দখলীকৃত বাংলা মুলুকে ঔপনিবেশিক ইংরেজ আমলে যেসব ‘প্রভু’ সাহেবসুবোরা এসেছিলেন, তাদের অনেকেই ছিলেন এ অঞ্চলের একঘেয়ে পরিবেশে রীতিমতো ত্যক্ত-বিরক্ত। অতএব দরকার পড়ত ভ্রমণের। হোক না যতই একঘেয়ে এলাকা, বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য নিজেদের বাধা কর্মস্থল ছেড়ে সরকারি দায়িত্ব পালন করতে আসা সিভিলিয়ান বা পুলিশ-সেনাবাহিনীর কর্তারা প্রায়ই চলে যেতেন বাংলার নানা দুর্গম এলাকায়। অনাস্বাদিত অভিজ্ঞতার আনন্দ কি রোমাঞ্চ ও কখনো-কখনো অন্যরকম রসনাবিলাসের দেখা পেতে তারা ঠাঁই গাড়তেন সেসব এলাকার ডাকবাংলোয়। এছাড়া কোনো জায়গায় যাওয়ার সময় রাত নেমে এলে সাময়িক আশ্রয়ের জন্য তো ডাকবাংলোর খোঁজ পড়তই।

কিন্তু আদতে কী জিনিস এ ডাকবাংলো? গোরা সাহেবদের কাছে ‘দেশী’ শব্দ বোঝানোর জন্য রচিত ‘হবসন-জবসন’ শব্দকোষে ‘ডাকবাংলো’ শব্দের ভুক্তিতে নজর দিলে জানা যায়, ডাকবাংলো আদতে ভ্রমণকারীদের জন্য সরকারি উদ্যোগে তৈরি হওয়া রেস্টহাউজ মাত্র। এর একটি ঘরে ছাদের তলায় শুধু থাকবে একখানা করে টেবিল ও খাট, সংযুক্ত রইবে একটি স্নানঘর আর অবশ্যই সেখানে এক ডাকে হাজির হবে একজন রন্ধনদক্ষ খানসামা কাম কেয়ারটেকার, যে কিনা সস্তায় দরকারি বাজার সেরে দ্রুত খানা পাকাতে ওস্তাদ। আর সাধারণত এ ডাকবাংলোগুলো একটি থেকে আরেকটি তৈরি করা হয় ১০ কি ১৫ মাইল দূরত্ব তফাত রেখে, যাতে কিনা সাহেবসুবোদের ভ্রমণের সময় সঙ্গে করে তাঁবু না বইতে হয়। তবে পাকা রাস্তা যেখানে আছে, সেখানে একটি ডাকবাংলো থেকে পরেরটির দূরত্ব কখনো কখনো ৪০-৫০ মাইলও হয়ে থাকে।

সেকালের বাংলার ডাকবাংলোয় বেশির ভাগ সময় যে কারণে সাহেবদের পা পড়ত, তা হলো শিকার। উনিশ শতকের শেষার্ধে মুর্শিদাবাদে কর্মরত সিভিলিয়ান ডব্লিউ এইচ ফ্লরিও হুইস্টনের কথাই ধরা যাক। শিকারের নেশায় মত্ত হুইস্টন বাংলায় মুখ্যত নিজের শিকার-অভিজ্ঞতা নিয়ে আস্ত একটি বইই লিখেছিলেন ‘পেন অ্যান্ড পেন্সিল স্কেচেস’ (১৮৮৩) শিরোনামে। তো তিনি গিয়েছিলেন ভাগলপুরে, বন্ধুদের সঙ্গে শিকার করতে। যথারীতি উঠলেন গিয়ে সেখানকার ডাকবাংলোয়। নদীর ধারের সেই বাংলো থেকে বেরিয়ে আশপাশের জঙ্গলে সাত সকালে শিকার শুরু করে পরে বাংলোয় ফিরে চলে শিকার করা প্রাণী ঝলসে খাওয়া। বিশেষ করে তেল-চর্বি-স্বাদে ভরপুর ১৬-১৭ আউন্সের মোরগ আর ১৩-১৪ আউন্সের মুরগি শিকার করতে পেরে হুইস্টন বেশ খুশি ছিলেন, উপরন্তু বাংলোর খানসামারও রান্নার হাত দারুণ পাকা। কিন্তু একদিন বাঁধল বিপত্তি, জঙ্গল থেকে কয়েকটি হায়েনা এসে সোজা হানা দিল বাংলোর মধ্যে। হুইস্টন সাহেবের ক্ষতি হয়নি ঠিকই—কিন্তু বাংলোর পাহারার দায়িত্বে থাকা একাধিক পোষা কুকুর তাদের আঁচড়ে আহত হয়, আঘাতে একটির বুকের পাঁজরাও ভেঙে যায়। সেকালের বাংলার (ভাগলপুর তখন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত) ডাকবাংলোয় বেশির ভাগ সময় সাহেবদের খানাপিনা আর মৌজমস্তি করে কাটলেও কখনো-কখনো এমন বিরূপ অভিজ্ঞতাও হতো বৈকি। তবে শিকারের নেশায় সবকিছু উপেক্ষা করে নিতান্ত গরিবি দশার কাঁচা কাঠামোর ডাকবাংলোয় থাকার ঘটনাও আছে। বাংলায় প্রায় ৪০ বছর ধরে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা সিএ গোল্ডসবুরি তার শিকারস্মৃতি ‘টাইগারল্যান্ড’-এ (১৯১২) লিখেছেন, বন্ধুর আমন্ত্রণে শিকারের জন্য বাংলার এক জেলায় গিয়ে কেবল বাঁশের তৈরি ডাকবাংলোয় থাকার কথা। সাহেবের বিবরণটি নিম্নরূপ: ‘এ হলো গিয়ে এক অদ্ভুত-দর্শন কাঠামো, সম্ভবত (কাঠের খুঁটিগুলো বাদ দিলে) পুরোটাই বাঁশ দিয়ে তৈরি বলে মনে হয়। দেয়াল ও এমনকি সিলিংও তৈরি হয়েছে এ গুণধর বস্তুটির দ্বারা, আর এর কঞ্চি দিয়ে ঢাকা হয়েছে মেঝে।’ অনেক সময় তাই ডাকবাংলোটি থাকার উপযুক্ত কিনা, তা দেখার সময় ছিল না সাহেবদের। বরং দেখা চাই, আশপাশে ভালো শিকার মেলে কিনা। শিকার মিললে ভাঙাচোরা ডাকবাংলোও সই!

১৮৫০-এর দশকে পূর্ব বাংলার নোয়াখালী অঞ্চলে কালেক্টর পদে কর্মরত ফ্রাঙ্ক বি সিমসন তার স্মৃতিকথা ‘লেটারস অন স্পোর্টস ইন ইস্টার্ন বেঙ্গল’-এ (১৮৮৬) ভারি মমতার সঙ্গে লিখেছেন, ১৮৫৭ সালে দেখা পাওয়া চর হিঙ্গুটিয়া নামের এক এলাকার ডাকবাংলোর কথা: ‘চর হিঙ্গুটিয়ায় একটি উপযুক্ত বাংলো রয়েছে। এলাকার হেড স্টেশন থেকে মাত্র ছয় মাইল দূরে। হিঙ্গুটিয়া বাংলো থেকে শিকারে যাওয়া যেতে পারে এমন বেশ কয়েকটি জায়গা আশপাশে লভ্য। হেড স্টেশনে আসা সব ভদ্রলোকই সাধারণত এ বাংলোয় এসে থাকেন, আর আমরা এটাকে ব্যবহার করি আনন্দ-উৎসব করার জন্য।’ সিমসন বৃহত্তর নোয়াখালী-কুমিল্লা এলাকার আরেকটি ডাকবাংলোর কথা লিখেছেন, সেটি দাউদকান্দিতে। তার মতে, ওই এলাকায় শিকার করার জন্য দাউদকান্দির বাংলোয় অবস্থান করলে বিশেষ সুবিধা মিলবে। কারণ সেখানে প্রচুর বুনো ঘাস জন্মায়, আর বুনো ঘাসের বনে দেখা মেলে বন্য শূকরের। ওই এলাকায় শিকারিদের আনাগোনায় বাড়তি লাভ হয়েছিল সেই বাংলোর ব্যবস্থাপকদের, কারণ কেউ সেখানে শিকার করতে এলে ওই বাংলোয় থাকা ছাড়া আর উপায় ছিল না।

কুমিল্লার একাধিক বাংলোর কথা পাই ১৮৬৪ সালে সেখানকার সহকারী কমিশনার আর্থার লয়েড ক্লের লেখাতেও। শহর কুমিল্লা থেকে এক কী দুই মাইল পশ্চিমে ত্রিপুরা রাজার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ময়নামতি নামের এক বাংলোর প্রশংসা করেছেন ক্লে ‘লিভস ফ্রম আ ডায়েরি ইন লোয়ার বেঙ্গল’ (১৮৯৬) পুস্তকে। কারণ তা ‘সুন্দর জায়গা, পিকনিকের জন্য উপযুক্ত’ আর শিকারের জন্যও চমত্কার পরিবেশ সেখানে। কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে ক্লেকে একবার কিছুক্ষণ থাকতে হয়েছিল সোনারগাঁওয়ের বৈদ্যবাজার এলাকার একটি বাঁশের তৈরি বাংলোয়। সে অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তিনি লিখেছেন: ‘সকালের নাশতার জন্য থামলাম বৈদ্যবাজার বাংলোয়, যদিও আমার মশলচিকেই খানা পাকাতে হয়েছিল। এ ধরনের বাংলোগুলো আদতে রাস্তার পাশে রাখা বাঁশের তৈরি ঝুপড়ির মতো। মূলত প্রকৌশলী ও গণপূর্ত বিভাগের অধস্তন কর্মকর্তাদের সুবিধার্থে নির্মিত। তবে অন্য যেসব অফিসার কোনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনে বাইরে ভ্রমণ করছেন তারাও এখানে থাকতে পারেন। এখানে কেবল না থাকলেই নয় এমন কিছু আসবাবপত্র—যেমন টেবিল, চেয়ার ইত্যাদি রয়েছে। তবে ভ্রমণকারীদের অবশ্যই নিজের পক্ষ থেকে বিছানাপত্র, খাবার-দাবার ও আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র নিয়ে আসতে হবে।’ ১৯৬৫-তে ক্লে বদলি হয়ে যান মুন্সিগঞ্জে। সেখানে তার থাকার জন্য নিজস্ব বাড়ির ব্যবস্থা হয়নি। অতএব এবার তার ঠাঁই হয় একটি পুরনো ডাকবাংলোয়। সে বাংলোর বিবরণও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক: ‘মুন্সিগঞ্জের সাব ডিভিশনাল অফিসারের বাসভবনটি আদতে ছিল একটি খড়ে ছাওয়া বাংলো, একটি পুরনো মোহামেডান স্থাপত্যশৈলীর দুর্গের ওপর স্থাপিত, যা কিনা আরাকানের মগদের আক্রমণ ঠেকানোর জন্য মুঘলরা নির্মাণ করেছিলেন।’ দেখা যাচ্ছে, ঢাকা বিভাগের বাংলোগুলোয় থাকার অভিজ্ঞতা ক্লের কাছে বিশেষ সুখকর ছিল না। কুমিল্লার পর ১৮৬৭ সালে চট্টগ্রামে বদলি হওয়ার পর তিনি আরামদায়ক ডাকবাংলোর দেখা পান ফের। ওই সময় ফেনী হয়ে চট্টগ্রাম যাওয়ার সময় মীরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ এলাকায় একটি বাংলোয় থাকার তার সুযোগ হয়েছিল। তখন শীতকাল, সন্ধ্যার আগেই তিনি বাংলোয় পৌঁছে যান। সঙ্গে সঙ্গে খানসামা হাজির। খাওয়া-দাওয়া হলো। পরের দিন সকালে ছোট হাজরি সেরে গরুর গাড়িতে করে চট্টগ্রাম শহরের দিকে তার ফের যাত্রা। এরপর থামলেন সীতাকুণ্ডের ডাকবাংলোয়। এ ডাকবাংলোর আশপাশের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক আবহ ক্লেকে মুগ্ধ করেছিল।

তবে আবহাওয়ার জন্যই হোক বা পরিপার্শ্বের কারণে, দার্জিলিংয়ের ডাকবাংলো ছিল সব ইংরেজ সাহেবেরই প্রিয়। বিচারক হিসেবে বাংলায় কাজ করতে আসা উইলিয়াম টেইলর দুই খণ্ডে সুবিশাল আত্মজীবনী ‘থার্টি-এইট ইয়াস ইন ইন্ডিয়া’-য় (১৮৮২) দার্জিলিংয়ের পাঙ্খাবাড়ির ডাকবাংলোর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু সেই টেইলরই যখন ময়মনসিংহে বদলি হয়ে এলেন, তীব্র গরমের চোটে তিনি আর সেখানকার বাংলোর কথা লিখতেই ভুলে গেলেন। পূর্ববঙ্গে তীব্র গরম থেকে তাকে তার বাংলো নিস্তার না দেয়ায় সম্ভবত তিনি ক্ষুব্ধ ছিলেন। তবে যেখানেই হোক না কেন, ডাকবাংলোয় রান্না হওয়া মুরগির মাংস তথা সেই সুবিখ্যাত ‘ডাকবাংলো চিকেন’-এর প্রশংসা করতে টেইলর ভোলেননি। ‘ডাকবাংলো চিকেন’-এর বন্দনা গাইতে গিয়ে তিনি লিখেছেন: “সত্যি বলতে কী, ‘ডাকবাংলো চিকেন’ সুখাদ্যের প্রত্যেকটি বৈশিষ্ট্যেরই প্রতিনিধিত্ব করে। বাংলোর খানসামারা জানে যে তাদের কাছে ক্ষুধার্ত পর্যটককে দেয়ার মতো আর কোনো খাবার নেই, কিন্তু তাদের কাছে কী কী খাবার আছে, তা জানতে চাইলে তারা ওই ঋতুতে লভ্য সব খাবারই হাজির করতে পারবে এমন প্রতিশ্রুতি জোরগলায় জানায়। কিন্তু যখন খানসামা ফিরে আসে ও খাবারের পাত্রের ঢাকনা সরায়, তখন তাতে শুধু মুরগিই থাকে, কেবল মুরগিই। সব বয়সের, প্রত্যেক আকৃতির ও নরম-গরম সব রকমের। একই রকম খাবার বারবার খাওয়াটা হতাশার বটে, কিন্তু এ মুরগি বা মোরগের পদটি নিঃসন্দেহে খাঁটি ও সুস্বাদু।’ এরপর তিনি ইংরেজ রসনায় ‘ডাকবাংলো চিকেন’-কে উপস্থাপন করা উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন।

উনিশ শতকের বাংলার একাধিক ডাকবাংলোর সবচেয়ে নিবিড় ও ‘টেকনিক্যাল’ বিবরণ দিয়েছেন তখনকার বেঙ্গল সাইক্লিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের ডব্লিউ এস বার্ক, তার লেখা বই ‘সাইক্লিং ইন বেঙ্গল’-এ (১৮৯৮)। কলকাতা থেকে বর্ধমান যাওয়ার পথে পাণ্ডুয়া এলাকার একটি বাংলোর কথা দিয়ে বার্ক তার দেখা বাংলোর বিবরণ শুরু করেছেন। তবে এখানে এও লিখেছেন যে এ বাংলোর বারান্দায় বসে কয়েক মিনিট বিশ্রাম নেয়াই যথেষ্ট; কেন এমন মন্তব্য, তা তো আর জানা নেই। তবে এর পরই বর্ধমানের ডাকবাংলোর খাওয়া-দাওয়ার প্রশংসা তিনি করেছেন। আসানসোল হয়ে বরাকর নদীর দিকে ভ্রমণের সময় তিনি অতি অবশ্যই সেখানকার ডাকবাংলোয় থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ বরাকর নদীর তীরে অবস্থিত ওই বাংলোটি নাকি ‘বাংলার মধ্যে অন্যতম সেরা’। শীতকালে এ বাংলোর সামনে আগুন পোয়ানোর আনন্দ ও সেখানকার অলস আড্ডার আকর্ষণের উল্লেখও বার্কের লেখায় পাই। এরপর তিনি পরম আনন্দের সঙ্গে বিশেষভাবে বলেছেন গিরিডির বাগোদর এলাকার ডাকবাংলোর কথা, কেননা সেখানকার রান্না ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। মুরগির আধিক্যের চোটে অন্য খাবারের কথা ভুলতে বসা বার্কের জিভ সেখানে পেয়েছিল ছাগমাংসের অপূর্ব আস্বাদন। আর নিছক হেলাফেলায় বানানো চাপাটি রুটির বদলে মিলেছিল যত্নে গড়া মোলায়েম রুটিও। কলকাতা থেকে যশোর ভ্রমণের সময় যশোর ডাকবাংলোয় শুধু সকালের নাশতা করার কথা জানিয়েছেন বার্ক। আর পরে প্রশংসা করেছেন বনগাঁ এলাকার ডাকবাংলোর, ‘ডাকবাংলোটি সবচেয়ে আরামদায়ক ও পরিচ্ছন্নগুলোর মধ্যে একটি। বাংলোটি রাস্তার পশ্চিমপ্রান্তে ও নদীর মুখোমুখি অবস্থিত—সব মিলিয়ে একটি সুন্দর জায়গা, পাশে থাকা ছায়াদানকারী বৃক্ষরাজি ও পরিপার্শ্বের গ্রামদেশের মুগ্ধকর দৃশ্যসমেত।’ ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার সময় বার্ক একাধিক বাংলোয় অবস্থান করেছিলেন। ঢাকার ডাকবাংলো সম্পর্কে তার মন্তব্য, ‘এ এলাকার (পূর্ববঙ্গের) মধ্যে সবচেয়ে বড়’। কিন্তু তাকে অধিকতর মুগ্ধ করেছিল দাউদকান্দির ডাকবাংলোটি, যা কিনা বৃহদাকৃতির গাছপালার অনেকটা আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে, কিন্তু পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত হওয়ায় তার আকর্ষণই আলাদা। উপরন্তু সেখান থেকে আগরতলা মাত্র ১২ মাইল দূরে।

ডাকবাংলো যেন সেকালের ইংরেজ সমাজের আভিজাত্য, অ্যাডভেঞ্চারপ্রীতি ও রসনাবিলাসের প্রতীক। ইংরেজ সিভিলিয়ান ও সেনাসদস্যদের স্মৃতিকথায় ডাকবাংলো ঘিরে অফুরান নস্টালজিয়ার প্রকাশ তারই প্রমাণ যেনবা। তবে বাংলার ডাকবাংলোগুলো সবসময় ‘এলিট’ ইংরেজদের পছন্দহতো না, বিশেষত যেগুলো দেশীয় কায়দায় নির্মিত। যদিও কোনো সরকারি ডাকবাংলোয় নেহাত শাসকের ধামাধরা কিংবা কাঁচা টাকা-পয়সার অধিকারী না হলে স্থানীয় ‘নেটিভ’ বাঙালিদের ঠাঁই হতো না। ঔপনিবেশিক আমলের বাংলার ডাকবাংলোগুলো তাই হয়ে রইল উপনিবেশের শাসকের বিচিত্র অম্ল-মধুর স্মৃতি, বিবিধ বিলাস ও একচোখা দৃষ্টিকোণের প্রতীক হয়ে। তবে অতীতের সেই শাসক ইংরেজদের সেই নস্টালজিয়ার স্বাদ অধুনা স্বাধীন স্থানীয়দের পক্ষে গ্রহণ করাও হয়তো এখন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে, ফলে অতীতের ডাকবাংলোগুলোই বা ‘উন্নয়নের জোয়ারে’ আর কতদিন টিকবে বলা মুশকিল। তবু ইতিহাসের (এবং পর্যটনেরও) স্বার্থেই ডাকবাংলোগুলো পুরনোরূপে সংরক্ষণ করা জরুরি।

 

মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক