ডাকবাংলোতে আমার দ্বিতীয় নারী অতিথি

প্রথম নারী অতিথি উপন্যাসের বিষয় হতে পারেন, কিন্তু তাতে যথেষ্ট কল্পনার মিশেল দিতে হবে। তার চেয়ে দ্বিতীয় নারীর কথাই বলি। মাত্র ক’দিন আগে শান্ত, সৌম্য এক নারী অফিসে এসেছিলেন। অফিসটা বগুড়ায়। আর ডাকবাংলোটা সাতমাথায়, শহরের কেন্দ্রস্থলেই। দুই মিনিট ডাকবাংলোর ধার ঘেঁষে হাঁটলেই সামনে আন্তজেলা বাসস্ট্যান্ড। বাসস্ট্যান্ডের উল্টোদিকে একটি মোটেল। দেশে-বিদেশে অনেক মোটেল আমার চোখে পড়েছে, কিন্তু বগুড়ার মোটেলটি বিশেষ কারণে বিস্তৃত হওয়ার নয়। এটি ছিল মোটর শ্রমিকদের হোটেল, সংক্ষেপে মোটেল।

আমার দ্বিতীয় নারী অতিথি তখন জিজ্ঞেস করলেন বগুড়া কি ভালো লেগেছে, আমি হাসিমুখে বলেছিলাম, এক কথায় প্রকাশের নতুন ধারা: যেমন মোটর শ্রমিকদের হোটেল—মোটেল।

ততক্ষণে তিনি চোখ মুছে হেসে ফেললেন, বললেন আমারও চোখে পড়েছে কিন্তু এভাবে চিন্তা করিনি।

সম্ভবত চুরাশির জানুয়ারিই হবে। তিন-চারটে কাগজপত্র আর দুটো ছবি দিলেন সত্যায়িত করে দেয়ার জন্য। কাগজপত্রে সই করার পর যখন ছবির উল্টো পিঠে সত্যায়িত লিখে সই করতে যাই রীতিমতো থ হয়ে থাকি। একবার তাকাই হাতে লেখা নামটার দিকে এবং আরেকবার আমাকে নির্বাক করে দেয়া সেই নারীর দিকে। এ নামে বাংলাদেশে দ্বিতীয় কেউ নেই। আমার প্রজন্মের কেউ যদি তার নাম শুনে না থাকেন এবং তার বই না পড়ে থাকেন এটা তাদের দুর্ভাগ্য। তার নাম রোমেনা আফাজ। আমাদের বয়স যখন এগারো থেকে চৌদ্দ-পনেরো এমনকি কারো কারো বেলায় উনিশ-কুড়ি রোমেনা আফাজের দস্যু বনহুর যদি তাকে দোলা দিয়ে না থাকে, নিশ্চিত থাকতে পারেন তিনি জন্ম বুদ্ধিজীবীদের একজন।

আমার থ হয়ে থাকা দেখে তিনি বললেন, আমি রোমেনা আফাজ। আমি তোতলাতে তোতলাতে বললাম, মানে দস্যু বনহুরের।

সম্মান কেমন করে করতে হয় সেই পরিশীলন সম্ভবত আমার ছিল না। আমার মুগ্ধতার আতিশয্য তাকে বিচলিত করে থাকতে পারে। তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। তিনি বললেন, এ অফিসে অনেকবার এসেছি, এভাবে কেউ সম্মান করেনি।

এ কথা সে কথার পর জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় থাকি? ডাকবাংলো। সাতমাথার ডাকবাংলো। এক নম্বর রুম। যেকোনো ডাকবাংলো বা সার্কিট হাউসে এক নম্বর রুমটা হয় সবচেয়ে ভালো। বগুড়াতে ঠিক উল্টো। মশারির একটা স্ট্যান্ড ভাঙা, এতে তেমন সমস্যা ছিল না। কিন্তু একমাত্র চেয়ারটির একটি ভাঙা পা যেকোনো অসতর্ক অতিথির জন্য ছিল ঝুঁকিবহুল একটি আসন।

তিনি বললেন, তার বাসা জলেশ্বরীতলা।

ঢাকা থেকে বগুড়া যাত্রার সময় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সে সময়ের পরিচালক ফজলে রাব্বি বলেছেন, জলেশ্বরীতলায় কবি শমসের আলীর বাসা। সময় পেলে দেখা করো। আমি যাত্রার আগেই আমার সহকর্মী তার কন্যা সিতারা রওশন জাহান বাবাকে আমাদের কাছে নিয়ে এলেন।

এক রোববার বিকালের দিকে (তখন রোববারই ছিল ছুটির দিন) বাইরে থেকে ডাকবাংলোতে ঢোকার সময় নিচতলায় তালাবদ্ধ এক নম্বর রুমের সামনে হাতে একটা প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন রোমেনা আফাজ।

তালা খুলতে খুলতে বলি, আপা ভেতরে আসুন, পরক্ষণেই চেয়ারটার কথা মনে হয়। তিনি আমার হাতে প্যাকেটটা তুলে দিয়ে বললেন, আমার কয়েকটা বই আছে, তবে বনহুর নয়। ‘বসব না’ বলে তিনি আমাকে প্রায় বাঁচিয়ে দিলেন। আমি জানতাম না পাকিস্তান আমলের সিনেমা কাগজের নৌকার তিনিই কাহিনীকার। আরো আছে, মোমের আলো, মায়ার ঝংকার, মধুমিতা, মাটির মানুষ, দস্যু বনহুর। দস্যু বনহুরের স্ত্রী ছিল দুজন। একজন দেখভাল করত হোম অ্যাফেয়ার্স, অন্যজন ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স। দুজনই দুজনকে বেশ মেনে নিয়েছে। ব্যাপারটা সে সময় যথেষ্ট অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, কিন্তু বাস্তব জীবনে যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করতে পারিনি বলে প্রথম স্ত্রীকেই মনে হচ্ছে শেষ স্ত্রী।

আমার প্রথম পুরুষ অতিথি

ডাকবাংলোতে রান্নাবান্নার সুযোগ কেউ কেউ করে থাকলেও কাজটা মোটেও বৈধ নয়। রান্নার ঝক্কি কেন পোহাতে যাব? আমাদের কেয়ারটেকার মমতাজকে বগুড়ার অনেকেই চিনতেন। মমতাজ এসে বললেন রেস্টুরেন্টের খাবার খেতে থাকলে বেতনের টাকা ডাক্তার আর ওষুধের পেছনে যাবে। সেজন্য আপনাদের সেবার জন্য আমি আর একটা বিয়ে করেছি। রাতের খাবারটা ফ্রি, ভালো লাগলে কাল থেকে আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর রান্না খাবেন, খরচও কম পড়বে।

মানতেই হবে আমরা সস্তায় ভালো খেয়েছি, দ্বিতীয় স্ত্রীর কল্যাণে ডাকবাংলোর কেয়ারটেকার মমতাজ সে আমলে চিকন ফ্রেমের চশমা পরতেন।

রুডিয়ার্ড কিপলিংয়ের বাবা ভুল বলেননি, একটি কক্ষকে যত ছোট করা সম্ভব তার সবচেয়ে ছোটটির সমান ডাকবাংলোর কক্ষ। আমার এক নম্বর রুমটি তেমন ছোট ছিল না। যদিও ভেতরের দেয়ালের ফাঙ্গাস পড়ে যাচ্ছিল তবু ভালো লাগত আমার এই আবাসনটিকে।

বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিপরিষদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ডক্টর মফিজ চৌধুরী বৃহত্তর বগুড়ার জয়পুরহাটের (এখন পৃথক জেলা) মানুষ। সাবেক মন্ত্রীরা ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে মোটেও অপাঙেক্তয় নন। তিনি বগুড়া এলে সার্কিট হাউসে তার জন্য কক্ষ বরাদ্দ হতো। কিন্তু তিনি চলে আসতেন ডাকবাংলোতে। সোজা আমার এক নম্বর রুমে। বলতেন, সার্কিট হাউস হচ্ছে প্যাট্রিশিয়ান এলিটদের আর ডাকবাংলো প্রোবিয়ানদের—সাধারণ মানুষের। বিজ্ঞান জগতের এই মানুষটির অন্তরে ছিল সাহিত্য। তিনি এ দেশের শ্রেষ্ঠ শেকসপিয়ার অনুবাদকদের একজন। জাহাঙ্গীর চৌধুরী নামের ‘কোরিয়ার কবিতা’র অনুবাদক আসলে তিনিই। মমতাজ মিয়ার দ্বিতীয় স্ত্রীর রান্নার প্রশংসা করেছেন। সার্কিট হাউসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ ছেড়ে তিনি আমার রুমে থেকে আমার মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। জেলা শহরে চাকরিজীবী মহলে এ ধরনের সংবাদ রটতে সময় লাগে না। মমতাজ মিয়াই সম্ভবত বলে থাকবেন, মফিজ চৌধুরী আমার মামা।

প্রথম রাত্রিবাসের দুদিন পরই আমার একজন বস ডেকে বললেন, ঠিকই আছে, বড় মাপের মামা থাকা ভালো।

আমি বললাম, আসলে আমার বন্ধু, বয়স একটু বেশি।

তিনি বললেন, দুচার বছর বড় হলে মেনে নিতাম, কিন্তু তিনি বয়সে সম্ভবত তোমার বাবার চেয়েও বড়।

আমি বললাম, সে জন্যই তো বন্ধু বানাতে পেরেছি। ১৯৯২-তে তার সঙ্গে দেখা, তথাকথিত উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে বিলেত চলে যাই, সেখানেই ১৯৯৪ সালে তার মৃত্যুসংবাদ পাই—বগুড়া ডাকবাংলোতে আমার প্রথম পুরুষ অতিথি।

মমতাজ মিয়া নেই অনেকদিন। তার রন্ধনশিল্পী দ্বিতীয় স্ত্রী আছেন কি না জানা নেই।

বগুড়া ডাকবাংলো পর্ব শেষ করার আগে প্রথম নারী অতিথির কথা একটু বলতেই হয়। শীতের অতি ভোরে ক্রমাগত দরজা ধাক্কা উপেক্ষা করতে না পেরে খুলতে বাধ্য হই। শীতবস্ত্রহীন সুদর্শন কিন্তু বিপর্যস্ত এক নারী বললেন, একজন পুলিশ নিয়ে চলুন, আমার স্বামীকে গ্রেফতার করতে হবে। আমি যতক্ষণ পর্যন্ত না বলব, তাকে জামিন দেয়া যাবে না।

কারণটা কী এবং আপনার স্বামী কে?

কারণ তাকে মারধর করেছেন এবং তিনি সে সময়কার বগুড়ার একটি বড় রেস্তোরাঁর মালিক।

আমি তাকে অফিস খোলার পর ম্যাজিস্ট্রেটদের কোর্টে যেতে বলি। কিন্তু তিনি অনড়, আমাকেই যেতে হবে।

তখন জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের প্রথম পর্যায়। ডাকবাংলোর দুজন কর্মকর্তার ড্রাইভার মিন্টু তার ছোট মিনি-মোক গাড়ি নিয়ে হাজির। মিন্টু বগুড়ার ছেলে, সম্ভবত এই নারী তারও পরিচিত। মিন্টুই বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে নিয়ে যায়, সে-ই তাকে আশ্বাস দেয় তিনদিনের মধ্যে তার স্বামীকে গ্রেফতার করা হবে। সেই মিন্টুও নেই।

যমুনার অতলে ডাকবাংলা

সিরাজগঞ্জে যখন এলাম মহকুমা থেকে সদ্য জেলায় উত্তীর্ণ হয়েছে, সার্কিট হাউস থাকার কোনো কারণই নেই। সার্কিট হাউস কেবল পুরনো জেলাগুলোতে ছিল। অবিভক্ত বাংলার প্রথম তিনটি সার্কিট হাউস সম্ভবত ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও মেদিনীপুর। যখন ডাকবাংলো কিংবা বাংলোর কথা জিজ্ঞেস করলাম বয়স্করা প্রায় সবাই যমুনা নদীর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ দেখায়, যমুনায় অন্তত আধামাইল নদীর ভেতরে।

সিরাজগঞ্জে সুন্দর ডাকবাংলা ছিল কিন্তু যমুনায় ভাঙন শুরু হলে রাতারাতি পুরো ডাকবাংলোটিই নদীতে তলিয়ে যায়। ভেতরের আসবাবপত্র কিছুই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই ডাকবাংলোতে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাত কাটিয়েছেন—যারা এ বর্ণনা শুনিয়েছেন এমনভাবে বলেছেন যে এ ডাকবাংলোর বারান্দায় জিন্নাহ সাহেবকে দাঁত ব্রাশ করতে দেখেছেন।

আমি অবস্থান নিই সিরাজগঞ্জ বাহিরগোলা সড়কের দুই রুমের ডাকবাংলোর একটি রুমে। এটাও প্রায় পরিত্যক্ত। এ সড়কেই সোজা এগোলে বিখ্যাত এলিয়ট ব্রিজ। রাস্তার ওপর পুরনো দিনের একটি বাড়ির একাংশে সাইনবোর্ড: আব্দুল বারীর ব্যক্তিগত পাঠাগার। আমি ভাবি ব্যক্তিগত পাঠাগার হলে বাইরে সাইনবোর্ড কেন। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকি এবং আব্দুল বারীর সঙ্গে কথা বলতে চাই। আরো দুজনকে দেখি পড়ছেন। আব্দুল বারী স্থায়ী ব্যাচেলর, বামপন্থী রাজনীতির আদর্শ নিয়ে বেড়ে উঠেছেন। পাঠাগারটি ব্যক্তিগত, কোনো সন্দেহ নেই কিন্তু সকল পাঠকের জন্য অবারিত। কারো কাছ থেকে এতটুকু সাহায্য নিয়ে নয়, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার স্বপ্ন সিরাজগঞ্জের ছেলেমেয়েরা বই পড়ুক। কর্মসূত্রে আমিও তো সিরাজগঞ্জের, সুতরাং আমারও পড়তে বাধা নেই।

একদিন হন্তদন্ত হয়ে তিনি সেই বাহিরগোলা ডাকবাংলোতে এসে আমাকে বললেন ছাত্রশিবিরের ছেলেরা তার পাঠাগার আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কারণ? কারণ তারা মনে করে এখান থেকে নাকি মার্ক্সবাদের শিক্ষা দেয়া হয়। সুতরাং বাংলার মাটিতে এই লাইব্রেরি থাকতে পারে না। কর্মসূত্রে তখন আমার অধিকারে একটি সরকারি জিপও ছিল (মিত্সুবিসি জে ২৪, চট্টগ্রামে অ্যাসেম্বল করা), সঙ্গে পদের অনুগামী কিছু ক্ষমতাও। আমি হাজির হলাম লাইব্রেরিতে এবং জেলার তখনকার প্রধান জামায়াত নেতা মওলানা আবু বকর সিদ্দিকীকে বললাম আব্দুল বারীর লাইব্রেরিতে যদি কেউ হাত দেয় আইন কিন্তু চুপচাপ বসে থাকবে না।

কয়েকদিন পর একজন বড় নেতা এসে সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়ে বললেন, তিনি আব্দুল বারীর ব্যক্তিগত পাঠাগার যমুনা নদীতে ছুড়ে ফেলবেন এবং আমার নাম উল্লেখ করে বললেন ডাকবাংলোসহ তাকেও যমুনায় নিক্ষেপ করা হবে।

আসল ডাকবাংলো যমুনার পেটে চলে গেছে, এটাও যদি চলে যায় সিরাজগঞ্জ শহর সরকারি ডাকবাংলোশূন্য হয়ে পড়বে। আমার বাংলোতে রানিং ওয়াটার নেই, টিউবওয়েলও সপ্তাহে একবার অকেজো হয়ে পড়ে। বাহিরগোলা রোডে পাওয়ার ডেভলপমেন্ট বোর্ডের বাংলোটির নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল খালেক। এটা খালি হতেই খালেক সাহেব সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বিনিময়ে আমাকে একটি কক্ষে নিয়ে তুললেন। আমার লাভ সার্বক্ষণিক বিদ্যুতের নিশ্চয়তা, রানিং ওয়াটার এবং উন্নত পরিবেশ; খালেক সাহেবের লাভ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেয়ার মতো একজন দ্বাররক্ষক পাওয়া।

 

এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা