কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের ফলে বিশ্বজুড়ে অনেক বেড়েছে মেমোরি চিপের চাহিদা। কিন্তু সেই চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ বাড়েনি। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভোক্তা (কনজিউমার) ইলেকট্রনিকস বাজারে। বিশ্লেষক ও নির্মাতারা বলছেন, চিপ সংকটের কারণে ২০২৬ সালে স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও গৃহস্থালি ইলেকট্রনিকসের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আর চিপের সরবরাহ সংকট আগামী বছরও অব্যাহত থাকতে পারে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
ডেল, লেনোভো, র্যাসবেরি পাই ও শাওমির মতো শীর্ষ ভোক্তা ইলেকট্রনিকস পণ্য নির্মাতারা জানিয়েছে, মেমোরি চিপের মূল্য বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ডেলের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা জেফ ক্লার্ক বলেন, ‘কোম্পানির খরচ এর আগে কখনো এত দ্রুতগতিতে বাড়েনি। বাড়তি খরচের প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই বহন করতে হবে।’
ডিসেম্বরেই পণ্যের দাম বাড়িয়েছে ব্রিটিশ কম্পিউটার নির্মাতা র্যাসবেরি পাই। খরচ বৃদ্ধির বিষয়কে ‘যন্ত্রণাদায়ক’ বলে উল্লেখ করেছে কোম্পানিটি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পার্সোনাল কম্পিউটার (পিসি) নির্মাতা লেনোভো মেমোরি চিপ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ মজুদ করছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) উইনস্টন চেং।
বিশ্লেষকদের মতে, মেমোরি চিপের সরবরাহ সংকটের মূল কারণ হলো এআই মডেল পরিচালনার জন্য বিশ্বজুড়ে ডাটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণ। এআই সার্ভারের জন্য উচ্চগতির হাই ব্যান্ডউইডথ মেমোরি চিপের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চিপ নির্মাতারা সেদিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। এতে ভোক্তা ইলেকট্রনিকসে ব্যবহৃত অপেক্ষাকৃত কম দামি সেমিকন্ডাক্টরের সরবরাহ কমে গেছে। এতে গাড়ি ও কম্পিউটারসহ নানা পণ্যে ব্যবহৃত ডাইনামিক র্যাম বা ড্রামের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
বিনিয়োগ ব্যাংক ম্যাকয়ারের বিশ্লেষক ড্যানিয়েল কিম বলেন, ‘সব খাতেই মেমোরি চিপের সরবরাহ সংকট দেখা যাচ্ছে। পর্যাপ্ত মেমোরি নিশ্চিত করতে ক্রেতাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।’
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রেন্ডফোর্সের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ড্রামের গড় দাম আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
ড্রাম বাজারের ৭০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্বের দুই বৃহত্তম মেমোরি চিপ নির্মাতা স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স। উভয় কোম্পানি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জন্য ক্রয়াদেশ এরই মধ্যে উৎপাদন সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেছে। স্যামসাং গত মাসে কিছু মেমোরি চিপের দাম সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। কোম্পানিটির এক নির্বাহী বলেন, এআই-সংক্রান্ত সার্ভারের চাহিদা শিল্পের মোট সরবরাহের তুলনায় অনেকটাই ছাড়িয়ে গেছে।
ভোক্তার ওপর এর প্রভাব অনিবার্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ম্যাকয়ারের ড্যানিয়েল কিম বলেন, ‘২০২৬ সালে ইলেকট্রনিকস পণ্যের দাম ১০-২০ শতাংশ বাড়তে পারে।’
তবে জাপানের বিনিয়োগ ব্যাংক নোমুরার এশিয়া-প্যাসিফিক বিভাগের গবেষণা সহপ্রধান সিডব্লিউ চুং তুলনামূলক সংযত পূর্বাভাস দিয়েছেন। তার ধারণা, কোম্পানিগুলো অন্য খাতে খরচ কমানোর চেষ্টা করায় ইলেকট্রনিকস পণ্যের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বাড়তে পারে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিপ নির্মাতারা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিলেও বাজারে স্বস্তি আসতে সময় লাগবে। একটি চিপ কারখানা গড়ে তুলতে অন্তত দুই থেকে তিন বছর সময়ের প্রয়োজন হয়। ফলে ২০২৭ সালের আগে চিপের সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। এ সময়ে নির্মাতাদের সামনে মূলত দুটি পথ খোলা থাকবে। তারা হয় পণ্যের দাম বাড়াবে, না হলে মুনাফা কমিয়ে বাজারে টিকে থাকার চেষ্টা করবে।










