মধুলিকা দাস
অনুবাদ: মুহাম্মাদ হাসান রাহফি
চিকেন কান্ট্রি
ক্যাপ্টেন, ক্লাব
স্যান্ডউইচ, রেলওয়ে
মাটন কারি,
ডাল তড়কা
ও লেডিকেনির
মধ্যে মিল
কোথায়? প্রত্যেকটি
খাবারই আধুনিক
সমাজের খাবার
তালিকার অন্তর্ভুক্ত
(মূলত অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান)
এবং সেসব
রাঁধুনিদের সৃষ্টি,
যারা সীমিত
রসদে (সত্যিকার
অর্থেই সীমিত)
রান্না করতে
অভ্যস্ত ও
এ খাবারগুলোর
জন্মস্থানও এক
জায়গা—‘ডাকবাংলো’।
মজার বিষয়
হলো ডাকবাংলোর
খাবারের যে
কদর আমরা
আজ দেখতে
পারছি, বিশেষ
করে খাবার
নিয়ে যারা
লেখেন এবং
রাঁধেন, তারা
যেভাবে বর্তমানে
খাবারগুলোকে মূল্যায়ন
করছেন, শুরুতে
তা এতটা
রাজকীয় ছিল
না।
মূলত ১৮৪০
সালের শুরুর
দিকে যে
ডাকবাংলোগুলো প্রতিষ্ঠিত
হয়েছিল, তা
ছিল ব্রিটিশ
শাসকদের কর্মকর্তা
আর তাদের
স্বজনদের পথিমধ্যে
সেবা প্রদানের
উদ্দেশ্যে। শুরুতে
ডাকবাংলোর খাবারের
ইতিহাস খুব
একটা সাফল্যের
ছিল না।
লেডি উইলসন
তার ‘লেটার
ফ্রম ইন্ডিয়া’-তে
ডাকবাংলোর খাবার
সম্পর্কে লিখেছিলেন,
‘আমাদের
সঙ্গে করে
নিজস্ব নিত্যসামগ্রী
বহন করতে
হতো, যেগুলো
যুক্তরাজ্য থেকে
আনা অথবা
বোম্বের সেনা
ও নৌবাহিনীর
রসদ গুদামের
টিনজাত খাবারের
ওপর নির্ভর
করতে হতো।
আমাদের নিজস্ব
ফিল্টার ছিল,
সোডা পানি
ও ওয়াইনের
নিজস্ব জোগান
থাকত। আমরা
নিজেদের ভেড়া
খেয়েছি, পালিত
গরু ছিল
এবং আমরা
নিজেদের রুটি
ও মাখন
নিজেরাই তৈরি
করেছি।’
লেডি উইলসন
একমাত্র ব্যক্তি
নন, যিনি
এ রকম
কষ্টের বিষয়টিকে
বর্ণনা করেছেন।
উইলিয়াম টেলরও
একইভাবে বর্ণনা
করেছেন। পাটনার
তত্কালীন কমিশনার
১৮৮১ সালে
ডাকবাংলোর খাবার
সম্পর্কে স্মৃতিচারণ
করতে গিয়ে
বলেছিলেন, ‘এখানে
শুধু মুরগি,
মুরগি ছাড়া
আর কিছু
নেই, সব
সাইজের, বয়সের,
নরম-শক্ত
মাংসের মুরগি।’
ডাকবাংলোগুলো ছিল
আরামদায়ক রাত্রিযাপন
এবং সুস্বাদু
খাবারের জন্য,
কিন্তু সেটা
হয়েছিল অনেক
পরে, যখন
ব্রিটিশরা বুঝতে
পারল নৌ-ভ্রমণ
অনেক কষ্টদায়ক
তখন।
শুরুটা হয়েছিল
লর্ড অকল্যান্ডের
হাত ধরে
১৮৩৭ সালে।
অধিগৃহীত নতুন
কলোনির হিসেব
বুঝে পেতে
অকল্যান্ড সিদ্ধান্ত
নিলেন কলকাতা
থেকে সিমলা
যাবেন নৌপথে,
জাঁকজমকপূর্ণ নৌকায়,
সঙ্গীসাথীদের নিয়ে।
এ যাত্রায়
যে ব্যাটালিয়ন
তৈরি হলো
তাতে ছিল
৮৫০টি উট,
২৫০টি ঘোড়া,
১৪০টি হাতি
এবং ১২
হাজার মানুষের
সমাবেশ। বহরটি
শিবাজি তার
অর্ধেক রাজ্য
জয় করতে
যে সেনাবাহিনী
ব্যবহার করেছিল,
তার আকারের
থেকে চার
গুণ বড়
ছিল। অকল্যান্ডের
বহরে ছিল
তার কিছু
বন্ধুবান্ধব ও
তাদের স্ত্রী,
কর্মকর্তা এবং
একজন ফ্রেঞ্চ
রাঁধুনি, যার
নাম সেন্ট
ক্লুপ।
তিনি যে
বজরা নৌকায়
করে ভ্রমণ
করেছিলেন, সেটির
কেবিনে পর্যাপ্ত
আলো-বাতাস
আসার ব্যবস্থা
ছিল। কিন্তু
খাবারের বিষয়টি
যখন সামনে
আসে, তখন
সম্পূর্ণ যাত্রাটি
মলিন হতে
শুরু করল।
এ বহরে
থাকা একজন
অতিথি এভাবে
বর্ণনা করেছেন,
রান্নাঘরের নৌকা
থেকে যে
খাবার এসেছিল,
সেগুলো হওয়ার
কথা ছিল
টাটকা ও
ব্রিটিশ স্বাদের।
কিন্তু খাবারগুলো
ছিল নোংরা
ও অদ্ভুত।
বলা হয়ে
থাকে লর্ড
অকল্যান্ড যখন
সিমলা পৌঁছেছিলেন,
তখন তিনি
সিদ্ধান্ত নেন
নৌবহরে রাজ্য
পরিদর্শন উপযুক্ত
নয়। এমনকি
নৌপথও আসলে
উপযোগী নয়।
তিনি প্রথম
ডাকবাংলো প্রতিষ্ঠার
পর তাই
বলেছিলেন, ‘এ
স্থান হবে
আপনাদের মাথা
রাখার জন্য
আরামদায়ক এবং
পেটের জন্য
প্রশান্তিপূর্ণ।’
কোথায় কীভাবে
প্রথম ডাকবাংলো
প্রতিষ্ঠিত হলো
সেটা নিয়ে
গবেষণা প্রয়োজন,
কেননা এর
অনেকই তার
জীবদ্দশায় ধ্বংস
হয়ে গিয়েছিল।
এ ডাকবাংলোগুলো
ছিল মুঘলদের
খেদমতগারের (বিশ্রামাগার)
ছায়া। ভারতবর্ষ
জুড়ে ভ্রমণকে
আরামদায়ক করতে
তারা এটা
শুরু করেছিল।
আর এ
খেদমতগার ছিল
খেদমতকারী অথবা
ম্যানেজারদের ওয়ান
ম্যান শো।
এ ভদ্রলোক
ছিলেন রাজকীয়
রসুইঘরের একজন
রাঁধুনি, যিনি
একাধারে ম্যানেজার,
কেয়ারটেকার, রাঁধুনি,
সেবক, এমনকি
গৃহরক্ষী ছিলেন।
তার মজুরি
ছিল বড়জোর
১৩-২৫
টাকা। সেটাও
নির্ভর করত
ডাকবাংলোর অবস্থানের
ওপর।
সুযোগ-সুবিধার
কথা বিবেচনা
করলে ডাকবাংলোগুলো
শাহজাহানবাদের আরামঘরের
(সম্রাট শাহজাহানের
সময়ে তৈরি
উচ্চমানের হোটেল)
কাছাকাছিও ছিল
না। রান্নাঘরগুলো
ছিল বিশ্রামের
ঘরের পেছনে,
খাটগুলো ছিল
নিম্নমানের, পাটে
বোনা চাদর;
খড় ভরা
গদির চারপেয়েগুলো
থেকে তুলনামূলকভাবে
ভালো বিছানা।
ঘরের বাতিগুলো
বেশির ভাগ
সময় কাজ
করত না।
সুযোগ-সুবিধা
ও খাদ্যের
অভাব এ
হতাশাজনক গল্পের
একটা অংশ।
একটি সমাদৃত
শহর বা
গ্রামের অবস্থান
সত্ত্বেও এ
গেস্ট হাউজগুলো
এ এলাকার
বাসিন্দাদের অবাঞ্ছিত
হিসেবে বিবেচনা
করত। সুতরাং
ওই শহর
বা গ্রাম
থেকে খাদ্যসংগ্রহ
করা সম্ভব
ছিল না।
ফলে ডাকবাংলোগুলোকে
নিজস্ব গরু
পালন করতে
হতো এবং
ভালো খাবার
সংগ্রহ করতে
হতো বাইরে
থেকে।
এত কিছুর
পরও ডাকবাংলোগুলোর
আকর্ষণ কম
ছিল না।
এখানে সবসময়
একজন সদা
সুখী, সদা
প্রস্তুত ম্যানেজার
থাকতেন। লেডি
ডি’আরবান,
যার জন্য
কোনো এক
ডাকবাংলোয় তৈরি
হয়েছিল চিকেন
কাটলেট। তিনি
অনেক দিন
অসুস্থ হয়ে
এ রকম
একটি ডাকবাংলোয়
অবস্থান করেছিলেন।
সে অভিজ্ঞতার
বর্ণনা তিনি
দিয়েছিলেন এভাবে,
‘বিশ
মিনিটের মধ্যে
আপনার মুরগির
ডিশটি আসছে
যেভাবে, আপনি
চেয়েছেন শুনতে
আপনার ভালোই
লাগবে। কিন্তু
হঠাৎ মৃত
মুরগির ডাক
না শোনা
পর্যন্ত আপনি
আশায় বুক
বাঁধবেন না।’
ডাকবাংলোগুলো থাকার
জন্য ছিল
খুবই ভয়ংকর
বিশেষ করে
ভাড়া ও
অস্বস্তিকর পরিবেশের
জন্য। এর
পরও ডাকবাংলোগুলোর
বিকাশ হয়েছিল।
সম্ভবত নিরাপদ
ধারণাটি মালিকদের
ছিল না।
খুব ভালো
মুরগি রান্না
করতে না
পারলেও খিদমতকারীদের
বাড়তি সুবিধার
জন্য ধন্যবাদ।
কারণ এতে
আর যা-ই
হোক, সংশ্লিষ্টদের
জীবনে অনেক
অভিজ্ঞতা যুক্ত
হয়েছে।
১৮৫৭-৫৮
সালে এ
অবস্থার পরিবর্তন
হতে থাকে।
রাজাদের ক্ষমতা
কমতে থাকে
এবং অনেক
খানসামা তাদের
চাকরি হারাতে
থাকেন। লক্ষৌর
একজন বয়স্ক
বলেছিলেন, ‘ক্ষুধায়
মারা যাওয়া
এবং অর্ধবছর
আপনার স্বর্গের
এক ছোট
স্থানে (মুক্ত)
থাকার মধ্যে
আপনি পরবর্তী
বিকল্পটি বেছে
নিতেন।’
যেকোনো সময় আপনার প্লেট থেকে মুরগি দৌড়ে পালাবে বিষয়টি হয়তো আজকের দিনে আপনার টেবিলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হতে পারত। যেমন ক্যাপ্টেন চিকেন, দ্য ক্যারামেল কাস্টার্ড, দ্য ঝালফ্রেজি এবং অবশ্যই টিপসি পুডিং।





