বিভিন্ন এআই চ্যাটবটের সঙ্গে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলেন অনেকেই। কেউ শেয়ার করেন মনের কথা, কেউ জানান সম্পর্কের টানাপড়েন কিংবা জীবনের একান্ত গোপন তথ্য। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান এসব তথ্য সংরক্ষণ করছে, সেটি একসময় বন্ধ হয়ে গেলে বা দেউলিয়া হলে কী হবে?
এআই চ্যাটবটের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ চ্যাটবট প্রতিষ্ঠান ক্যারেক্টার.এআই। দেউলিয়া হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা প্রতিষ্ঠানটির ব্যবহারকারীদের তথ্য ও ব্যক্তিগত কথোপকথন বিক্রির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যারেক্টার.এআইয়ের চ্যাটবটের সঙ্গে কয়েক কোটি মানুষ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। কেউ এগুলোকে বন্ধু, কেউ আবার প্রেমিক বা প্রেমিকা হিসেবেও দেখেছেন। এসব কথোপকথনে উঠে এসেছে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল নানা তথ্য। এমনকি প্রতিষ্ঠানটির কিছু চ্যাটবট নিজেদের আইনজীবী ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেও পরিচয় দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ক্যারেক্টার.এআইয়ের ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়। এআই খাতের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ভবিষ্যতে আরো অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য দেউলিয়া প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিক্রি হতে পারে।
ইলেকট্রনিক প্রাইভেসি ইনফরমেশন সেন্টারের (ইপিক) এআই ও মানবাধিকার কর্মসূচির পরিচালক ক্যালি শ্রোয়েডারের মতে, সাধারণ চ্যাটবটের তুলনায় মানুষের মতো আচরণ করা এআইয়ের সঙ্গে ব্যবহারকারীরা অনেক বেশি ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য শেয়ার করেন। শুধু নিজের তথ্যই নয়, বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের বিষয়েও অনেক কিছু জানান। ফলে যারা কখনো ওই চ্যাটবট ব্যবহার করেননি, তাদের তথ্যও পরোক্ষভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের ডেটাবেজে চলে আসতে পারে।
দেউলিয়া হলে এসব তথ্যের কী হবে?
ক্যারেক্টার.এআই দেউলিয়া হওয়ার প্রক্রিয়ায় এর কিছু সম্পদ ২ কোটি ডলারে ওয়াল্ট ডিজনি কোম্পানির কাছে বিক্রির চুক্তি করেছে। তবে এ চুক্তিতে ব্যবহারকারীদের তথ্য অন্তর্ভুক্ত নেই। অন্যদিকে আদালতে জমা দেয়া নথিতে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি তাদের ব্যবহারকারীদের তথ্য অন্য ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ৪০টি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলের একটি জোট এ বিষয়ে আদালতের কাছে শিশুদের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
তবে দেউলিয়া হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের তথ্য সুরক্ষার প্রচলিত ব্যবস্থাও অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মেলিসা জ্যাকবির মতে, অনেক প্রতিষ্ঠানের গোপনীয়তা নীতিমালায় দেউলিয়া হওয়ার পরিস্থিতিতে তথ্য ব্যবহারের বিষয়ে বিশেষ ছাড় রাখা থাকে।
ইপিকের ক্যালি শ্রোয়েডারও বলছেন, কোনো প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে গেলে ব্যবহারকারীরা যে তথ্য সুরক্ষিত থাকবে বলে ভেবেছিলেন, সেই নিশ্চয়তা আর কার্যকর নাও থাকতে পারে।
ক্যারেক্টার.এআইয়ের গোপনীয়তা নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যবহারকারীদের তথ্য নতুন ফিচার তৈরি, এআই মডেল প্রশিক্ষণ, অ্যালগরিদম উন্নয়ন এবং লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির তথ্য কিনে নেয়া নতুন ক্রেতারাও এসব কাজে তা ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারেন।
এ উদ্বেগ আরো বাড়িয়েছে শিশুদের সঙ্গে চ্যাটবটের কথোপকথন নিয়ে ওঠা অভিযোগ। এক কিশোরকে তার মা-বাবাকে হত্যায় উৎসাহিত করার অভিযোগ উঠেছিল প্রতিষ্ঠানটির একটি চ্যাটবটের বিরুদ্ধে। আরেক ১৪ বছর বয়সী কিশোরের আত্মহত্যার পেছনেও প্রতিষ্ঠানটির এআইয়ের প্ররোচনা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব কথোপকথনের তথ্যও ভবিষ্যতে অপরিচিত কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যেতে পারে।
ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় যা করবেন
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, যেসব অনলাইন সেবা বা এআই প্ল্যাটফর্মে ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য রয়েছে, সেগুলো নিয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। কোনো সেবা আর ব্যবহার না করলে সম্ভব হলে সেখান থেকে নিজের তথ্য মুছে ফেলতে হবে।
এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মের প্রাইভেসি সেটিংস বা গোপনীয়তা নীতিমালা দেখে তথ্য মুছে ফেলার নিয়ম জেনে নেয়া যেতে পারে। প্রয়োজন হলে কাস্টমার সাপোর্টের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যায়।
এছাড়া এআই চ্যাটবটের কাছে নিজের একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য জানানোর আগে একবার ভেবে নেয়াও জরুরি। কারণ, আজ যে প্রতিষ্ঠান আপনার তথ্য সংরক্ষণ করছে, আগামীকাল সেটি আর টিকে থাকবে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। আর প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলে আপনার ব্যক্তিগত কথোপকথন কার হাতে যাবে, সেটিও আপনার নিয়ন্ত্রণে নাও থাকতে পারে।










