বাংলাদেশের জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধিতে কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তারপরও ব্যাংক, আর্থিক ও ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মতো আনুষ্ঠানিক পর্যায় থেকে অর্থায়ন পেতে পিছিয়ে রয়েছে খাতটি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্য বলছে, সিএমএসএমই খাতের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি উদ্যোগ আনুষ্ঠানিক খাত থেকে ঋণ পায় না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জটিল ঋণ প্রক্রিয়া, জামানতের অভাব, পর্যাপ্ত নথিপত্রের ঘাটতি এবং ব্যাংকগুলোর বড় ঋণের প্রতি আগ্রহের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়ছেন। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে চড়া সুদে অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে ঋণ নিচ্ছেন, যা তাদের ব্যবসার ব্যয় বহু গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সিএমএসএমই খাতের অবদান নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। এতে দেখা গেছে, এ খাতে ঋণ বিতরণ বৃদ্ধির সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ২০০৯ সালে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সিএমএসএমই খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৩১ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালে প্রায় সাত গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২ লাখ ২৯ হাজার ৩১২ কোটি টাকায় পৌঁছায়। যদিও পরবর্তী দুই বছরে এ অর্থায়ন কিছুটা কমে গেছে। ২০২৪ সালে সিএমএসএমই খাতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ২ লাখ ১৪ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালে ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা।
সামগ্রিকভাবে সিএমএসএমইতে অর্থায়নের ব্যাপ্তি বাড়লেও দেশের উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশ এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ২০২১ সালের তথ্যানুযায়ী, ৭২ শতাংশ সিএমএসএমই উদ্যোক্তাই ব্যাংক ঋণের বাইরে। এছাড়া তাদের ঋণ সুবিধা মোট ব্যাংক ঋণের মাত্র ২০ দশমিক ২ শতাংশ।
এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, দেশের আনুমানিক ১ কোটি ১৭ লাখ উদ্যোক্তার মধ্যে ৭৭ শতাংশের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পৌঁছায়নি। এছাড়া মাত্র ৯ শতাংশ সরাসরি ব্যাংক ঋণ এবং ১৪ শতাংশ ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থায়ন পান।
বিআইবিএমের গবেষণায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে মডেল ব্যবহার করে বলা হয়, সিএমএসএমই ঋণ সরাসরি কর্মসংস্থান বৃদ্ধির চেয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বেশি অবদান রাখে। তাই কেবল অর্থায়ন বাড়ালেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্মসংস্থান বাড়বে না, বরং সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যাংক ঋণের পাশাপাশি সম্পূরক নীতি ও লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
প্রতি ত্রৈমাসিকে সিএমএসএমই অর্থায়ন নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির সর্বশেষ প্রকাশিত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তথ্যানুযায়ী, সিএমএসএমই খাতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকায়, যদিও তা আগের প্রান্তিকের চেয়ে ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ কম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশের ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণ স্থিতির ন্যূনতম ২৫ দশমিক ৫০ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বিতরণ করার কথা। যদিও মার্চ শেষে এ স্থিতি ১৫ দশমিক ৮৭ শতাংশে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘সিএমএসএমই খাতের টেকসই উন্নয়ন ও উদ্যোক্তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুরু থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে। এটি সত্য যে এ খাতের উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের আওতার বাইরে রয়েছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন স্কিম, সহজ শর্তে ঋণ এবং ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমসহ নানা নীতিমালা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। বিশেষত কভিড-১৯ মহামারীর মতো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে উঠে এবং বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরকালীন পরিস্থিতিতেও আমরা এ খাতের গতিশীলতা ধরে রাখতে সচেষ্ট আছি।’










