ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে ইরানীয় ভাষার কিউরেটর উরসুলা সিমস-উইলিয়ামস। সম্প্রতি তিনি ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে কিছু পাণ্ডুলিপি নিয়ে কাজ করছিলেন। সেগুলো ছিল মহীশুরের টিপু সুলতানের লাইব্রেরির অংশ। ১৭৯৯ সালে শ্রীরঙ্গপট্টমের পতনের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সেগুলো হস্তগত করে। সম্প্রতি জোশুয়া এরলিখ তার প্লান্ডার অ্যান্ড প্রেস্টিজ প্রবন্ধে কীভাবে টিপু সুলতানের লাইব্রেরির সংগ্রহ লন্ডনে হাজির হয়েছে তার বর্ণনা দিয়েছেন। আবার উরসুলা নিজেও এ বিষয়ে বেশকিছু নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন।

ব্রিটিশরা টিপুকে পরাজিত করে তার গ্রন্থাগার লুট করেছিল। কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হচ্ছে টিপু নিজেও তার গ্রন্থাগার তৈরি করতে এ পদ্ধতিই অবলম্বন করেছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল সুফি মুহাম্মদ নাজিব খান শহীদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ। নাজিব ছিলেন দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকের নবাব আনোয়ার উদ দিন খানের (শাসনকাল ১৭৪৪-৪৯) একজন কর্মকর্তা। দরবারি জীবনে নিজের সুফি ভাব ও সামরিক দায়িত্বের মধ্যে নিশ্চয়ই দ্বন্দ্ব ছিল। তবে উরসুলা সিমস-উইলিয়ামস মনে করেন এ দ্বন্দ্ব ছাপিয়ে নাজিবের মুখ্য পরিচয় তিনি সুফি লেখক ও সংগ্রাহক, যিনি চিশতি ধারা দিয়ে প্রভাবিত ছিলেন। তার সংগ্রহের ধরন ও উপাদান এ পরিচয়ের পক্ষে শক্ত প্রমাণ দেয়।

তুজুক-ই ওয়ালাজাহি থেকে জানা যায় দক্ষিণ ভারতের ওয়ালাজাহ রাজত্বের ইতিহাস। এ গ্রন্থ ১৭৮৬ সাল নাগাদ রচনা করেন বুরহান ইবনে হাসান। তুজুক-ই ওয়ালাজাহি থেকে জানা যায় মুহাম্মদ নাজিব খান ছিলেন মূলত আজমীরের বাসিন্দা এবং সেখানে তিনি খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির দরগার খিদমতগার ছিলেন। ১৬৯৯ সালের দিকে আনোয়ার উদ দিন খান যখন শাহজাহানাবাদে মোগল দরবারে যুক্ত হন, তখন থেকে নাজিব তার সর্বক্ষণের সঙ্গী এবং পরামর্শদাতা হয়ে ওঠেন। পরে নাজিব হয়ে ওঠেন আনোয়ার উদ দিন খানের ডান হাত।

হায়দরাবাদে ফরাসি ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লড়াইয়ের মাঝে আটকে নিহত হন নাজিব। দ্বিতীয় কর্ণাটকি যুদ্ধের সময় ১৭৪৯ সালে আম্বুরের লড়াইয়ে নাজিব খান তার পৃষ্ঠপোষক আনোয়ার উদ দিন খানের সঙ্গে নিহত হন। তাদের শহীদ হিসেবে মর্যাদা দেয়া হয়। বিভিন্ন ফার্সি দলিলে এর উল্লেখ আছে।

মুহাম্মদ নাজিব খানের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার প্রমাণ পাওয়া যায় তার মাখজান-ই আ’রাস থেকে (মৃত্যুবার্ষিকীর সংকলন)। এটি একটি দিনপঞ্জি, যেখানে সুফি সন্তদের মৃত্যুর দিনগুলোর উল্লেখ রয়েছে। এতে বিশেষত লক্ষ করা যায় ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে তখন পর্যন্ত চিশতি তরিকার সুফি সন্তদের মৃত্যুবার্ষিকীর তালিকা।

মাখজান-ই আ’রাস এর দীর্ঘ ভূমিকায় মুহাম্মদ নাজিব তার পুরো নাম উল্লেখ করেছেন মুহাম্মদ নাজিব কাদিরি নাগাবারি আজমিরী। ভূমিকায় নাজিব অষ্টাদশ শতকের বিভিন্ন ধর্মীয় যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তার পৃষ্ঠপোষক আনোয়ার উদ দিন খানকে ‘দরবেশদের ভক্ত, তাদের ওপর বিশ্বাস রাখা বিশ্বাসীদের মধ্যে বিশ্বাসী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

নাজিবের কাজটি সমাপ্ত হয় ১১৫৬ হিজরির ৫ শাওয়াল (১৮ নভেম্বর, ১৭৪৩) তারিখে। আনোয়ার উদ দিন খান সে সময় নিজাম আল-মুলক আসফ জাহ (হায়দরাবাদের নিজাম ১৭২৪-৪৮)-এর সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত ছিলেন। ভেলোরের সুফি কবি আবদুল লতিফ জকি (মৃ. ১৭৮০ খ্রি.) রচিত নাজিব নামাহ সম্ভবত মুহাম্মদ নাজিবকে নিয়েই রচিত।

টিপু সুলতানের লাইব্রেরির সর্বমোট ১৬টি খণ্ড মুহাম্মদ নাজিব খানের সংগ্রহ ছিল বলে প্রমাণিত। চারটি ভিন্ন সিলমোহরে যে তারিখগুলো পাওয়া গেছে—১১৪৩ হিজরি (১৭৩০/৩১ খ্রি.), ১১৫৪? হিজরি (১৭৪১/৪২), ১১৫৭ হিজরি (১৭৪৪/৪৫ খ্রি.) এবং একটি তারিখ পড়া যায় না এমন অস্পষ্ট।

নাজিবের পাণ্ডুলিপির সংগ্রহে ছিল সুফি ও ধর্মীয় সাহিত্য—এসব পাণ্ডুলিপির অনেকগুলো তিনি তার মাখজান-ই আ’রাস রচনায় ব্যবহার করেছেন। এসব পাণ্ডুলিপির বেশির ভাগই ফার্সি ভাষায় রচিত। আছে আরবি পাণ্ডুলিপি আইন আল-ইলম। এটি নাজিব শ্রিকাকুলামের নিজের হাতে কপি করেছিলেন, ১৭৩৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তার এই কপি করার কাজ শেষ হয়।

নাজিবের পাণ্ডুলিপিগুলো ১৫৭৭-১৭৪৯ সালের মধ্যকার। বেশ কিছু পাণ্ডুলিপিতে সংগ্রহের বিস্তারিত বিবরণী পাওয়া যায়। এগুলো থেকে জানা যায় ১৭৪৩ সালে নাজিব ছিলেন হায়দরাবাদে এবং ১৭৪৭-৪৯ সালের মধ্যে অবস্থান করেছেন আরকোটে। উল্লেখ্য, তার পৃষ্ঠপোষক আনোয়ার উদ দিন খান ১৭২৫-৪৩ পর্যন্ত হায়দরাবাদের গভর্নর এবং ১৭৪৪-৪৯ মেয়াদে কর্ণাটকের নওয়াব ছিলেন। মুহাম্মদ নাজিবের অনেক পাণ্ডুলিপি ক্রয় করা হয়েছিল—দাম ছিল ৩-৫০ রুপি। আরকোটের মোল্লা আবদুল্লাহ ছিলেন অনেক পাণ্ডুলিপির উৎস। একটি পাণ্ডুলিপিতে আছে অজ্ঞাত আহমাদ খাকপাইয়ের সিলমোহর। এখানে উল্লেখ্য, টিপু সুলতানের গ্রন্থাগারের আরেকটি পাণ্ডুলিপিতে এ খাকপাইয়ের সিলমোহর পাওয়া যায়।

টিপুর গ্রন্থাগারে নিশ্চিতভাবেই আরো অনেক পাণ্ডুলিপি ছিল, যেগুলোর কিছু আছে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির গ্রন্থাগারে। টিপুর গ্রন্থাগারের অনেক সংগ্রহই এখানে আছে। এখানে আছে মাখজান-ই আ’রাসের একটি কপি।

কোনো সন্দেহ নেই যে টিপু সুলতান সুফি সন্তদের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। মাখজান-ই আ’রাসের আরেকটি কপি টিপুর অনুরোধে কপি করেছিলেন শ্রীরঙ্গপট্টমের মসজিদ-ই আলা’র সুপারিনটেন্ডেন্ট সৈয়দ আলী রিজা। তিনি আরো কিছু পাণ্ডুলিপি টিপু সুলতানের জন্য কপি করেছিলেন। সন্তদের মৃত্যুবার্ষিকী নিয়ে টিপু নিজের একটি বর্ষপঞ্জিও (সাহিফাত আল-আরাস) তৈরি করেছিলেন, তবে এতে কেবল ছিল নাম ও মৃত্যুবার্ষিকীর তারিখ।

মুহাম্মদ নাজিবের মৃত্যুর পর তার সংগ্রহের পরিণতি কী হয়েছিল তা স্পষ্ট নয়। যৌক্তিকভাবে অনুমান করা যায় যে নাজিবের সংগ্রহ চলে গিয়েছিল তার পৃষ্ঠপোষক আনোয়ার উদ দিন খানের পুত্র নওয়াব আবদ আল-ওয়াহাব খানের গ্রন্থাগারে এবং ওয়াহাবের গ্রন্থাগার আবার টিপু সুলতানের পিতা হায়দার আলী ১৭৮০ সালে দখল করে নেন।

১৬ খণ্ডের কোনোটিতেই আবদ আল-ওয়াহাবের কোনো সিলমোহর বা তার পরিচয়জ্ঞাপক কোনো নির্দেশনা ছিল না।

মুহাম্মদ নাজিব খানের সংগ্রহ দুটি পাণ্ডুলিপির বিবরণ—

—রাশাহাত-ই আইন আল-হায়াত, আলী ইবনে হুসায়েন কাশিফি লিখিত নকশবন্দি তরিকার সুফি সন্তদের জীবনী। এতে তারিখ দেয়া আছে ৭ মার্চ ১৫৭৭ এবং এটি কপি করেছেন মুহাম্মদ হুসায়েন ইবনে মাওলানা আবুল-কাসিম আল-হারাভি। এতে মুহাম্মদ নাজিবের সীলমোহর দেয়া আছে হিজরি ১১৪৩ সালের (১৭৩০/৩১ খ্রিস্টাব্দ)।

—আইন আল-ইলম, আরবি ভাষায় রচিত অজ্ঞাত লেখকের রচনা। ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতা নিয়ে একটি সংকলন। শ্রীকাকুলামে এটি নিজের হাতে কপি করেছিলেন নাজিব খান। বইয়ের টাইটেল পাতায় তিনি খান সাহেব মুহাম্মদ নাজিব খান নামে স্বাক্ষর করেছেন। তারিখটি ছিল ১৭৩৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর।

এসএম রশিদ: লেখক