আজগুবি, অলৌকিক বা ভয়াবহ যেকোনো ঘটনাই কোনো ডাকবাংলো সম্পর্কে বলা হোক, তা বিশ্বাস করা যেতে পারে। ডাকবাংলোয় সবই সম্ভব। বলেছিলেন রুডইয়ার্ড কিপলিং, ১৮৯৯ সালে তার লেখা ‘মাই ওন ট্রু ঘোস্ট স্টোরি’ গল্পে। ওই গল্পে তিনি আরো জানিয়েছিলেন গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের বহু ডাকবাংলোর লাগোয়া চত্বরে ছোটখাটো কবরখানা খুঁজে পাওয়া যায়। মোটরগাড়ির আগের যুগে কলকাতা থেকে দিল্লি বা আরো উত্তর-পশ্চিমে পাড়ি দেয়া যেসব সাহেবসুবো ডাকবাংলোয় মারা যেতেন, ওইসব কবরখানায় তাদের গোর দেয়া হতো, ডাকবাংলোয় ভূত থাকা তাই খুবই স্বাভাবিক।

কিপলিং তার গল্প জমাতে যাই বলে থাকুন, ধু-ধু তেপান্তরের মাঠে, জনবসতি থেকে বেশ দূরে, কিংবা জঙ্গলের ভেতর বা পাহাড়-চূড়ায়, বেশির ভাগ সময়ে ফাঁকা পড়ে থাকা উঁচু সিলিং, বড় বড় দরজা-জানালা, চওড়া বারান্দার ডাকবাংলোয় যখন গাছের পাতায় শিরশিরানি দিয়ে দমকা বাতাস বয়ে যায় কিংবা অন্ধকার রাতে যখন অচেনা রাতচরা পাখিরা কর্কশ, তীক্ষ  ডাক বা হিংস্র শ্বাপদের আওয়াজ কানে আসে, তখন কিন্তু সত্যিই মনে হয় ভূত, প্রেতাত্মা বা অশরীরী কোনো কিছুর থাকার বা বিচরণের এমন অনুকূল পরিবেশ আর হয় না।

লর্ড ক্লাইভ ভারতবর্ষে ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে নতুনভাবে ডাক ব্যবস্থার প্রচলন করেন। কিন্তু সে ব্যবস্থার প্রসার ঘটাতে কিছু সময় লাগে। ১৮৪০-৫০-এর মধ্যে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ডাক চলাচল পথে বিভিন্ন স্থানে ডাকবাংলো স্থাপন করতে শুরু করে, যাতে ডাক প্রেরণের ব্যবস্থা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভাগ করে দেয়া যায়। এ ডাকবাংলোগুলো যে শুধু ডাকগাড়ির ঘোড়া বদল বা বিভিন্ন পথের চিঠির বিভাজন কিংবা ডাকবাহী মানুষ, পশু বা গাড়ির বিশ্রামস্থল বা আবাসস্থল হিসেবেই ব্যবহার করা হতো তা নয়, ডাকবহনকারী পালকি, ঘোড়ার গাড়ি, নৌকা প্রভৃতিতে সওয়ার হওয়া পথিকও আশ্রয় পেতেন, নামমাত্র ভাড়ার বিনিময়ে এ বাংলোয়। তাছাড়া নিজ ব্যবস্থায় পথচলা ইংরেজ বা ইউরোপীয় পথিকরাও আশ্রয় নিতেন এখানে।

১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠা হয় ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের, এ সার্ভিসে যোগ দিতে ভারতে আসা উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদের জন্য সেকালে বাধ্যতামূলক বিষয়গুলোর একটি ছিল কোম্পানি বা ব্রিটিশরাজের অধীনস্থ প্রতিটি জেলা, মহকুমা এমনকি গ্রামের সম্পর্কেও প্রত্যক্ষ জ্ঞান আহরণ করা। তাছাড়া ছিলেন ফ্রান্সিস বুকানন-হ্যামিলটন কিংবা জন বেগলারের মতো অফিসাররা, যারা ভারতবর্ষের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পড়ে থাকা পুরাতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক কিংবা ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলোর সন্ধানে ঘুরে বেড়াতেন দেশের আনাচে-কানাচে। এহেন ভ্রামণিক ও পথিকদেরও প্রধান আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়াত ডাকবাংলোগুলো।

ডাকবাংলোগুলোর অবস্থান বেশির ভাগ রাজপথ লাগোয়া পাণ্ডববর্জিত অঞ্চলে হলেও কোনো গ্রাম বা শহরের কাছাকাছি অবস্থিত বাংলোগুলোর জন্য স্থান নির্বাচন হতো অপেক্ষাকৃত নির্জন এলাকায়, তার ওপর বেশির ভাগ বাংলোই দেখা যেত পাঁচিলে ঘেরা, গাছে ছাওয়া বিশাল হাতা বা কম্পাউন্ডের মাঝখানে অবস্থান করতে, হয়তো ‘কর্মঅন্তে নিভৃত পান্থশালা’-র ভাবটুকু মাথায় রেখেই এমনভাবে স্থান নির্বাচন করতেন সাহেবরা। ফলে অবস্থানগত এক আলাদা মাত্রা যুক্ত হতো সরকারি ডাকবাংলো, সার্কিট হাউজ, ইন্সপেকশন বাংলো কিংবা বন-বাংলোগুলোয়, যেমন এখনো দেখা যায় পাহাড়ের ঢালের শ্রেষ্ঠ জমিটি বরাদ্দ হয় বনবাংলো বা সরকারি গেস্ট হাউজের জন্য। কিংবা শহরের নির্জনতম অংশে নির্মাণ করা হয় সরকারি ইন্সপেকশন বাংলো। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় দার্জিলিংয়ের অদূরে লেপচাজগৎ বনবাংলো, কুমায়ূন পাহাড়ের বিনসরের বনবাংলো, কৌসলীর স্টেট গেস্ট হাউজ কিংবা ওড়িশার সম্বলপুর শহরের ব্রুকস হিলের চূড়ায় সরকারি বাংলোটির কথা।

যে দশকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরিচালকরা ডাকবাংলো প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেন, তার পরবর্তী দশকের শেষ দিকে ভারতবর্ষে সিপাহি বিদ্রোহ শুরু হয়। উত্তর ও পূর্ব ভারতে বিশেষত গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে, বিদ্রোহীদের ভয়ে নিজেদের বাসস্থান ছেড়ে ডাকবাংলোয় আশ্রয় নেয়া বহু ইউরোপীয়কে সিপাইরা হত্যা করে এবং সেই মৃত নর-নারী বা শিশুদের অনেককেই ডাকবাংলোর চৌহদ্দীর ভেতরে বা অনতিদূরে সমাধিস্থ করতে হয়। দিল্লি, মীরাট, বেরিলী প্রভৃতি বহু শহরে ঘটে যাওয়া এমন ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায় ১৮৫৭-এর মহাবিদ্রোহের ইতিহাসে।

তাছাড়া সেকালে ম্যালেরিয়া, কলেরা প্রভৃতি রোগ প্রকোপিত পরিবেশ, ডাকবাংলোয় আশ্রয় নেয়া ভ্রম্যমাণ ইংরেজের হঠাৎ মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার খবরও কিছু কম পাওয়া যায়নি। ডাকবাংলোর সঙ্গে ভুতুড়ে, অতিপ্রাকৃত কাহিনীর জড়িত হয়ে পড়ার এও এক কারণ।

অবশ্য শুধু ডাকবাংলোই নয়, ইংরেজ আমলে নির্মিত একাধিক প্রাসাদ বা বাড়ির সঙ্গে ভূতের গল্প বা কোনো বিশেষ ইউরোপীয় মানুষের আত্মার কাহিনী জড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। হয়তো বাড়িগুলোর বিশালত্ব, গাম্ভীর্য, থমথমে পরিবেশ কিংবা কাহিনীর সঙ্গে জড়িত মানুষটির জীবনের কোনো চমকপ্রদ ঘটনার ইতিহাস এর জন্য দায়ী। এ ধরনের বাড়ি বা ভূতের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত সম্ভবত কলকাতার আলিপুরে অবস্থিত হেস্টিংস হাউজ নামক বাড়িটি এবং ব্রিটিশ ভারতবর্ষের প্রথম গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের প্রতাত্মা।

ভূত অধ্যুষিত ডাকবাংলোর কথা ইংরেজ ভ্রামণিকদের রচনাতেই প্রথম বিবৃত হয়। পরে অবশ্য স্থানীয় মানুষ বা বাংলার চৌকিদারদের কাছ থেকেও এ ধরনের তথ্য সংগৃহীত হয়েছে, বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের এক ইংরেজ পর্যটক এবং লেখক মাইকেল মায়ার্স স্যুমেকার উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের গড়হি নামক অঞ্চলে অবস্থিত একটি ডাকবাংলোর উল্লেখ করেছিলেন তার রচনায়। স্যুমেকারের দৃঢ় ধারণা হয়েছিল যে গড়হির ডাকবাংলোয় ভূত আছে। কারণ মাঝরাতে ঘুম ভেঙে তিনি ঘরে কোথাও দরজা খুঁজে পাননি, ‘ইন্ডিয়ান পেজেস অ্যান্ড পিকচার্স’ গ্রন্থে স্যুমেকার আরো লিখেছেন ডাকবাংলোর একটি ঘরের দেয়ালে তারা আবছা হয়ে আসা যে দাগ দেখতে পেয়েছিলেন তা কোনো খুন হওয়া সাহেবের রক্ত ছাড়া আর কিছু হতেই পারে না। তাছাড়া ওই বাংলোর চৌকিদারটিকেও তাদের খুব একটা সুবিধার মনে হয়নি।

বিহারের পশ্চিমে চম্পারণ জেলার সদর বেতিয়ার ডাকবাংলোর বাড়িটি আগে ছিল এ অঞ্চলের ইউরোপিয়ান ক্লাব। চম্পারণের নীলকর সাহেবরা এখানে আসতেন তাস খেলা, মদ্যপান, ডিনার বা বল নাচের আসরে যোগ দিতে। বাড়িটির একদিকে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের বাসস্থান, আর একদিকে অ্যাংলিকান চার্চ। বার্মাটিকের আসবাব, ইটালিয়ান মার্বেলের মেঝে, বিশাল বলরুম, ডাইনিং হল প্রভৃতি সংবলিত বাড়িটি ডাকবাংলো হিসেবে ব্যবহারের সময় অনেক বাসিন্দা লুইস, হুইটি, কক্স ও জেমসন নামক চার নীলকর সাহেবের প্রেতাত্মার সান্নিধ্য লাভ করেছেন বলে শোনা যায় যে সাহেবদের ভূতেরা কখনো ডাকবাংলোর অতিথিদের ভয় দেখাননি। শুধু ক্লাবে মৌজ করতেই দেখা যেত তাদের।

মধ্যপ্রদেশের দামোর সার্কিট হাউজটির এ ব্যাপারে বেশ কুখ্যাতি আছে। দামো-জবলপুর রাস্তায় অবস্থিত বাংলোটি বহু প্রাচীন, ১৮৯৯ সালে স্থাপিত। স্থানীয় মানুষরা পূর্বপুরুষদের কাছে শোনা গল্পে জেনেছেন, অনুচ্চ টিলা গোছের যে জায়গায় বাংলোটি বানানো হয়, সে জায়গায় নাকি আগে থাকতেই এক জোড়া ভূত-পেত্নির উপদ্রব ছিল। সার্কিট হাউজ নির্মাণ হওয়া নাকি মেনে নিতে পারেনি এ জোড়া-ভূত, তাই নানাভাবে ভয় দেখাত বাংলোয় আসা অতিথিদের। টেবিল-চেয়ার, অন্য আসবাব নড়িয়ে, জিনিসপত্র ফেলে নানা অত্যাচার করত, অনেকটা বিদেশী পলটার জিস্ট ভূতের মতো। ভূতদের বাধা দিতে গিয়ে অনেক ইংরেজ অতিথির জীবনও নাকি চলে গিয়েছে এ ডাকবাংলোয়। তাদের মধ্যে রয়েছে ডাগলাস পরিবার। জেনারেল ডাগলাস তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে এ সার্কিট হাউজের অতিথি হয়েছিলেন। এক রাত্রে কোনো অজানা এবং রহস্যময় কারণে স্ত্রী ও সন্তানদের গুলি করে মেরে আত্মঘাতী হন জেনারেল ডাগলাস।

‘শ্যাডো অব দ্য মুন’ কিংবা ‘দ্য ফোর প্যাভিলিয়ন্স’ প্রভৃতি উপন্যাসের বিখ্যাত ইংরেজ লেখিকা মেরী মার্গারেটকে ওরফে মলির জন্ম সিমলায়, ১৯০৮ সালে। মলির জীবনের অনেকটা সময়, বিশেষত কৈশোর ও যৌবন কেটেছে ব্রিটিশ রাজের নতুন রাজধানী দিল্লিতে। এ দিল্লিতেই মলির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল এক আধপাগল ভদ্রমহিলার, যার কাছে মলি কানপুরের এক বাংলোর ভৌতিক অভিজ্ঞতার গল্প শোনেন। মলির আত্মজৈবনিক ট্রিলজিতে এ কাহিনীর উল্লেখ পাওয়া যায়। সিপাহী বিদ্রোহের সময়ে বিপ্লবীদের হাতে কানপুর শহরে মারা গিয়েছিলেন ১২৫ জন ইংরেজ নারী ও শিশু। সে মহিলার দেখা বাংলোর বাগানে নাকি প্রতি সন্ধ্যায় বহু নারী এবং তাদের সন্তানদের দেখা যেত ঘুরে বেড়াতে। ভদ্রমহিলা স্বচক্ষে দেখেছিলেন তাদের।

ডাকবাংলোর এহেন পরিবেশ এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানাবিধ ভুতুড়ে লোককাহিনী রুডইয়ার্ড কিপলিং থেকে আরম্ভ করে আরো বহু লেখককে উদ্বুদ্ধ করে এসেছে। ডাকবাংলোর পটভূমিতে ভূত বা অন্য অলৌকিক কাহিনী রচনায়। কিপলিংয়ের ‘মাই ওন ট্রু ঘোস্ট স্টোরিজ’ অবশ্য এমন ভূতের গল্প, যাতে শেষ পর্যন্ত ভূতের খোঁজ পাওয়া যায় না। যাকে বলে ভূত-ছাড়া-ভূতের-গল্প। কিন্তু এ গল্পে লেখক আরো কয়েকটি ভুতুড়ে ডাকবাংলোর সন্ধান দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে লাহোরে একটি বাংলোর শ্বেতাঙ্গ মহিলার প্রেতাত্মা, সাইবির ডাকবাংলোয় পেত্নীর বাজনার শব্দ করা, ডালহৌসি পাহাড়ের একটি বাড়িতে প্রতি শরতে এক পুরনো দুর্ঘটনার পুনরাভিনয়, মিয়া মীরের অফিসার্স বাংলোয় হঠাৎ করে দরজা খোলা বা বন্ধ হয়ে যাওয়া, মুরী শহরের একটি বাংলোয় কলেরায় মৃত এক হাসিখুশি ভূত উল্লেখযোগ্য।

জেরাল্ড টি টেট-এর ১৯২৮-এ লেখা ‘আ ঘোস্ট ইন বার্মা’ গল্পে চার ইংরেজ সৈনিকের চিন সীমান্তে এক ভুতুড়ে বাংলোয় থাকা এবং সেখানে তাদের দেখা একটি প্রাচীন সমাধি জাতীয় স্থাপত্যের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এক অদৃশ্য ঠাণ্ডা হাত সন্ধ্যায় এসে ডাকবাংলোর বাসিন্দাদের শ্বাসরোধ করে মারতে চেষ্টা করত সে গল্পে। একটি চরিত্র, জন অ্যালিস্টেয়ার্সকে রহস্যজনকভাবে মারা যেতেও দেখা যায় গল্পের শেষ দিকে।

ডাকবাংলো নিয়ে ভারতীয় বা বাঙালি লেখকরাও ভূতের গল্প কিছু কম ফাঁদেননি। মুম্বাইয়ের বিখ্যাত হরর ফিল্ম নির্মাতা র্যামসে ভাইরাও একটি ভূতের ছায়াছবি প্রযোজনা করেন ডাকবাংলোর পটভূমিকায়, ছবির নামও ‘ডাক-বাংলা’।

সত্যজিৎ রায়ের লেখা বেশ কয়েকটি গল্পে ভূতের উপদ্রব আছে এমন ডাকবাংলো, সার্কিট হাউজ বা বনবাংলোর উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন ‘নীল আতঙ্ক’ গল্পের নায়ক অনিরুদ্ধ বোসের ওপর বীরভূম জেলার এক পুরনো ডাকবাংলোয় এক রাতে ভর করেছিল এক নীলকর সাহেবের ভূত। সে বাংলোর বাড়িটি আবার আগে ছিল নীলকুঠি।

বিংশ শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করা লেখকদের গল্পে বিশেষত সত্যজিৎ রায়ের ভূতের গল্পে কিংবা সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের গোয়েন্দা গল্প-উপন্যাস বা থ্রিলারে ডাকবাংলো কিংবা অন্য সরকারি বাংলোর বিস্তর উল্লেখ দেখা গেলেও পূর্ববর্তী সাহিত্যিকদের ভূতের গল্প অথবা অন্য গল্প-উপন্যাসে ডাকবাংলোর পটভূমি বড় একটা দেখা যায় না। শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়ের লেখা বহু ছোটগল্পের মধ্যে ভৌতিক বা অলৌকিক কাহিনীর সংখ্যা কিছু কম নয়। কিন্তু সেগুলোর মধ্যে ডাকবাংলোয় অনুষ্ঠিত ভৌতিক ঘটনা দেখা যায় না বললেই চলে, ডাকবাংলোর এহেন অনুপস্থিতির কারণ সম্ভবত প্রাক-স্বাধীনতা যুগে ডাকবাংলোয় ভারতীয়দের থাকতে না দেয়া। অপেক্ষাকৃত পুরনো যুগের বাঙালি সাহিত্যিকদের গল্পের চরিত্ররা বেশির ভাগই হতেন আদ্যোপান্ত বাঙালি, অন্ততপক্ষে ভারতীয়। ডাকবাংলোয় তাদের থাকার কোনো অধিকার ছিল না।

অতীতের রাজকর্মচারী বা পথিকের সাময়িক বাসস্থান এ যুগে পরিণত হয়েছে বিলাসবহুল সরকারি গেস্ট হাউজ বা তারকাখচিত হোটেলে। সারা দেশকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে নির্মিত পিচঢালা সড়কপথ আর রেললাইনে দ্রুতগামী বিমান আর মোটরগাড়ির যুগে বদলে গিয়েছে যাতায়াত এবং ডাকবিলির পদ্ধতিও। তাছাড়া ডাকে পাঠানো চিঠির জায়গায় অনেকখানি দখল করে নিয়েছে টেলিফোন আর ই-মেইল। বর্তমানের পান্থনিবাসের আলোকোজ্জ্বল, বাতানুকূল ও বিলাসবহুল পরিবেশ দূরে সরিয়ে দিয়েছে অতীতের ডাকবাংলোর গা ছমছমে, রোমাঞ্চকর বাতাবরণকে। আজকের পরিস্থিতি ভূত বা প্রেতাত্মাদের পক্ষে একেবারেই অনুকূল নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভূত, অলৌকিক বা অবাস্তব বিষয়বস্তু এখনো রয়ে গিয়েছে মানুষের বিশ্বাস ও সাহিত্যে। যেমন রয়ে গিয়েছে বেশকিছু একাকী ডাকবাংলো—দেশের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে থাকা পাণ্ডববর্জিত, রহস্যময় পরিবেশে, এখনো।

 

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত: নন-ফিকশন লেখক