সম্প্রতি ম্যাকাও ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক Joshua Ehrlich এক প্রবন্ধে ভারতের অন্যতম সেরা লাইব্রেরির মধ্যে একটি লাইব্রেরির—যা একসময় ‘টিপু সুলতানের লাইব্রেরি’ নামে পরিচিত ছিল—শেষ পরিণতি নিয়ে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেছেন (Joshua Ehrlich ২০২০)। কথিত আছে, সেই লাইব্রেরির বইপুস্তক, জার্নাল, ক্রনিকল, মানচিত্র, অঙ্কন এবং অন্যান্য আইটেম মহীশুরের শাসক টিপু সুলতান লুণ্ঠনের মাধ্যমে সংগ্রহ করেছিলেন। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে চতুর্থ অ্যাংলো-মহীশুর যুদ্ধে তিনি নিহত হন। তার মৃত্যুর পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি টিপু সুলতানের সেই লাইব্রেরি লুণ্ঠন করে। লেখক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে টিপু সুলতান তার কর্তৃত্ব বৈধ করার জন্য লাইব্রেরিটি ব্যবহার করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে টিপু সুলতানের মতো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিদ্বন্দ্বী দল একই কাজ করেছে। এছাড়া সেই প্রবন্ধে ভারত উপমহাদেশে কীভাবে লুটপাটের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্ষমতা দখল করেছে, তার আলোচনা আছে; ভারতে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করার বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বর্তমান লেখাটি Joshua Ehrlich-এর প্রবন্ধটিকে আবর্তিত করে রচিত হয়েছে। তাই টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর ব্রিটিশ সৈন্য ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বণিক মুখোশধারী কর্মকর্তাদের হাতে টিপু সুলতানের গড়া লাইব্রেরি লুণ্ঠন করার প্রাসঙ্গিক বিষয়ের ওপর আলোকপাত করাই এ লেখার মূল উদ্দেশ্য। 

এ কথা খুবই সত্যি যে সেই আদিকাল থেকে আধুনিক যুগেও শত্রুপক্ষ কিংবা বিজয়ী শাসক হয় ইচ্ছাকৃতভাবে অগ্নিসংযোগ করে লাইব্রেরি পুড়িয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছে অথবা লুটপাট করে দুর্লভ জিনিসপত্র সরিয়ে নিয়েছে। মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে প্রাসঙ্গিক কারণে বিশ্বের কয়েকটি লাইব্রেরি পোড়ানো বা লুটপাটের ঘটনার উল্লেখ করা হলো।

ইতিহাসে লাইব্রেরি পোড়ানো বা লুটপাটের ঘটনা

ইতিহাসে দেখা যায়, শত্রুপক্ষ যখন কোনো দেশ দখলের নেশায় মত্ত হয়, তখন তাদের অন্যতম কাজ হলো অগ্নিসংযোগ বা লুণ্ঠনের মাধ্যমে লাইব্রেরি ধ্বংস করা। তবে কোনো এক পণ্ডিত বলেছেন, ‘কখনো সাংস্কৃতিক শুদ্ধি প্রক্রিয়ার অন্যতম পন্থা হিসেবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে লাইব্রেরি ধ্বংস করা হয়।’ তবে এ কথাও সত্যি যে অতীতে অনেক লাইব্রেরি প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যেমন ভূমিকম্প, বন্যা বা আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের কারণে ধ্বংস হয়েছে, যা মানুষের ক্ষমতার জন্য বা ইচ্ছায় হয়নি। যা হোক, অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে সেসব অমূল্য সম্পদের ক্ষতি কখনই পূরণ করা সম্ভব হয়নি এবং হওয়ারও নয়, এমনকি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও পুনরুদ্ধার করা রীতিমতো অসম্ভব। 

লাইব্রেরি লুণ্ঠন এবং জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়ার জঘন্যতম প্রক্রিয়া শুধু আধুনিক যুগেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং সেই আদিকালেও, অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্বাব্দেও এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ২০৬ অব্দে তত্কালীন চীনা সম্রাটের আদেশে শিয়ানইয়াং প্রাসাদ এবং স্টেট আর্কাইভ অগ্নি সংযোগ করে ধ্বংস করা হয়। উল্লেখ্য, সেই স্টেট আর্কাইভে দুষ্প্রাপ্য বইয়ের সংগহ ছিল। এছাড়া ৩৯২ খ্রিস্টাব্দে শত্রুরা মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া শহরের মধ্যে অবস্থিত ‘সেরাপিয়াম লাইব্রেরি’ লুণ্ঠন করে এবং পুড়িয়ে দেয়। লাইব্রেরি পোড়ানো এবং লুটপাটের আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে, যেমন আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি (যদিও মতানৈক্য রয়েছে), ভারতের নালন্দা লাইব্রেরি (১১৯৩), ইরাকের বাগদাদ লাইব্রেরি (১২৫৮) এবং শ্রীলংকার জাফনা পাবলিক লাইব্রেরি (১৯৮১)।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে (১৯৩৩ সালের ১০ মে) জার্মান শাসকগোষ্ঠী দেশজুড়ে বই পোড়ানোর আয়োজন করে। কাকতালীয়ভাবে হোক বা অন্য কোনো কারণে হোক, শেলডন (২০২০) উল্লেখ করেছেন, তার অনেক আগেই (১৮৮২ সালে) জার্মান ইহুদি কবি হাইনরিশ হাইন লিখেছেন, ‘যেখানে মানুষ বই পোড়াবে, সেখানে তারা শেষ পর্যন্ত মানুষকেও পুড়িয়ে মারবে।’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও এ ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত ছিল। মার্ক গ্লিকম্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে শেলডন (২০২০) আরো লিখেছেন, ‘এডলফ হিটলারের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে নািস চোরেরা জার্মানি এবং ইউরোপজুড়ে লক্ষ লক্ষ বই লুট করেছে এবং সেসব লুটপাট ছিল ইতিহাসের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে ব্যাপক বই লুটের কর্মকাণ্ড।’ শুধু তা-ই নয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একদিকে জার্মান এবং অন্যদিকে জাপানি সৈন্যরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এবং চীনের অসংখ্য লাইব্রেরি ধ্বংস করেছে। 

টিপু সুলতান সম্পর্কে

দক্ষিণ ভারতের মহীশুর রাজ্যের শাসক ছিলেন টিপু সুলতান। তার আসল নাম ছিল ফতেহ আলী সাহাব টিপু। তিনি ১৭৫০ সালের ২০ নভেম্বর মহীশুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা (হায়দার আলী) ছিলেন মহীশুর রাজ্যের সেনাপতি। টিপু সুলতান ছিলেন একজন বীর যোদ্ধা, যিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে বীরত্বসহকারে যুদ্ধ করেন। যদিও ব্রিটিশদের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন তাদের ভারত বিস্তারের প্রধান শত্রু, তবুও তারা—বিশেষ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি—টিপু সুলতানের শৌর্য-বীর্য এবং সামরিক কৌশলে মোহিত হয়ে ‘শের-ই-মহীশুর’ (অর্থাৎ ‘মহীশুরের বাঘ’) খেতাবে ভূষিত করেছিল। বলা হয়, টিপু সুলতান দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বর্ণিল চরিত্রগুলোর মধ্যে একটি। একদিকে একজন গোঁড়া মুসলমান এবং নৃশংস শাসক হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়, অন্যদিকে অনেকে তাকে একজন দেশপ্রমিক এবং শহীদ হিসেবে বিবেচনা করে। অনেকে মনে করেন যে তার আত্মত্যাগ ১৮৫৭ সালের ঐতিহাসিক ব্রিটিশবিরোধী গণজাগরণের অন্যতম উৎস।

বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে Narasingha Sil (২০১৩) তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গুণীজন এবং সমালোচক টিপু সুলতানকে আলাদাভাবে তার গুণাগুণ বর্ণনা করেছেন অথবা তাকে একাধিক বিশেষণে আখ্যায়িত করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, টিপু সুলতান ছিলেন দেশপ্রমিক, অর্থাৎ তার ছিল ‘দেশ এবং স্বাধীনতার প্রতি অগাধ ভালোবাসা’ (যদিও এ বিষয়ে অনেকের মনে সন্দেহের ভারী পাথর জমে আছে), ‘ভারতের ইতিহাস লেখার জন্য তিনি তার রক্ত উৎসর্গ করার প্রস্তাব দিয়েছেন’, অথবা তিনি ছিলেন একজন ‘আধুনিক প্রযুক্তিবিদ’, যার জন্য তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতে পেরেছিলেন এবং তিনি ছিলেন ‘প্রচণ্ড জ্ঞানপিপাসু’ এবং জ্ঞানার্জনের জন্য তার ছিল নিজস্ব লাইব্রেরি।

এ কথা সত্যি যে টিপু সুলতান সম্পর্কে ‘নানা মুনির নানা মত’ রয়েছে। কারো কাছে তিনি হিরো বা মহানায়ক, অন্যদের কাছে তিনি হলেন জিরো বা খলনায়ক। ভারতীয় রাজনীতিবিদ, জাতিসংঘের প্রাক্তন আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল, বিশিষ্ট কলাম লেখক ও কথাসাহিত্যিক শশী থারুর আরো এক ধাপ ওপরে উঠে টিপু সুলতান সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের (এবিসি) খবরে প্রকাশ, শশী থারুরের মতে, ‘টিপু সুলতান ছিলেন খলনায়কের চেয়েও জটিল।’ এছাড়া অনেকের মন্তব্য টিপু সুলতান ছিলেন উদার বা উচ্চমনা, আবার অনেকে তাকে নিষ্ঠুর বা পাষাণ হূদয়ের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে তিনি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে অব্যাহত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের অন্যতম বাধা এবং সবচেয়ে ভয়ংকর প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন, যা আজও টিপু সুলতানকে এ বিশেষণে চিহ্নিত করা হয়। টিপু সুলতান সম্পর্কে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক Alice Procter মন্তব্য করেছেন, ‘তিনি একজন বিতর্কিত এবং এই মুহূর্তে গভীরভাবে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব’ (এবিসি খবর)। উল্লেখ্য, টিপু সুলতান সম্পর্কে ইতিবাচক বা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা বা নির্ধারণ করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। প্রসঙ্গক্রমে কিছু আলোচনার সূত্র এখানে উল্লেখ করা হলো।

টিপু সুলতানের লাইব্রেরি

তত্কালীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার সময় ব্রিটিশ সৈন্যরা ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তারা ভারতের বিভিন্ন লাইব্রেরি লুটপাট করে দুর্লভ বইপুস্তক, পাণ্ডুলিপি ও অন্যান্য অমূল্য সম্পদ সরিয়ে নেয়। টিপু সুলতানের লাইব্রেরিও ব্রিটিশদের কুনজর থেকে রক্ষা পায়নি। শুধু তা-ই নয়, টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর এবং মহীশুর দখল করে ব্রিটিশ সৈন্যরা ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকজন সম্রাটের প্রাসাদও লুণ্ঠন করে। তারা টিপু সুলতানের শয়নকক্ষে প্রবেশ করে তার ব্যবহূত জুতাসহ অন্যান্য জিনিসপত্র, এমনকি আন্ডারওয়্যারও নিয়ে যায় এবং পরে সেগুলো লন্ডনে পাচার করে। একজন ব্রিটিশ অফিসারের ভাষ্যমতে, ‘এমন একটি ঘরও অবশিষ্ট ছিল না, যা লুটপাটের কবল থেকে রক্ষা পেয়েছে।’

পিতার মৃত্যুর পর অর্থাৎ ১৭৮২ সালে উত্তরাধিকার সূত্রে টিপু সুলতান মহীশুরের শাসক হিসেবে নিযুক্ত হন। সে সময় তিনি প্রচুরসংখ্যক বইয়ের মালিকানা লাভ করেন। তবে সেসব বইয়ের অধিকাংশই ছিল লুটপাটের মাধ্যমে সংগৃহীত। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কৌশল হিসেবে তিনি লাইব্রেরিটিকে তার শাসনের একটা বড় অংশ হিসেবে গড়ে তোলেন। তবে তার মৃত্যুর পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তারা এ লাইব্রেরির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তত্কালীন ভারতে নিযুক্ত গভর্নর জেনারেল রিচার্ড ওয়েলেসলি (১৭৯৮-১৮০৫) আঞ্চলিক সম্প্রসারণ ও একত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় লাইব্রেরিকে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কেননা ব্রিটিশদের মধ্যে একদল, যারা মহীশুরে স্থায়ী আধিপত্য বিস্তার করতে আগ্রহী ছিল, তারা টিপু সুলতানের লাইব্রেরিটি মূল্যবান সম্পত্তি হিসেবে গণনা করেছিল।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে টিপু সুলতান তার কর্তৃত্ব বৈধ করার জন্য লাইব্রেরিটি ব্যবহার করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সেই একই কাজ করেছে। টিপু সুলতানের পতনের পর ব্রিটিশরা তার লাইব্রেরিতে অভিযান চালাতে সক্ষম হয়। ‘চতুর্থ অ্যাংলো-মহিশুর যুদ্ধ’-এ টিপু সুলতানের নিহত হওয়ার পর সৌভাগ্যক্রমে যদিও লাইব্রেরিটি পোড়ানোর হাত থেকে বেঁচে যায়, কিন্তু সমস্ত দুর্লভ বইপুস্তক, জার্নাল, ক্রনিকল, মানচিত্র, অঙ্কন ও সংগৃহীত অন্যান্য জিনিসপত্র লুট হয়ে যায়। বলা হয়, সেগুলোর সংখ্যা আনুমানিক দুই হাজার। লুট করা বেশির ভাগ জিনিস ইংল্যান্ড, মাদ্রাজ বা কলকাতা, এমনকি বোম্বেতে তাদের বিভিন্ন লাইব্রেরি ও বাড়িতে স্থানান্তর করা হয়। টিপু সুলতানের কয়েকটি বই এখনো কলকাতায় ভারতের গভর্নর জেনারেলের সংগ্রহশালার সংগ্রহে আছে। তবে লুণ্ঠিত মালপত্রের গন্তব্য নিয়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। একজন ঐতিহাসিকের মতে, লাইব্রেরি লুণ্ঠনের পর সমস্ত মালপত্র কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি আত্মসাৎ করেছিল। অন্যদিকে আরেকজনের মতে লাইব্রেরির প্রায় ৯০ শতাংশ লুট করা জিনিস ধ্বংস করা হয়েছে এবং বাকি অংশ ইংল্যান্ডে পাচার হয়েছে। অনেকের ধারণা যে লুণ্ঠিত বইপত্র, পাণ্ডুলিপি এবং অন্যান্য দুর্লভ জিনিস বিভিন্ন স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং রীতিমতো সবকিছুতেই ভজকট লাগিয়ে রাখা হয়েছে, যেন প্রকৃত তথ্য গোপন থাকে। তাই বর্তমানে ইংল্যান্ড ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা টিপু সুলতানের লাইব্রেরির লুট করা জিনিসের সঠিক ও নিঁখুত তালিকা প্রস্তুত করা সম্ভব নয়। যা হোক, Joshua Ehrlich (২০২০) তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে প্রাচ্যবিদ চার্লস স্টুয়ার্টের ১৮০৯ সালের তৈরি বিষয়সূচি (ক্যাটালগ) অনুযায়ী টিপু সুলতানের লাইব্রেরিতে আনুমানিক দুই হাজারের মতো বিভিন্ন ধরনের বইপুস্তক, পাণ্ডুলিপি, মূল্যবান দলিল এবং বিভিন্ন ধরনের দুষ্প্রাপ্য জিনিস ছিল (বিস্তারিত তালিকার জন্য Stewart (১৮০৯) ও Joshua Ehrlich-এর প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য)। উল্লেখ্য, এসব জিনিসের অনেকগুলোই ব্যবহারিক এবং প্রতীকী উভয় উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতো। জানা যায়, লুণ্ঠনের আগে টিপু সুলতানের লাইব্রেরিতে পবিত্র কোরআন শরিফ ছাড়াও কোরআনের ওপর আলোচনামূলক বিভিন্ন গ্রন্থ, সুফিবাদের ওপর শতাধিক বই ছাড়াও ছিল বিভিন্ন বিষয়ের, যেমন নৈতিকতা, আইন ও বিচার, ইতিহাস ও দর্শন, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর গ্রন্থ এবং অভিধান, এমনকি অনেকগুলো রূপকথা ও গল্পের বইও ছিল।

কথিত আছে, টিপু সুলতানের একাধিক ভাষায় বুত্পত্তি ছিল। তিনি কন্নড়, হিন্দি, ফার্সি, আরবি, ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন। তাই তার লাইব্রেরিতে এসব ভাষায় রচিত প্রচুর বই ছিল। তিনি প্রায়ই সেসব পড়তেন এবং কিছু বই ছিল যা তিনি বারবার পড়তেন। তিনি তার পড়া প্রতিটি বইয়ের ওপর তার স্বাক্ষর ও সিলমোহর (স্ট্যাম্প) লাগাতেন। যখন ব্রিটিশরা তার লাইব্রেরি লুণ্ঠন করে, তখন তারা দেখতে পায় যে লাইব্রেরির অধিকাংশ বইয়ে টিপু সুলতানের স্বাক্ষর ও সিলমোহর রয়েছে।

ব্রিটিশ লাইব্রেরির সংগ্রহের অর্ধেকের বেশি এবং অন্যান্য লাইব্রেরিতে সংগৃহীত টিপু সুলতানের লাইব্রেরি থেকে লুট করা গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপি পরীক্ষা করে Sims-Williams (২০১৮) টিপু সুলতানের মাত্র ২৮টি সিলমোহরের হদিস পেয়েছেন। একটি সিলমোহর ছাড়া বাকিগুলোতে তিন ধরনের সিলমোহর রয়েছে, যেমন টিপু সুলতানের ব্যক্তিগত সিলমোহর এবং আলাদা সময়ে নির্মিত দুই ধরনের সরকারি (অফিসিয়াল) সিলমোহর। তিনি সাহিত্যনির্ভর, বিশেষ করে কবিতার বই, ও ইতিহাস গ্রন্থে ব্যক্তিগত সিলমোহর এবং রাজ্য পরিচালনা ও অন্যান্য রাজকীয় বিষয়ে সরকারি সিলমোহর ব্যবহার করেতেন।

পরিশেষে, টিপু সুলতান ও তার লাইব্রেরির পরিণতি, তত্কালীন গভর্নর জেনারেল রিচার্ড ওয়েলেসলি ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিশদ জানার জন্য Joshua Ehrlich প্রবন্ধের উপসংহার থেকে খানিকটা তুলে দিলাম। তিনি লিখেছেন,‘The library’s value for Tipu, Wellesley, and the directors sprang from its various meanings as a royal emblem, a vault of knowledge as well as art and a trophy of war. The last meaning, bestowed by the act of plunder, heightened and inflected the others, and made them available to such different parties in turn. The annals of Tipu’s library thus reveal a link between the figuration of loot in the subcontinent and the conceptualisation of British India. Furthermore, they demonstrate a continuity in the symbolic power of plunder, which modern forces the rise of the nation-state, the redefinition of art, even the regulation of war have not suspended. Ironically, it may be that the proscription of plunder, by turning plundered objects into irreplaceable relics, has only rendered them more valuable’ (Joshua Ehrlich 2020, p. 492) ।

শেষ কথা

‘মহীশুরের বাঘ’ খ্যাত টিপু সুলতান মাত্র ৪৯ বছর বয়সে (১৭৯৯ সালের ৪ মে) মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ব্রিটিশদের হাতে নিহত হন। তিনি ছিলেন নির্ভীক এবং একজন সাহসী সৈনিক। তবে ইতিহাসবিদ ও সমালোচকেরা যে যেভাবেই তাকে মূল্যায়ন করুন না কেন, একজন বীর যোদ্ধা ও শাসক হিসেবে টিপু সুলতান ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি ব্রিটিশদের কবল থেকে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য আমরণ লড়াই করেছেন। যা হোক, তার একটা উল্লেখযোগ্য উদ্ধৃতি দিয়ে আলোচ্য লেখাটি শেষ করছি। তিনি বলেছেন, ‘একশ বছর শেয়ালের মতো বেঁচে থাকার চেয়ে সিংহের মতো একদিন জীবন কাটানো অনেক ভালো।’


তথ্যসূত্র:

১. Australian Broadcasting Corporation 2020, The tiger king and the stuff the British stole, ABC News, 23 November 2020.

২. Ehrlich J 2020, Plunder and Prestige: Tipu Sultan’s Library and the Making of British India, South Asia:Journal of South Asian Studies, 43:3, pp. 478-492, Online published: 12 May 2020.

৩. Narasingha Sil 2013, Tipu Sultan in History: Revisionism Revised, SAE Open, April-June 2013, pp. 1-11.

৪. Sheldon K 2020, Stolen Words: The Nazi Plunder of Books, Eldon Kirshner Journal, 17 August 2020.

৫. Sims-Williams U 2018, Royal seals on old books tell a fascinating story of Tipu Sultan’s penchant for calendar systems, Scroll Magazine (Scroll.in), 8 April 2018.

৬. Stewart C 1809, A Descriptive Catalogue of the Oriental Library of the Late Tippoo Sultan of Mysore, Cambridge: The University Press, London.


ফজল হাসান: লেখক ও অনুবাদক