স্মৃতিকথা ‘মেকিং ইট সো’য় এভাবেই নিজের জন্মের কথা উল্লেখ করেছেন ব্রিটিশ অভিনেতা স্যার প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। এর পরে জানিয়েছেন তার মা অনেকটা সময় কষ্ট করে অপেক্ষা করেছিলেন যেন ধাত্রীর সিনেমা দেখায় অসুবিধা না হয়। এমন এক ব্যক্তির বাকি জীবন থিয়েটার ও ক্যামেরার সামনে অভিনয়ে কাটবে তা হয়তো নিয়তি নির্ধারিতই ছিল।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে বিভিন্ন মাধ্যমে অভিনয় করেছেন প্যাট্রিক। বিচিত্র চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। তার অভিনয় জীবন যেন দুটি ভিন্ন জগতের মধ্যে এক অসাধারণ সেতুবন্ধ। একদিকে মঞ্চে তিনি অভিনয় করেছেন শেকসপিয়র, অন্যদিকে ক্যামেরার সামনে কল্পবিজ্ঞানের মহাকাশযানে উড়েছেন।

‘স্টার ট্রেক’-এর ক্যাপ্টেন জ্যঁ-লুক পিকার্ড কিংবা ‘এক্স-মেন’ সিরিজের অধ্যাপক চার্লস জেভিয়ার—দুই চরিত্রেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন দর্শকের প্রিয় মুখ। কিন্তু পর্দার এ আন্তর্জাতিক খ্যাতির আড়ালে ছিলেন আরেক অভিনেতা। তার কাছে থিয়েটার ও শেকসপিয়র ছিল আজীবনের ভালোবাসা। ৮৬ বছর বয়সে, গত ৩০ অক্টোবর তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হলো অভিনয়ের এক দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য অধ্যায়।

32

ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের মেফিল্ডে জন্ম প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের। শৈশব কেটেছে আর্থিক অনটনের মধ্যে। অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তার এক ইংরেজি শিক্ষক। কিশোর বয়সেই শেকসপিয়রের নাটকের সঙ্গে পরিচয়। পরে ব্রিস্টল ওল্ড ভিক থিয়েটার স্কুলে প্রশিক্ষণ। ১৯৬৬ সালে যোগ দেন রয়্যাল শেকসপিয়র কোম্পানিতে (আরএসসি)। পরবর্তী সময়ে এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়ে ওঠে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। চার দশকের বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে আরএসসির ৪০টিরও বেশি প্রযোজনায় অভিনয় করেছেন তিনি।

শেকসপিয়রের নাটকে শাইলক, প্রসপেরো, ম্যাকবেথ, অ্যান্টনি ও ক্লডিয়াসের মতো চরিত্রে অভিনয় করে মঞ্চে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন স্টুয়ার্ট। তার কণ্ঠের গভীরতা, সংলাপ বলার স্বতন্ত্র ভঙ্গি এবং শরীরী অভিব্যক্তির সংযমী ব্যবহার চরিত্রগুলোকে দিয়েছিল আলাদা মাত্রা। ২০০৮ সালে ডেভিড টেন্যান্টের হ্যামলেটের বিপরীতে ক্লডিয়াস চরিত্রে তার অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। শেকসপিয়রের নাটকে দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় পোক্ত স্টুয়ার্ট ক্যামেরার সামনেও হয়ে উঠেছিলেন অভিনয়ের শরীরী ভাষার প্রতীক।

তবে রাতারাতি তারকা বনে যাননি প্যাট্রিক। তার বিশ্বজোড়া পরিচিতি একটু দেরিতেই এসেছে। ১৯৮৭ সালে ‘স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন’-এ ক্যাপ্টেন জ্যঁ-লুক পিকার্ডের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। মহাকাশযান ইউএসএস এন্টারপ্রাইজের অধিনায়ক পিকার্ড ছিলেন বিচক্ষণ, যুক্তিবাদী ও নৈতিকতায় দৃঢ় এক নেতা। কল্পবিজ্ঞানের চরিত্র হলেও স্টুয়ার্ট তাকে করে তুলেছিলেন মানবিক, সংবেদনশীল ও বিশ্বাসযোগ্য। বিজ্ঞান, যুক্তি, সহনশীলতা ও নেতৃত্বের যে আদর্শ পিকার্ডের মধ্যে ফুটে উঠেছিল, তা চরিত্রটিকে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক গুরুত্বও এনে দেয়।

২০০০ সালে মুক্তি পায় ‘এক্স-মেন’। কল্পবিজ্ঞান কমিকবুক সিনেমাটিতে প্রফেসর চার্লস জেভিয়ার চরিত্রে হাজির হন তিনি। টেলিপ্যাথিক ক্ষমতার অধিকারী এ চরিত্রের মধ্যেও ছিল সহমর্মিতা, শান্তি ও সহাবস্থানের বার্তা। এক্স মেনের জনপ্রিয়তা প্রবাদতুল্য। এ সিনেমায় অভিনয় করার পর আজও স্যার প্যাট্রিককে অনেক দর্শক চার্লস জেভিয়ার নামেই চেনে।

‘স্টার ট্রেক’ প্যাট্রিক স্টুয়ার্টকে এক যাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল। ‘এক্স-মেন’ তাকে সে যাত্রার নায়কে পরিণত করে। পৃথিবীর দুই জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজিতে অভিনয় করেও স্টুয়ার্ট নিজেকে নির্দিষ্ট কোনো ঘরানায় আটকে রাখেননি। মঞ্চে ফিরেছেন বারবার, পাশাপাশি কাজ করেছেন চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের নানা ধরনের চরিত্রে।

২০২০ সালে করোনা মহামারীর সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত শেকসপিয়রের সনেট আবৃত্তি করে নতুন প্রজন্মের কাছেও কবির কবিতা পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি। ২০২৩ সালে প্রকাশ হয় তার স্মৃতিকথা ‘মেকিং ইট সো’। বইয়ে নিজের জীবন ও অভিনয়যাত্রার নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।

দুবার লরেন্স অলিভিয়ের পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা পেয়েছেন স্টুয়ার্ট। অবশ্য পুরস্কারের তালিকায় চোখ রাখলে মনে হয় অভিনয়ে অবদান ও প্রতিভার তুলনায় কম পুরস্কারেই পেয়েছেন। তবে নাট্যকলায় অবদানের জন্য ২০১০ সালে তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

বাস্তবে পুরস্কার কিংবা জনপ্রিয়তার বাইরেও তার বড় পরিচয় একজন অভিনেতার, যিনি মঞ্চ ও বড় পর্দায় সমানতালে অভিনয় করেছেন। মহাকাশের অসীম বিস্তারে পিকার্ড হয়ে দর্শককে নেতৃত্বের পাঠ দিয়েছেন, আবার মঞ্চে দাঁড়িয়ে শেকসপিয়রের চরিত্রদের জটিল অনুভূতি উন্মোচন করেছেন। এ দুই জগতের মাঝখানে নিজের অভিনয় প্রতিভার যে স্বাক্ষর রেখে গেলেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট, তা সহজে মুছে যাওয়ার নয়।