বিগত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি মহীশুরের শাসক টিপু সুলতানের (১৭৮২-১৭৯৯) লাইব্রেরি নিয়ে কাজ করে চলেছি। ১৮০৬-০৮ সালের মধ্যে এবং পরে ১৮৩৭ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লাইব্রেরি ভেঙে ফেলার পর টিপুর লাইব্রেরি থেকে আনুমানিক ৬০০টি ভলিউম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লাইব্রেরিতে জমা করা হয়েছিল। এ পর্যন্ত আমি ব্রিটিশ লাইব্রেরির অর্ধেকেরও বেশি পাণ্ডুলিপি এবং অন্যান্য লাইব্রেরির আরো কিছু পাণ্ডুলিপি ভালো করে পরীক্ষা করে দেখেছি। এর মধ্যে কিছু পাণ্ডুলিপিতে টিপু সুলতানের সিল রয়েছে, যা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। এখন পর্যন্ত আমি ২৮টি পাণ্ডুলিপি পেয়েছি, যেগুলোর কিছুতে একাধিক সিলের ছাপ রয়েছে। একটি ছাড়া সেগুলো মূলত তিন ধরনের। একটি ব্যক্তিগত সিল, যার সময় ১১৮৬ হিজরি (১৭৭২-৭৩ খ্রিস্টাব্দ) এবং দুটি অফিসিয়াল সিল, যার একটির সময় ১২১৫ হিজরি (১৭৮৭-৮৮ খ্রিস্টাব্দ) এবং অন্যটির ১২২৩ হিজরি (১৭৯৫-৯৬ খ্রিস্টাব্দ)।
টিপুর ব্যক্তিগত সিল
টিপুর ব্যক্তিগত সিলটি সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় সম্ভবত এ কারণে যে এটি টিপুর ব্যক্তিগত আগ্রহকে প্রতিফলিত করে। আয়তাকার সিলটি ১৬ x ১১.৫ মিমি আকারের, যাতে ‘টিপু সুলতান ১১৮৬’ (১৭৭২-৭৩ খ্রিস্টাব্দ) লেখাটি খোদাই করা রয়েছে। সিলটি তার পিতা হায়দার আলির মৃত্যুর পর ১৭৮২ সালের শেষে টিপুর সিংহাসনে আরোহণের পূর্বাভাস দেয়।
এখানে বিশদভাবে বলতে গেলে লেখা অনেক বড় হয়ে যাবে। আমি পরে এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিতভাবে লিখব। তবে সংক্ষেপে যা বলা যায় তা হলো, এ পর্যন্ত পরীক্ষাকৃত ২১টি ভলিউমের মধ্যে ১৪টি কাব্যগ্রন্থ; যার মধ্যে রয়েছে আমির খুসরো, আত্তার, নাসাফি, আহমদ-ই-জাম, জুলালী, কামাল খুজান্দি, উরফি, আহসান উল্লাহ এবং অন্য আরো অনেকের কবিতা। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো এখানে ফেরদৌসি, হাফিজ বা নিজামীর কাব্যগ্রন্থ নেই। টিপুর সিলযুক্ত অন্যান্য কাজের মধ্যে রয়েছে চারটি ঐতিহাসিক রচনা, একটি অভিধান এবং চিঠি লেখাবিষয়ক দুটি রচনা। এর মধ্যে দুটি ভলিউম উচ্চ পর্যায়ের। বাকিগুলো সাধারণ মানের। যেহেতু তার সংগ্রহে আরো অনেক উচ্চ পর্যায়ের ভলিউম ছিল যেগুলোতে তার সিল ছিল না, তাই আমরা ধরে নিতে পারি যে এগুলোকে টিপু বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।
এ পাণ্ডুলিপিগুলো কবে সংগৃহীত হয়েছিল তা জানা যায় না। যদিও কমপক্ষে পাঁচটি পাণ্ডুলিপি ছিল কর্ণাটকের নবাব মোহাম্মদ আলীর ভাই চিতরের নবাব আবদুল ওয়াহাবের, যাকে ১৭৮০ সালে তার পরিবারের সঙ্গে বন্দি করে আনা হয়েছিল। আরেকটি পাণ্ডুলিপি ছিল গোলকুণ্ডার কুতুব শাহর এবং এতে মুহাম্মদ কুলী কুতুব শাহ (রাজত্বকাল ১৫৮০-১৬১২) এবং তার উত্তরসূরি মুহাম্মদ কুতুব শাহর (রাজত্বকাল ১৬১২-১৬২৬) সিলমোহর রয়েছে।
লাইব্রেরির পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে ব্যতিক্রমটি ছিল সেরিঙ্গাপটম থেকে প্রাপ্ত একত্রে বাঁধাই করা মূল পাণ্ডুলিপির একটি সংকলন; যাতে সিলমোহরের সময় ছিল ১৫ জা’ফারি, ১১৯৮ হিজরি (১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দ) এবং ১ আহমাদী, ১২০০ হিজরি (১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দ)। এর অর্থ এগুলো ছিল ১৭৮৭ সালের আগে ব্যবহূত সিল। নিচে টিপুর দুটি সরকারি সিলের সময় নিয়ে আলোচনা করা হল।
টিপুর সরকারি সিল
সিংহাসনে আরোহণের কয়েক মাসের মধ্যে টিপু ৬০ বছর চক্রের ১২ মাস এবং বছরের নাম পরিবর্তন করে ক্যালেন্ডারে পরিবর্তন আনেন। একই সঙ্গে আগে থেকে প্রচলিত হিজরি সালের ব্যবহারও জারি রাখেন। ওপরে উল্লিখিত নথিগুলোতে এর উদাহরণ দেখা যায়। তবে তার রাজত্বের পঞ্চম বর্ষে তিনি একটি নতুন চান্দ্র-সৌর বর্ষপঞ্জি প্রবর্তন করেন, যার নামকরণ করেছিলেন মুহাম্মদী বা মৌলুদি সাল। এটি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মের সাল থেকে হিসাব করা হয়েছিল, যেখানে নবীর জন্মসাল হিসেবে ধরা হয়েছিল ৫৭২ খ্রিস্টাব্দকে। এতে অরো একটি নতুনত্ব ছিল বাম থেকে ডানে সাধারণ নিয়মের পরিবর্তে ডান থেকে বামে সংখ্যা লেখা।
এ নতুন বর্ষ প্রণয়নের কারণ স্পষ্ট নয়। তবে কার্কপ্যাট্রিক ‘সিলেক্ট লেটারস’-এ ১৭৮৭ সালের শুরুতে ডালভ বছরের ২৯ ইজাদি তারিখের একটি চিঠি উল্লেখ করেছেন, যেখানে টিপু সুলতান নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম, তার জীবন ও হিজরতের বিষয়ে জ্ঞানীদের কাছে তথ্য চেয়েছিলেন।
নতুন পদ্ধতিটি গণনা করা হয়েছিল আহমাদী মাস ১২১৫ সাল, শা বছর—এভাবে। এটি ২০ মার্চ, ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়েছিল। নতুন সিলটি নিঃসন্দেহে নতুন বর্ষকে চিহ্নিত করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল এবং পরবর্তী বছরগুলোতে এর ব্যবহার অব্যাহত ছিল। এটি তার অনুরোধে লিখিত নথি এবং সরকারি প্রজ্ঞাপনগুলোর শীর্ষে বা ডান দিকে দেয়া হতো। এতে লেখা ছিল ‘টিপু সুলতান, ৫১২১, অর্থাৎ ১২১৫ মৌলুদী বর্ষ (১৭৮৭-৮৮ খ্রিস্টাব্দ)। এর আয়তন ছিল ১৯ x ১৫ মি.মি।
এ সিলটি এখন পর্যন্ত তিনটি ভলিউমে পাওয়া গেছে। সেগুলো হলো—
মুয়াইয়িদ আল মুজাহিদীন।
ফতোয়া-ই-মুহাম্মদী, টিপু সুলতানের অনুরোধে রচিত ৩১৩টি সংক্ষিপ্ত অধ্যায়সংবলিত আইনবিষয়ক গ্রন্থ।
রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞাপনগুলোর একটি সংকলন। এর ওপর যে সিলের ছাপ রয়েছে তার সময় ১২২১-২২ মৌলুদি (১৭৯৩-৯৫ খ্রিস্টাব্দ)।
আট বছর পর দ্বিতীয় সিলটি চালু হয়। এ সিলটির একটি বিবরণ জাভাবিত-ই-সুলতানিতে দেয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় ২১ হায়দারি, হিরাসাত ১২২৪ মৌলুদি মোতাবেক ২২ সেপ্টেম্বর ১৭৯৬ সালে। এর ওপর রাজকীয় প্রতীক ছিল এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে এটি ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। এ বিশেষ সিলটি এক আঙুল পরিমাণ দীর্ঘ করা এবং তার অর্ধাংশজুড়ে বাঘের মুখাকৃতির টিপু সুলতানের তুঘ্রা ও চার কোণে মৌলুদ-ই-মুহাম্মদ শব্দটি লেখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। তুঘ্রাটিতেও বাঘের ছয়টি ডোরা ছিল।
এ নতুন সিলের নকশাটি বাঘের প্রতি টিপুর অনুরাগের আরেকটি উদাহরণ। নির্দেশনা অনুসারে সম্ভবত ১৭৯৬ সালে এটি চালু হয়েছিল। এটিতে লেখা ছিল, ‘টিপু সুলতান ৩২২১ মৌলুদ-ই-মুহাম্মাদ’ (১৭৯৫-৯৬ খ্রিস্টাব্দ)। এর পরিমাপ ১৯ x ১৫ মিমি এবং এটি আগের সিলটির মতো নথি এবং সরকারি প্রজ্ঞাপনে পাওয়া যায়, যার কয়েকটি অনুলিপি এখনো টিকে আছে।
সিলটি এখন পর্যন্ত পাঁচটি ভলিউমে পাওয়া গেছে। সেগুলো হলো—
মুফাররিহ আল-কুলুব, হাসান আলি-ইজ্জত কর্তৃক টিপু সুলতানের জন্য সংকলিত মিশ্র ফারসি ও দক্ষিণি গানের সংকলন। এটি ১১৯৯ হিজরিতে (১৭৮৪-৮৫ খ্রিস্টাব্দ) সংকলিত হয়েছিল।
জাভাবিত-ই-সুলতানী বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ব্যবহূত সিলের জন্য সঠিক রাজকীয় প্রতীক ব্যবহারের নিয়মসংবলিত গ্রন্থ। সিলের তারিখ ২১ হায়দারি, হিরাসাত, ১২২৪ মোতাবেক ২২ সেপ্টেম্বর ১৭৯৬।
জাভাবিত-ই-সুলতানীর আরেকটি অনুলিপি।
ছয়টি সরকারি বিভাগের জন্য নির্দেশনাসংবলিত প্রজ্ঞাপন। যার তারিখ ১৫ আহমাদি, শাদাব, (এপ্রিল ১৭৯৮)।
বিভিন্ন ধরনের ঘোড়া ও ষাঁড়ের নামের একটি সরকারি নিবন্ধন খাতা। যার তারিখ ১ আহমাদি, শাদাব, ১২২৬ (মার্চ ১৭৯৮)।
মোমের ছাপ
ছয়টি সরকারি বিভাগের প্রতি নির্দেশনাসংবলিত একটি নথিতে শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় স্টাইলের মোম সিলের একটি অনন্য উদাহরণ পাওয়া গেছে, যার তারিখ ১৫ আহমাদী, শাদাব (এপ্রিল ১৭৯৮)। বাম হাতের সিলটিতে ‘ইয়া হাফিজ’ শব্দটি খোদাই করা আছে, যার সম্ভাব্য সময় ১২১৯ হিজরি (১৭৯১-৯২ খ্রিস্টাব্দ)। যদি তাই হয় তাহলে এটি নথির সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার বেশ কয়েক বছর আগে তৈরি করা। দুর্ভাগ্যক্রমে আমি ডান হাতের সিলটির মর্ম উদ্ঘাটনে সক্ষম হইনি। এ ধরনের আরো সিল ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে তাদের ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতির কারণে সেগুলো টিকে থাকতে পারেনি।





