কোনো খাবারের সঙ্গে একটি বিশেষ ধরনের ভবনের নাম জড়িয়ে যাওয়াটা সম্ভবত খুব একটা সুলভ কাণ্ড নয়। ঠিক এমনটাই ঘটেছে চিকেন ডাকবাংলোর ক্ষেত্রে। ১৮৫৬ সালে চার্লস ডিকেন্সের পুত্র ওয়াল্টার ডিকেন্স কলকাতায় এসেছিলেন সৈনিক হিসেবে। তিনি লিখেছেন, ভারতে আসার আগে এখানকার ডাকবাংলোর মুরগি রান্নার একঘেয়েমি বিষয়ে প্রচুর রসিকতা শুনে এসেছিলেন। যথারীতি যেসব ডাকবাংলোয় তিনি থেকেছেন, সবখানেই খানসামারা তাকে মুরগি রান্না করে খাইয়েছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, যতটা একঘেয়েমির কথা শুনেছিলেন তেমন কিন্তু লাগেনি। বরং মুরগির মজাদার স্বাদই তাকে মুগ্ধ করেছে।
মজার ব্যাপার এই, চিকেন ডাকবাংলো বলতে যা বোঝায়, তার কোনো অভিন্ন রেসিপি আদৌ ইংরেজ আমলের প্রথম দিকে ছিল না। প্রচুর মসলাসহযোগে কারি, সেদ্ধ, ভাজা কি ধীরলয়ে রান্না করা মুরগির স্টু—এর সবকিছুতেই চিকেন ডাকবাংলো বলে ডাকা হতো। উপমহাদেশের প্রায় প্রত্যেক ডাকবাংলোর ‘কমন’ খাবার হিসেবে মুরগির যেকোনো পদ মিলত দেখে উনিশ শতকের শেষার্ধে এসে চিকেন ডাকবাংলো নামটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। কিন্তু এর নির্দিষ্ট কোনো রন্ধনপ্রক্রিয়ার ব্যাপারে তখনো কিছু শোনা যেত না। পরে বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে মসলাদার চিকেন কারি ও তার মধ্যে মাখো মাখো করা রান্না হওয়া আস্ত সেদ্ধ ডিমের যুগলবন্দিকেই নির্দিষ্ট করে ডাকবাংলো চিকেন বলা শুরু হয়।
ভারতের বাজারে মুরগি ছিল তখন তুলনামূলকভাবে অধিক সহজলভ্য— ১৮৭০ সালে আস্ত একটি মুরগি পাওয়া যেত এক আনায়, আর যাকে বলে বিরাট আকারের ‘জাঙ্গল ফাউল’ তা মিলত দুই আনায়। প্রচলিত এবং স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত মসলাপাতি দিয়েই রান্না করা সম্ভব বলে তা যেকোনো সময় পাতে বেড়ে দেয়া যায়—এসব কারণে খানসামারা ইংরেজ সাহেবদের রান্নার ক্ষেত্রে চিকেন ডাকবাংলোকেই প্রাধান্য দিতেন সম্ভবত। আরেকটি ব্যাপারও হয়তো ছিল, চিকেন ডাকবাংলো এমন এক পদ যে শুধু হাতে তৈরি রুটি আর ভাত ছাড়া তার সঙ্গে খাবার টেবিলে আর কোনো জিনিসের সঙ্গত করার দরকার পড়ে না। ক্ষুধার্ত পর্যটকের পেটের আগুন তা একাই মিটিয়ে পরিতৃপ্তি দিতে পারে।
এখন যদি আপনি চিকেন ডাকবাংলো রান্না করতে চান, তাহলে কী উপায়? কথা হলো চিকেন ডাকবাংলো বলতে যা বোঝায় এখন তা তৈরি করা খুব একটা কঠিন নয়। চারজনের জন্য মোটামুটি এক কেজি ওজনের একটি মুরগি নিন। নুন ও লেবুর রস দিয়ে মেরিনেট করে রাখুন ১ ঘণ্টার মতো। দুটি রসুনের কোয়া, দুটি কাঁচামরিচ, ইঞ্চিখানেক আকৃতির কয়েক টুকরো আদা, দুই চামচ দই, আধা চামচ হলুদ গরম মসলা মিশিয়ে একটি কারিপেস্ট তৈরি করুন। মুরগির গায়ে তা মাখিয়ে ঢেকে রাখুন ৪-৫ ঘণ্টা। রান্নার পাত্রে তিন চামচ ঘি গলিয়ে নিন। মসলামাখা মুরগি পাত্রে বসিয়ে ভালোমতো চারপাশে ভেজে নিন, যাতে বাদামি আভা আসে। ভাজা শেষ হলে ঘিতে প্রয়োজনমতো পেঁয়াজ ভেজে তাতে মুরগি ফের বসিয়ে গরম পানি দিন ঝোলের জন্য। আগে থেকে সেদ্ধ করে রাখা চারটি ডিম অল্প আঁচে কড়াইতে হালকা ভেজে নিন। ভাজা হলে সেগুলো মুরগির পাত্রে দিয়ে দিন। ১ ঘণ্টা ঢিমে আঁচে রান্না করলেই তৈরি চিকেন ডাকবাংলো।
মাসুদ রহমান





