টেক বিশ্বে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। যদিও প্রযুক্তিটি মানুষের জীবনে নানাভাবে উপকারে আসছে, তবে এআইয়ের কারণে সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনাও দেখা যাচ্ছে অনেক। বেশির ভাগ আলোচনায় এআইয়ের নেতিবাচক দিক, যেমন চাকরি চলে যাওয়া নিয়ে বেশি আলোচনা হয়। কিন্তু সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এআই নতুন চাকরির সুযোগও তৈরি করতে পারে এবং কর্মীদের নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত হতে সাহায্য করতে পারে।

এদিকে বিশ্বব্যাপী মানবসম্পদ বিভাগগুলো ঐতিহ্য ও নতুন উদ্ভাবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পেশাদার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মার্সারের কর্মকর্তা লিসা লায়ন্স বলেন, ‘মানুষ এআইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করবে, এটাই ভবিষ্যৎ। তাই কর্মীদের নতুন চিন্তাধারা ও দক্ষতা শেখানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে।’

তিনি আরো জানান, অনেক কর্মীই বলেন তাদের কাজ একঘেয়ে। এআইয়ের মাধ্যমে এসব পুনরাবৃত্ত কাজ স্বয়ংক্রিয় করে তোলা যেতে পারে। ফলে কাজ আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

বিশ্লেষকরা এ বিষয়ে বলছেন, এটি শিল্পবিপ্লবের মতোই, তবে এবার গতি অনেক বেশি। কিছু চাকরি এআই প্রতিস্থাপন বা স্থানচ্যুত করবে ঠিকই, কিন্তু নতুন চাকরিও তৈরি হচ্ছে ও সামনে হবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতে, উন্নত অর্থনীতির ৬০ শতাংশ কাজ এআই দ্বারা প্রভাবিত হবে। উদীয়মান অর্থনীতিতে এ হার ৪০ শতাংশ আর নিম্ন আয়ের দেশে ২৬ শতাংশ।

ক্লাউড সার্ভিসেস কোম্পানি সেলসফোর্স মিডল ইস্টের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলখোতানি বলেছেন, ‘এআইয়ের বিকাশ অব্যাহত থাকায় এটি ঐতিহ্যগতভাবে মানুষের দ্বারা করা বিভিন্ন ভূমিকা পালনে ক্রমে পারদর্শী হবে।’

এদিকে এআইয়ের কাজ নিয়ে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ফিউচার অব জবস প্রতিবেদন বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রাহকসেবা অন্যতম বা সবচেয়ে কমতে থাকা পেশা হতে পারে। এছাড়া যেসব কাজ খুব সহজে নিয়ম মেনে করা যায় এবং বেশি চিন্তাভাবনার দরকার হয় না, সেগুলো এআই সহজেই করতে পারবে। যেমন টেলিমার্কেটিং, গ্রাহকসেবা, অনুবাদ, প্রুফরিডিং ও কারখানার কিছু কাজ।

অন্যদিকে যেসব কাজে মানুষের অনুভূতি, সিদ্ধান্ত নেয়ার দক্ষতা ও মানসিক বিচক্ষণতা দরকার, সেগুলো এআই এখনো ভালোভাবে করতে পারে না। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা (ডাক্তার, সার্জন, নার্স), শিল্পকলা (ভাস্কর, সংগীতজ্ঞ), সমাজকর্মী ও কাউন্সেলর এবং দক্ষ কারিগরের (ইলেকট্রিশিয়ান, কাঠমিস্ত্রি) মতো কাজ।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজের সহায়ক হতে পারে, কিন্তু একে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা যাবে না বলেই মনে করেন উত্তর আয়ারল্যান্ডের এআই কৌশলবিদ কিরান গিলমারির। কারণ অনেক কাজেই মানুষের বিচারবুদ্ধি, আলোচনার দক্ষতা ও মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা দরকার, যা এআইয়ের নেই।

এ পরিবর্তনের ফলে মানবসম্পদ (এইচআর) বিভাগেও চাপ তৈরি হয়েছে। যদিও অনেক কাজ এআই দিয়ে করা সম্ভব, যেমন নিয়োগ বা কর্মীদের কাজ নজরদারিতে রাখা। তবু মানবিক যোগাযোগ ও আবেগ বোঝার মতো বিষয়গুলো এখনো মানুষেরই দরকার হয়।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে ৮৮ শতাংশ কোম্পানি প্রাথমিক প্রার্থী বাছাইয়ে কোনো না কোনোভাবে এআই ব্যবহার করে। তবে এতে অনেক সময় যোগ্য প্রার্থীরাও বাদ পড়ে যান।

এআই শুধু চাকরি সহজ করে না, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা গড়ে তুলতেও সাহায্য করতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পারসনের তথ্যমতে, দক্ষতা ঘাটতির কারণে মার্কিন অর্থনীতি বছরে প্রায় ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এআইভিত্তিক শিক্ষা প্লাটফর্মগুলো কর্মীদের শেখার সুযোগ করে দেয়, যা দক্ষতা বাড়াতে সহায়ক।

তবে শুধু এআই ব্যবহারে সব সমস্যা সমাধান হয় না। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক র‍‍্যান্ড করপোরেশনের গবেষণা বলছে, ৮০ শতাংশ এআই প্রকল্পই সফল হয় না। এর কারণ অপরিকল্পিত ব্যবহার, ভুল লক্ষ্য নির্ধারণ ও প্রয়োজন ছাড়াই এআই প্রয়োগ।

ব্রিটেনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মটলির প্রতিষ্ঠাতা লুইস মটলি বলেন, ‘এআই সব সমস্যার সমাধান নয়। অনেক সময় গ্রাহকসেবার চ্যাটবটগুলো বারবার একই প্রশ্ন করে, কিন্তু সঠিক উত্তর দেয় না।’

তিনি মনে করেন, সফল হতে হলে মানুষের চিন্তাভাবনার সঙ্গে এআইয়ের ভারসাম্য করে কাজ করতে হবে।

সর্বশেষে বলা যায়, এআই প্রযুক্তি কাজে লাগাতে হলে তা বুঝে ও পরিকল্পনা করে ব্যবহার করতে হবে। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি যেমন কাজের গতি বাড়াবে, তেমনি মানুষকেও আরো গঠনমূলক কাজ করার সুযোগ করে দেবে।

খবর দ্য ন্যাশনাল