রাজা-মহারাজাদের নানা রকম খেয়াল থাকে। সম্রাট আকবরের পছন্দ ছিল হাতি। রত্ন-পাথরের প্রতি শাহজাহানের তীব্র মোহ ছিল। এ দুই মোগলের পূর্বপুরুষ, দ্বিতীয় মোগল বাদশাহ হুমায়ূনের আগ্রহ ছিল বইয়ের প্রতি। জ্ঞান আহরণ এবং সংরক্ষণের ক্ষেত্রে মোগলদের ভূমিকা ছিল। মোগলদের প্রভাব পড়েছিল ভারতের অন্যান্য অংশে, এমনকি যেখানে তাদের ক্ষমতার হাত সরাসরি পৌঁছেনি, সেখানেও। ফলে সুদূর দাক্ষিণাত্যে, মারাঠা অধিকৃত হয়েও মহীশুরের টিপু সুলতান জ্ঞান অর্জন এবং সংরক্ষণ, কোনোটিই অবহেলা করেননি। সে প্রমাণ রয়েছে প্রথমত তার সংগৃহীত যুদ্ধাস্ত্র, সমর কৌশল ও রাজনৈতিক জ্ঞানে। কিন্তু ইতিহাসের মূলস্রোতে যা আলোচিত হয় না, তা হলো টিপু সুলতানের একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারও ছিল এবং সেখানে দেশ-বিদেশের নানা গ্রন্থের সংগ্রহটিও ছিল সমৃদ্ধ এবং তার মধ্যে ছিল টিপুর নিজস্ব একটি গ্রন্থ।

দাক্ষিণাত্যে টিপুর রাজ্য প্রতিষ্ঠার সময়ে দাক্ষিণাত্যের অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ না থাকলেও এটুকু বলে রাখা ভালো যে মোগল শাসনের দ্বিতীয়ার্ধে মারাঠা উত্থানের সময় জটিল রাজনৈতিক অবস্থার পাশাপাশি দক্ষিণ উপকূলে ইউরোপীয় বণিকরাও শক্তিবৃদ্ধি করে চলছিল। এ অবস্থায় রাজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা করা সহজ ছিল না। মহীশুরের টিপু সুলতান তার রাজ্যজুড়ে জ্ঞান বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন কিনা সে বিষয়ে তর্ক হতে পারে কিন্তু নিজে তা করতেন। তার পরাজয়ের পর ইংরেজরা সেসব নিদর্শন খুঁজে পেয়েছিল। সেসঙ্গে পেয়েছিল একটি অদ্ভুত জিনিস। টিপু সুলতানের নিজের হাতে লেখা তার স্বপ্নের বিবরণ।  

রাজা-বাদশাহদের সময়ে তাদের প্রাত্যহিক কর্মবিবরণী লিখে রাখার চল ছিল। যারা এ কাজ করতেন তাদের ‘ওয়াকিয়ানবিশ’ বলা হতো। আজকের দিনে ইতিহাসের উপাদান হিসেবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত চিঠিপত্রও মূল্যায়ন করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে গবেষকরা দুঃখ করে বলেন, ‘ইংরেজ আমলের আগে এমন লিখিত নথির বড় অভাব।’ কিন্তু তা পুরোপুরি সঠিক নয়। কেননা শাসকরা তাদের শাসনের এবং নিজেদের কথা লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে বরাবরই আগ্রহী ছিলেন। তবে দরবারের বেতনভোগী লেখকদের দ্বারা সাধারণত শাসন ও নীতিনির্ধারণী বিষয়ের বয়ান লিখিত হতো। রাজা, বাদশাহ বা সুলতানদের মধ্যে কেউ কেউ অবসর সময়ে নিজের জবানে নিজের কথা লিখে রাখতেন। কিন্তু ভারতবর্ষের দুর্ভাগ্য যে সেসব খুঁজে বের করে সংরক্ষণ করেছে সেই পশ্চিমের বেনিয়া গোষ্ঠী।

ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আগ্রহোদ্দীপক সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে ফারসি ভাষায় লেখা টিপু সুলতানের একটি পাণ্ডুলিপি। পাণ্ডুলিপিটি কেবল টিপু সুলতানের লেখাই নয় উপরন্তু তার নিজের হাতে লেখা। রচনাটি আরো বিশেষত্বপূর্ণ হয় যখন জানা যায় এটি মূলত টিপু সুলতানের স্বপ্নের বিবরণ। স্বপ্ন বলতে আমরা ‘ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা’ও বুঝি এবং একজন সুলতানের পরিকল্পনা লিপিবদ্ধ করা কোনো অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু পাণ্ডুলিপিটি এ কারণেই অদ্ভুত যে এটিতে ঘুমিয়ে দেখা স্বপ্নের বিবরণ লিখেছেন মহীশুরের সুলতান।

কিন্তু পাঠক, আপনি যদি মুচকি হেসে থাকেন, তাহলে জানাই সুলতানের এ ‘খোয়াবনামা’ তার খামখেয়াল মনে হলেও ঐতিহাসিক মূল্য রাখে। কেননা তার এ খোয়াবনামা থেকে আমরা সেকালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দরকারি তথ্য জানতে পারি। টিপু সুলতানের সময়ের ইতিহাসের পাশাপাশি এ লেখা আমাদের সামনে ব্যক্তি টিপুকেও হাজির করে। স্বপ্নের বিবরণের মধ্যে দিয়ে সুলতানের চিন্তাধারা, তার বিশ্বাস এবং কার্যপ্রণালির হদিস পর্যন্ত পাওয়া যায়। কেননা ওয়াকিয়ানবীশদের লেখার চেয়ে এ লেখা অনেক বেশি ব্যক্তিগত, এখানে সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা বা কোনো কিছু আড়াল করার প্রয়াস কম।

স্বপ্নের মধ্য দিয়ে টিপুকে আবিষ্কারের আগে আমরা তার খোয়াবনামা আবিষ্কারের কথাটা জেনে নিই। মূলত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে টিপুর সেই বিখ্যাত যুদ্ধের পর ইংরেজরা এ পাণ্ডুলিপি ‘উদ্ধার’ করে। শ্রীরঙ্গপট্টমের পতনের পর তত্কালীন গভর্নর জেনারেল মার্কুইস ওয়েলেসলির পক্ষ থেকে আলেকজান্ডার বিস্টন, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বোর্ড অব ডিরেক্টরসের সামনে পাণ্ডুলিপিটি পেশ করেন। বইটির শেষে বিস্টনের স্বাক্ষরের সঙ্গে একটি নোট রয়েছে, যেখানে তিনি লিখেছেন—

‘টিপু সুলতানের স্বপ্নের বিবরণ মূলত শ্রীরঙ্গপট্টমের প্রাসাদে একটি লেখার টেবিলের ওপর থেকে কর্নেল উইলিয়াম কার্কপ্যাট্রিক উদ্ধার করেন। এটিকে দেখে একটি গোপন দস্তাবেজ মনে হয়েছিল। পাণ্ডুলিপিটি উদ্ধারের সময় হাবীব উল্লাহ নামে সুলতানের একজন ঘনিষ্ঠ খেদমতগার সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এ ব্যক্তির ওপর সুলতান তার গোপনীয় বিষয়-আশয়ে নির্ভর করতেন। তার ভাষ্যানুসারে সে জানত যে এখানে সুলতানের বিশেষ কোনো লেখা আছে, কিন্তু সেটি কী বিষয়ে লেখা তা জানত না, কেননা লেখার সময় বা লেখাটি পড়ার সময় কখনো কেউ সুলতানের কাছে আসার আগেই সুলতান তা লুকিয়ে ফেলতেন।’

টিপু সুলতানের লেখাটিকে ঠিক দিনপঞ্জি তো বলা যায় না, তবে কড়চা বললে ভুল হয় না। মোট ৩৭টি স্বপ্নের বিবরণী সমৃদ্ধ করচাটির প্রথম ১৬ পাতায় লেখা আছে এবং পরবর্তী ১৬৬টি শূন্য ফোলিও রয়েছে। শেষ দিকে এসে আবারো ওই একই ধরনের স্মৃতিচারণ পাওয়া যায়। এ লেখাগুলোর সময়ের দিকে নজর দিলে দেখা যায় এগুলো ১৭৮৬ থেকে ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যুর কিছুদিন আগ অবধি লিখিত হয়েছে। অর্থাৎ টিপু সুলতান ১৩ বছর ধরে নিয়মিত তার স্বপ্নের বিবরণ লিখে গেছেন। কিন্তু শেষ দিকে এসে এ লেখায় প্রচুর বানান ভুল দেখা যায়। তিনি এক হরফের জায়গায় অন্য হরফ বসিয়ে দিয়েছে। লেখার বাকি অংশেও তাড়াহুড়োর ছাপ স্পষ্ট।

স্বপ্নগুলোর বর্ণনার দিকে তাকিয়ে গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন কোনো কোনোটি তিনি ঘুম থেকে জেগেই লিখেছেন, আবার কোনো কোনোটি লিখেছেন অনেক পরে। যেগুলো পরে লিখিত হয়েছে সেগুলো কিছুটা এলোমেলো। এমনকি কড়চায় স্বপ্নগুলো তিনি ধারাবাহিকভাবেও লিপিবদ্ধ করেননি। অর্থাৎ নিজের স্বপ্নগুলো টুকে রাখার ইচ্ছা থাকলেও টিপু সুলতান তা লেখার মতো যথেষ্ট সময় পাননি কিংবা হাবীব উল্লাহর জবানি লক্ষ করলে মনে হবে তিনি বিষয়টায় কিছুটা বিব্রতবোধ করতেন। কিন্তু তার লেখা থেকেই দেখা যায় স্বপ্ন নিয়ে তিনি আলোচনাও করেছেন।

অবশ্য এখানে বিব্রতবোধ করার কিছু ছিল না, কেননা টিপু সুলতান মুসলমান ছিলেন এবং মুসলমানদের মধ্যে স্বপ্নের বিশ্লেষণের রীতি রয়েছে।  অনেক সময়েই ওলি-আউলিয়ারাও স্বপ্ন নিয়ে ব্যখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন। এখনো স্বপ্নের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও গুরুত্ব নিয়ে ‘খোয়াবনামা’ ঘরানার বই জনপ্রিয়। তবে বিষয়টি কিছুটা হলেও আধ্যমাত্মিক দ্যোতনা রাখে। এমনকি টিপু সুলতানের স্বপ্নগুলোর কিছু কিছু যথেষ্ট আধ্যাত্মিক। যেমন, ‘বার্তা’ শিরোনামে কড়চায় উল্লেখিত ১২তম স্বপ্নের দিকে যদি লক্ষ করি, তিনি লিখেছেন—

“বুসদ বছরের হায়দারি মাসের ২১ তারিখ, চক্রের ৪০তম বছরে আমি তুঙ্গভদ্রার দূরতম অংশে থেমেছিলাম, সেখানেই একটি স্বপ্ন দেখি: আমার মনে হলো আমি বিচার দিবসে উপস্থিত হয়েছি, যেখানে কেউ কারো প্রতি মনোযোগী নয়। ঠিক সেই সময়ে অপরিচিত এক সত্ত্বা তার শক্তি নিয়ে আমার সামনে উপস্থিত হলেন যার মুখে ছিল লাল দাড়িগোঁফ। আমার হাত নিজের হাতে নিয়ে তিনি বললেন, ‘তুমি কি জানো আমি কে?’ আমি ‘না’ বললে তিনি ফের বললেন, ‘আমি মুর্তজা আলী এবং আল্লাহ প্রেরিত পুরুষ বলেছেন এবং বলে চলেছেন যে তিনি তোমাকে ছাড়া বেহেশতে তার পদধূলি প্রদান করবেন না।’ আমি খুব আনন্দের সঙ্গে জেগে উঠলাম। আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং রাসুল সুপারিশকারী। এই যথেষ্ট।”

এ স্বপ্নের বর্ণনা পড়লে মনে হতে বাধ্য যে একজন ধর্মভীরু মুসলিম স্বপ্নে তার কাঙ্ক্ষিত বার্তা পেয়েছেন। কিন্তু এখানে ভিন্ন অর্থও খুঁজে বের করা সম্ভব। সেদিকে দৃষ্টি দেয়ার জন্য পরবর্তী অর্থাৎ ১৩তম স্বপ্নের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। সুলতান লিখেছেন,

“দেবগিরির পাশে শাহনূরে মারাঠাদের ওপর নৈশ আক্রমণের আগে, বুসদ বছরের খুসরোয়ী মাসের ৬ তারিখ আমি একটি স্বপ্ন দেখি: আমার মনে হলো অল্পবয়সী একজন সুদর্শন যুবক এসে আমার পাশে বসল। নারীদের সঙ্গে চটুল আলাপ করার মতো করে আমি তাকে উদ্দেশ করে কিছু কথা বললাম। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে বোঝালাম, ‘এটা আমার স্বভাবের সঙ্গে যায় না।’ এর কিছুক্ষণ পরই সে উঠে গেল এবং তার পাগড়ির নিচ থেকে তার চুল খুলে দিল এবং এরপর আলখাল্লার বাঁধন খুলে তার বাকি অংশ উন্মুক্ত করলে দেখা গেল সে আসলে একজন নারী। এরপর আমি তাকে ডেকে আমার পাশে বসালাম এবং বললাম, ‘এর আগেও আমার মনে হয়েছে তুমি একজন নারী এবং এ কারণেই আমি কৌতুক করেছি। এখন দেখা যাচ্ছে আমার ধারণাই সত্য।’ এসব কথোপকথনের মধ্যেই সকাল হয়ে যায় এবং আমি জেগে যাই।”

‘পুরুষের পোশাকে নারী’ শিরোনামে সুলতানের এ স্বপ্নের সঙ্গে তার পূর্ববর্তী স্বপ্ন মিলিয়ে দেখলে কিছু বিষয় পরিষ্কার হবে। অবশ্য তার আগে এ সময়টা সম্পর্কে বলা প্রয়োজন। উপর্যুক্ত দ্বিতীয় স্বপ্নে শাহনূরে মারাঠাদের আক্রমণের কথা আছে। মূলত ১৭৮৫-৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মহীশুর সাম্রাজ্যের সঙ্গে মারাঠাদের যুদ্ধ চলছিল। মারাঠারা এ সময় নিজামের সঙ্গে চুক্তি করে তাদের রাজ্য প্রসারের চেষ্টা করছিল। সেই সময় টিপু সুলতান স্বপ্ন দুটি দেখেন। দ্বিতীয় স্বপ্ন সম্পর্কে তিনি নিজেই লিখেছেন যে পরবর্তী সময়ে স্বপ্নটির ‘তাবির’ করতে গিয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিরা এ মর্মে একমত হয়েছেন যে যুদ্ধ করতে একত্রিত হওয়া মারাঠাদের বহিরাবরণ পুরুষের হলেও প্রমাণিত হবে তারা আসলে নারী (এখানে পুরুষ বলতে পৌরুষ বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধ জয়ের মতো পৌরুষ তাদের নেই)। এ স্বপ্নের বর্ণনার সঙ্গেই টিপু যোগ করেছেন যে পরবর্তী ৮ তারিখ তিনি ৩০০ সৈন্য নিয়ে মারাঠাদের ওপর আক্রমণ করলে হরি পান্ত পারখিয়া এবং তার দল ‘নারীদের মতো’ পালিয়েছিল।

টিপু সুলতান তার এ বর্ণনায় মারাঠাদের ‘কাফের’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং পূর্ববর্তী স্বপ্নের সঙ্গে মিলিয়ে বলা যায় ওই স্বপ্নটিও আসলে তার বিজয়ের আভাস বহন করছিল। স্বপ্নে হজরত আলী (রা.)-এর দর্শন লাভ মূলত বিজয়ের বার্তা। পাশাপাশি এ বর্ণনার মধ্য দিয়ে ধর্মের প্রতি তার আগ্রহের কথা পাওয়া যায় (ব্যক্তিগতভাবে লক্ষ করেছি, ওই সময়ের বর্ণনার ভাষাই কিছুটা অমনই ছিল। মুসলিমদের লেখায় অন্যরা ‘কাফের’, হিন্দুদের লেখার তুর্কি, আরব, মোগলরা ‘বর্বর’)। পাশাপাশি স্বপ্নের বর্ণনার মধ্যেই তিনি ইতিহাসের ঘটনা রেখে দিয়েছেন।

ইতিহাসের আলোচনায় টিপু সুলতানের এ কড়চা আরো একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দেখতে পাই টিপু সুলতান এখানে ‘বুসদ বছর’, ‘হায়দারি মাস’ প্রভৃতি উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ তিনি হিজরি সন কিংবা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করেননি। এখান থেকে আমরা জানতে পারি টিপু সুলতান একটি নিজস্ব ‘ক্যালেন্ডার’ তৈরি করেছিলেন এবং মহীশুরে সেই ক্যালেন্ডারই অনুসরণ করা হতো। এ দিনপঞ্জি উদ্ভাবনের কারণ ছিল গ্রেগরিয়ান কিংবা হিজরি সন অনুসরণ করে প্রজাদের খাজনা দেয়ার অসুবিধা। সে কাজটা সহজ করার জন্য অনেকটা আকবরের ‘ইলাহী সন’-এর মতোই চান্দ্র এবং সৌর বছরের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে টিপু সুলতান এ বর্ষ গণনা শুরু করেন। উল্লেখ্য, প্রণয়নের দ্বিতীয় বছরই তিনি এ বর্ষপঞ্জি সংশোধন করেন। ইসলামিক ধারা অনুসারে প্রথমে ‘আবজাদ’ পদ্ধতি অনুসরণ করলেও পরে ‘আবতাত’ পদ্ধতি অনুসরণ করেন। এতে মাসের নামও পরিবর্তিত হয়। মাসের নামের ক্ষেত্রে তিনি ইসলাম এবং তার ওপর প্রভাব রাখে এমন কিছু বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি দিয়েছিলেন। যেমন ‘হায়দারি’ নামক মাস মূলত তার পিতা হায়দার আলীর নাম থেকে এসেছে।

মহীশুরে যখন টিপু সুলতান শাসন করছেন, তখন চারদিক থেকে শত্রুরা তাকে ঘিরে ফেলেছে। প্রথমে মারাঠাদের বড় শত্রু মনে হলেও পরে দেখা যায় এর চেয়েও ভয়ানক শত্রু ইংরেজ কোম্পানি। মোগলপরবর্তী খণ্ডিত ভারতের অনেক স্থানীয় শাসকই ইংরেজদের পক্ষ থেকে সৃষ্টি হওয়া হুমকি বুঝতে পারেনি। কিন্তু টিপু সুলতান বুঝেছিলেন এবং ইংরেজ বিতাড়নের ইচ্ছাও তার ছিল। ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরঙ্গপট্টমের চুক্তির মাধ্যমে অ্যাংলো-মহীশুর তৃতীয় যুদ্ধ সমাপ্ত হয়। কিন্তু টিপু নতুন করে তার রাজ্য সাজিয়ে গুছিয়ে তোলার সুযোগ পাননি। এ সময়েই তিনি একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার বর্ণনা অনুসারে,

“রাজী মাসের ৩ তারিখ অনুসারে (টিপুর ক্যালেন্ডারের ১১তম মাস) হিজরি শাবান মাসের ১ তারিখ (জানুয়ারি ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দ), আমি একটি স্বপ্ন দেখি: মারাঠা প্রতিনিধি রঘুনাথ রাও যিনি আগেও আমার কাছে এসেছিলেন, আবার এসে বললেন, ‘ইংরেজরা ইউরোপে ভয়াবহ পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে এবং অচিরেই তারা বাংলা ছেড়ে যেতে বাধ্য হবে।’ তার এ কথা শুনে আমি বললাম, ভালোই তো। আমি সৈন্য এবং অর্থ প্রদান করব; আল্লাহ চাইলে এ খ্রিস্টানরা ভারত থেকে বহিষ্কৃত হবে।”

আজ প্রায় ২২০ বছর পর টিপু সুলতানের এ কথা শুনে আমাদের কারো কষ্ট হতে পারে, আবার কেউ শ্লেষও ছুড়ে দিতে পারেন। কিন্তু সত্য হলো ইংরেজদের টিপু তাড়াতে পারেননি। বরং ইংরেজই তাকে পরাজিত করেছিল আর যে লেখায় তিনি ইংরেজকে ভারত থেকে খেদিয়েছেন তা ইংরেজই সংরক্ষণ করে রেখেছে। সুলতান যেভাবে লিখেছেন তা বিশ্লেষণ করলে এক পর্যায়ে গিয়ে এ লেখা ভাবতে বাধ্য করে যে বর্ণনাগুলো নিছক স্বপ্নের না। অন্তত তার সব স্বপ্ন, ‘ঘুমিয়ে দেখা স্বপ্ন’ না। এসবের মধ্যেই তিনি রেখে গিয়েছেন তার অনেক চিন্তা, পরিকল্পনা ও ঐতিহাসিক সত্য। নিজের বিশ্বাস, পছন্দও লিখেছেন। তাই তার এ কড়চায় এসেছে হজরত মুহাম্মদ (সা.), হজরত আলী (রা.) থেকে শুরু করে পারস্যের সা’দী, জামীর নাম। হয়তো এ লেখার মধ্যেই আছে মহীশুর কিংবা দাক্ষিণাত্যের ইতিহাসের কোনো অজানা তথ্য। হেঁয়ালির মধ্যে লুকিয়ে রেখে গেছেন কোনো গুপ্ত খবর।


মাহমুদুর রহমান: লেখক