ধরা যাক, বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের কোনো সময়। এক শিশু স্কুলের ভর্তি পরীক্ষায় বসে আছে। প্রশ্নে বলা হয়েছে, পছন্দের একজন লেখককে নিয়ে ১৫ মিনিট সময় নিয়ে লিখতে। তাকে উত্তর দিতে হলে আগে ভাবতে হবে, এরপর নিজের জ্ঞান আর চিন্তাভাবনার ওপর নির্ভর করে লিখতে হবে। কিন্তু আজ গুগল জেমিনি, চ্যাটজিপিটি বা সিরি খুললে একই উত্তর পাওয়া যাবে সেকেন্ডের মধ্যে। এভাবে এআইয়ের ওপর নির্ভরশীলতা মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতাটা অনেকটাই সরিয়ে নিচ্ছে। যদিও এতে সময় বাঁচে, তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ প্রবণতা মানুষের বুদ্ধিমত্তা কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ হতে পারে।

প্রযুক্তি নিয়ে এমন আশঙ্কা নতুন নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর মনোনিবেশে বিঘ্ন ঘটায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মনোযোগ ধরে রাখার সক্ষমতা কমায়, জিপিএস ব্যবহার মানুষের পথ চিনে চলার ক্ষমতা নষ্ট করে। এক্ষেত্রে এআই আরো এক ধাপ এগিয়ে। জটিল কাজ, যেমন আর্থিক হিসাব বা পরামর্শ দেয়া, এমনকি কীভাবে চিন্তা করা উচিত তাও বলে দিচ্ছে এ প্রযুক্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইয়ের সুবিধা যেমন আছে তেমন আছে বিপদের ইঙ্গিত।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিক হেলেন থমসন বলছেন, ‘এআই প্রযুক্তি মানুষের হয়ে ভাবনার কাজ করে দিলে আমরা আরো গভীর চিন্তায় মনোনিবেশ করতে পারব, নাকি ধীরে ধীরে সে দক্ষতা হারিয়ে ফেলব- তা এখন ভাবার বিষয়।’

যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী রবার্ট স্টার্নবার্গ বলছেন, ‘এক সময় ভয় ছিল, জেনারেটিভ এএআই মানুষের সৃজনশীলতা বা বুদ্ধিমত্তা নষ্ট করতে পারে। এ আশঙ্কা এরই মধ্যে বাস্তবে রূপ নিয়েছে, যা এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।’

তার মতে, মানুষের বুদ্ধিমত্তা কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ উঠে এসেছে একাধিক গবেষণায়। এর পেছনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রমাণ হিসেবে সামনে আসে ফ্লিন ইফেক্ট। এতে দেখা যায়, ১৯৩০ সাল থেকে কয়েক দশক ধরে বিশ্বজুড়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মে মানুষের গড় আইকিউ ক্রমে বাড়ছিল। কারণ হিসেবে ধরা হয় উন্নত শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ ইতিবাচক প্রবণতা থেমে গেছে, কিছু ক্ষেত্রে উল্টো দিকে যাওয়ার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। এ পরিবর্তনের পেছনে প্রযুক্তির, বিশেষ করে এআইয়ের ভূমিকা নিয়েই এখন বাড়ছে আলোচনার ঝড়।

এআই মানুষের মস্তিষ্কে কী প্রভাব ফেলছে, তা বোঝার জন্য গবেষণাগুলো বেশির ভাগই গুরুত্ব দেয় জেনারেটিভ এআইকে। ফোন বা কম্পিউটারে সহজেই এখন লেখা, প্রোগ্রামিং, এমনকি ছবি আঁকাও সম্ভব মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই। জীবনের নানা ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি ব্যাপক সুবিধা দিচ্ছে।

গোল্ডম্যান স্যাকস ২০২৩ সালে অনুমান করেছিল, আগামী ১০ বছরে জেনারেটিভ এআই বছরে বিশ্বব্যাপী জিডিপির ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। অর্থাৎ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এআইয়ের ভূমিকা অনেক বড়।

তবে আশঙ্কার জায়গা হলো, যেসব কাজ এখন প্রযুক্তি করে দিচ্ছে, তা মানুষ নিজে আর তেমনভাবে চর্চা করে না। ফলে যেসব মানসিক অনুশীলন মস্তিষ্কের গঠনকে শক্ত করে, সেগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, যেমন শরীরচর্চা বন্ধ রাখলে পেশির ক্ষতি হয়, তেমনি চিন্তার ভার এআইয়ের কাঁধে তুলে দিলে মস্তিষ্কের দক্ষতাও কমে যায়।

একটি যৌথ গবেষণা পরিচালনা করেছে মাইক্রোসফট ও কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটি। সপ্তাহে অন্তত একবার জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করা ৩১৯ পেশাদারকে নিয়ে করা এ জরিপে মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য।

গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ব্যবহারকারীরা কাজের গতি বাড়াতে পারলেও, তাদের সমালোচনামূলক চিন্তার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে তারা এআইয়ের ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন যে প্রযুক্তির সহায়তা ছাড়া সমস্যা সমাধান করা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

অন্যান্য গবেষণায়ও দেখা গেছে, স্মৃতিভিত্তিক কাজগুলো বারবার এআই দিয়ে করালে মানুষের স্মরণক্ষমতা ক্রমে কমে যেতে পারে।

দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে