স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সব সূচকে নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে এগিয়ে থাকার পরও বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা আরো তিন বছর বাড়ানো একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলো শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও রাজনৈতিক পরিবর্তন, অর্থনীতির দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়গুলো সময় বৃদ্ধির আবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে।
রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ: জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো বলেন, এলডিসি উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ নির্ধারিত তিনটি সূচকেই সফলভাবে মানদণ্ড পূরণ করেছে। জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ পরপর দুটি মূল্যায়নে অর্থাৎ ছয় বছর ধরে উত্তরণের মানদণ্ড পূরণ করলে তাকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের করে নেয়া হয়। সেই হিসাবে বাংলাদেশের ২০২৪ সালেই এলডিসি তালিকা থেকে বের হওয়ার কথা ছিল। তবে কোভিড পরিস্থিতির কারণে উত্তরণের প্রস্তুতির সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে ২০২৪ সালের পরিবর্তে ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের উত্তরণের সময় নির্ধারিত হয়।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকগুলোর অবস্থান বেশ শক্তিশালী। মাথাপিছু জাতীয় আয় বা জিএনআইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে প্রায় ১৬ শতাংশ এগিয়ে ছিল। মানবসম্পদ সূচকে এগিয়ে ছিল ১৭ শতাংশ এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচকে প্রায় ৩২ শতাংশ ভালো অবস্থানে ছিল। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এসব সূচকে বাংলাদেশের ধারাবাহিক উন্নতি হয়েছে। জাতিসংঘের ৪৪টি স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জনকারী অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
উত্তরণের সময় আরো তিন বছর বাড়ানোর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে চিঠি লিখে বাংলাদেশের উত্তরণের জন্য অতিরিক্ত তিন বছর সময় চান। সবগুলো সূচকে নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে এগিয়ে থাকার পরও বাংলাদেশকে এই সময় দেওয়া হয়েছে। এটি একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপালও অতিরিক্ত সময় চেয়েছিল এবং উভয় দেশকেই এই সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
ড. দেবপ্রিয় আরো বলেন, সিডিপির নিয়মে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন সরাসরি উত্তরণের সময় বাড়ানোর কারণ হিসেবে বিবেচিত হয় না। তবে গণতান্ত্রিক উত্তরণের সময় দেশের অর্থনীতিতে যেসব জটিলতা তৈরি হয়েছে, সেগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এসব কারণে অর্থনীতি কিছুটা দুর্বল হয়েছে এবং বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবেলার সক্ষমতাও কমেছে। ফলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা সময় বৃদ্ধির আবেদনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজে জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে চিঠি দিয়ে অতিরিক্ত সময় চাওয়ায় বিষয়টি শুধু আমলাতান্ত্রিক কিংবা কারিগরি প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর মাধ্যমে সরকার পুরো প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক দায়িত্ব ও মালিকানা গ্রহণ করেছে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের সময় বৃদ্ধির আবেদনের বিষয়ে বিভিন্ন দেশের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং ওইসিডিভুক্ত দেশগুলো বাংলাদেশের আবেদনের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিল। অন্যদিকে, ভেটো ক্ষমতাধর কয়েকটি বড় দেশ এই উদ্যোগের পক্ষে তেমন অবস্থান নেয়নি। এ ছাড়া নিম্ন-মধ্যম আয়ের কিছু দেশ এবং বাংলাদেশের প্রতিযোগী কয়েকটি দেশ একটি সফল অর্থনীতিকে অতিরিক্ত সময় দেওয়ার বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ, অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান প্রমুখ।










