুষবিহীন ডিজিটাল পরিচয়ের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং এগুলো বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা মূলত মানুষকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে। ব্যবহারকারীকে চেনার জন্য পাসওয়ার্ড, বায়োমেট্রিক বা মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু এখন বড় বড় প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের তুলনায় এনএইচআইয়ের সংখ্যা ৫০ গুণ পর্যন্ত বেশি। এগুলোকে প্রায়ই ‘পর্দার আড়ালের’ অবকাঠামো হিসেবে ধরা হয়, মানুষের মতো নিয়মিত তদারকি বা নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার মধ্যে আনা হয় না। এ এনএইচআইয়ের মধ্যে রয়েছে সার্ভিস অ্যাকাউন্ট, স্ক্রিপ্ট, এপিআই ও বিভিন্ন মেশিন এজেন্ট।
তবে সমস্যা হলো মানুষের অ্যাকাউন্টের মতো এসব এনএইচআই কোনো নিয়মে পরিচালিত হয় না। প্রায়ই সফটওয়্যার পাইপলাইনের মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডে এগুলো তৈরি হয়, আবার পুরনো কোড বা প্রকল্পেও থেকে যায়। একবার চালু হলে এগুলো বছরের পর বছর সক্রিয় থাকে, এমনকি কাজ শেষ হয়ে গেলেও বন্ধ হয় না। কোনো কর্মী চলে গেলেও এসব পরিচয় মুছে ফেলা হয় না, লগইন অ্যালার্ট বা নিরাপত্তা যাচাইও হয় না। এদের জন্য মানবসম্পদ বিভাগ (এইচআর) কোনো প্রক্রিয়া চালু রাখে না, সতর্কবার্তাও আসে না, নিয়মিত পর্যালোচনা হয় না। ফলে ঝুঁকি বাড়তে থাকে।
এ ঝুঁকি বাস্তবে কতটা গুরুতর হতে পারে, তার উদাহরণ ঘটেছিল ২০২৪ সালে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের সোর্স কোড হারিয়ে ফেলে কোনো জটিল সাইবার হামলার কারণে নয়, বরং একটি অতিরিক্ত অ্যাকসেস টোকেনের কারণে। ওই টোকেনের মেয়াদ ছিল অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ এবং সেটি এক পর্যায়ে হ্যাকারদের হাতে পড়ে। কোনো মানুষ নয়, বরং একটি এনএইচআই এ চুরির মূল মাধ্যম ছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এনএইচআই দ্রুত ও অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে ওঠে। একজন ডেভেলপার প্রকল্পের কাজের সময় ডজনখানেক সার্ভিস অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন, পরে সেগুলো ভুলে যান। কন্টিনিউয়াস ইন্টিগ্রেশন ও ডিপ্লয়মেন্ট (সিআই/সিডি) প্রক্রিয়ায় প্রতিটি নতুন পরিবেশ বা কন্টেইনারের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরি হয়। এমনকি কিছু সিস্টেম নিজেরাই নতুন আইডেন্টিটি তৈরি করতে সক্ষম।
সমস্যা হচ্ছে, প্রচলিত পরিচয় ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি মূলত মানুষের জন্য তৈরি। মানুষের চেয়েও বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন এনএইচআইকে কোনো নজরদারিতে আনা হয় না। কোনো অফবোর্ডিং, নিয়মিত পর্যালোচনা বা আচরণভিত্তিক যাচাই প্রক্রিয়ার আওতায়ও আনা হয় না। অনেক আইডেন্টিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস ম্যানেজমেন্ট (আইএএম) টুল এসব অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু এ নিয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে পারে না।
তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সত্যিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি এনএইচআইয়ের মালিকানা, ব্যবহার ও দায়িত্ব স্পষ্ট করতে হবে। নাহলে হ্যাকাররা সহজেই এসব ‘অদৃশ্য’ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সংবেদনশীল সিস্টেমে প্রবেশ করতে পারবে।
এআই ও অটোমেশন যত বাড়বে, এনএইচআইয়ের সংখ্যাও তত বাড়বে। এগুলো প্রতিষ্ঠানের জন্য সুফল নাকি ক্ষতির কারণ হবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করবে সেগুলো কতটা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা যায় তার ওপর।










