প্রথম প্রকাশের পরই অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী একটি বই এবং একটি উদ্ভাবন কুশলকাজ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল ট্রান্সলেটরস থ্রু হিস্ট্রি, যা একই সঙ্গে তথ্যপূর্ণ এবং খুবই পাঠযোগ্য। অনুবাদকরা যুগে যুগে, দেশে দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। উচ্চপ্রশংসিত এ গ্রন্থে বলা হয়েছে বিভিন্ন ভাষার বিকাশে, নানা সাহিত্যের আবির্ভাবে, জ্ঞান বিতরণে ও মূল্যবোধ বিস্তারে এ অনুবাদকদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজনের অমলিন অবদানের কথা, যা হয়ে উঠেছে বিশ্বসংস্কৃতিরই একটি অনুপম কাহিনী। সে কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এই পাক্ষিক আয়োজনে পাঠকদের আমন্ত্রণ
(ত্রয়োবিংশ কিস্তি)
(তৃতীয় অধ্যায়)
‘অনুবাদকবৃন্দ এবং জাতীয় সাহিত্যসমূহের উদ্ভব’ (৪র্থ পর্ব)
ইউরোপীয় মহাদেশে শেক্সপিয়র অনুবাদ (প্রথমার্ধ)
ইউরোপীয় রোমান্টিসিজম এমন কিছু ধারাবাহিক অনুবাদের জন্য বিশিষ্ট হয়ে আছে, যেসব অনুবাদ অন্যান্য মহাদেশের সাহিত্য পরিমণ্ডলের ভেতর প্রবেশ করে গিয়েছিল, সেগুলোকে সমৃদ্ধও করেছিল। এর একটি অসাধারণ উদাহরণ হচ্ছে শেক্সপিয়র অনুবাদ, যা কিনা একটি সত্যিকারের ইউরোপীয় ঘটনা। শেক্সপিয়রের রচনাকে স্বাগত জানানোর ক্ষেত্রে অনুবাদগুলোর প্রভাবের, এবং সারা ইউরোপজুড়ে নিওক্ল্যাসিক্যাল মূল্যবোধগুলো প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে সেসব অনুবাদের ভূমিকার ওপর নতুন করে আলোকপাত করা হয়েছে। এসব অনুবাদ ও সেসবের রচয়িতার ওপর একটি অনুসন্ধানে অনুবাদ বা মধ্যস্থতার জটিল প্রক্রিয়াটি উন্মোচিত হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়া এলিজাবেথীয় রেনেসাঁ ও ইউরোপ মহাদেশীয় রোমান্টিসিজমের মতো দূরবর্তী ভাষাতাত্ত্বিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাগুলোকে একত্র করেছে।
অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের দিকে সাহিত্যিক ও থিয়েটারোপযোগী আর্ট ফর্ম হিসেবে নাটকের পুনরাবিষ্কার ঘটে। থিয়েটারের প্রতি এ নতুন উত্সাহ ফ্রান্স থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে এক সংস্কৃতি থেকে অন্য সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে যায়। গোড়ায় প্রবল প্রতিরোধ সৃষ্টি হলেও ফরাসি অনুবাদকরা তাদের নিজেদের সমাজেই প্রবর্তকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। দেশের বাইরেও তারা অগ্রপথিক বলে বিবেচিত হয়েছিলেন। সত্যি বলতে কী, শেক্সপিয়র রচনাবলির অনুবাদের ইতিহাসকে শেক্সপিয়রের ফরাসি সংস্করণের আন্তর্জাতিক পরিব্যাপ্তির ইতিহাস হিসেবে লেখা যেতে পারে, যা পরে ফরাসি মডেল বা আদর্শ তৈরির ক্ষেত্রেই বাধা সৃষ্টি করে, যখন অনুবাদগুলোকেই মৌলিক রচনা হিসেবে পরিগণিত হওয়ার একই ভাগ্যবরণ করতে হয়েছিল।
তাদের কাজগুলো যে সুদূর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে, সেটা অবশ্য গোড়ার দিকের অনুবাদকরা আগে থেকে বুঝতে পারেননি। যদিও তারা যে সাহিত্যিক ব্রত হাতে নিয়েছিলেন, সে ব্রতটির ব্যাপারে তারা অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। একজন সমালোচক ও অনুবাদক হিসেবে ভলতেয়ার শেক্সপিয়রীয় নন্দনতত্ত্ববিরোধী ও অনুগামী এ দুই দ্বন্দ্বরত সাহিত্যিকপ্রবণতার কেন্দ্রে ছিলেন। এমন নয় যে, ভলতেয়ার এ শক্তিগুলোর মধ্যে কোনো আপসরফা করতে চেয়েছিলেন বা করতে পেরেছিলেন। তিনি নিজেই বেশ কয়েকটি রচনার প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট ছিলেন, বিশেষ করে হ্যামলেটের প্রতি; আর সেটার নিন্দামন্দ করলেও নাটকটি তিনি অনুবাদেরও চেষ্টা করেছিলেন এবং তা করতে গিয়ে পরস্পরবিরোধী পথ অবলম্বন করেছিলেন। শেক্সপিয়রের ব্যক্তিত্ব আর কাজকে ঘিরে যে একটি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল, তার মূলে ছিল ভলতেয়ারের দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্তৃত্ব এবং শেক্সপিয়রের অনুবাদগুলো পরে যেভাবে গৃহীত হয়েছিল, সেটার ওপর এ বিষয়টি প্রভাব বিস্তার করেছিল। সাহিত্যিক আদর্শের মধ্যে একটি ফাটল এ বিতর্ককে আরো তীব্র করে তোলে: একদিকে ছিল গ্রিক ও লাতিন নমুনাগুলো থেকে পাওয়া সেকেলে সাহিত্যিক ফর্মগুলোর বদলে নতুন এবং বিচিত্র, বিজাতীয়গুলো প্রতিস্থাপন করার অন্বেষণ, অন্যদিকে এ স্থির বিশ্বাস যে, গৌরবময় সপ্তদশ শতকে নববলে বলীয়ান ফরাসি সাহিত্য একাই একটি প্রকৃত সাহিত্যিক আদর্শ বা নমুনা (মডেল) হিসেবে দাঁড়াতে পারে। শেক্সপিয়রের সমর্থকরা তার রচনায় সেসব বৈশিষ্ট্য দেখতে পেলেন, যেসব ফরাসি সাহিত্যে নেই, অন্যদিকে তার নিন্দুকেরা কিছুদিনের মধ্যেই যারা সংখ্যালঘুতে পরিণত হবেন, তারা তাকে বর্বরোচিত এবং রুচি ও সামঞ্জস্যের নিওক্ল্যাসিক্যাল আদর্শবিরোধী বলে গণ্য করলেন।
এ বিতর্কে অংশগ্রহণকারী প্রথম ফরাসি অনুবাদক ছিলেন পিয়ের লে ত্যুরনার (Pierre-Prime-Félicien Le Tourneur, ১৭৩৬-৮৮), যদিও পিয়ের-আঁতোয়া দে লা প্লেস (১৭১৭-৯৩) তার আগেই Le Théâtre anglois নামে ১৭৪৬-৪৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রকাশিত আট খণ্ডের মুক্ত, অনাপত্তিজনক, বিতর্কহীন অনুবাদের কৃতিত্বেও অধিকারী। লে ত্যুরনার সে সীমানাও ছাড়িয়ে গেলেন। ১৭৭৬-৮৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রকাশিত তার বিশ খণ্ডের শেক্সপিয়রের প্রথম খণ্ডে তিনি নাট্যকারের সমর্থনে অত্যন্ত বিতর্কমূলক একটি ভূমিকা রচনা করলেন। সেখানে তিনি দাবি করলেন যে, নাট্যকারের স্বভাবজ মহত্ব পূর্বেকার ‘হাস্যকর অনুকরণ বা প্রহসনের’ আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। তার অনুবাদ ছিল বিস্তর টীকাভাষ্য সমন্বিত এবং সেটার উদ্দেশ্য ছিল পাঠককে ‘শিক্ষাদান করা’, ‘আনন্দ দেয়া’ নয়। উৎস রচনাটির ভিনদেশিতা স্বীকার করে নিয়ে অন্তত খানিকটা হলেও তিনি রুচির আপেক্ষিকতার দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার প্রয়াস পেলেন। ফরাসি নিওক্ল্যাসিক্যাল সাহিত্যের একটি বিকল্প হিসেবে শেক্সপিয়রকে তুলে ধরতে চেয়ে তিনি এমন একটি সমালোচনামূলক ঐতিহ্যের উদ্বোধন ঘটালেন, যার অন্যতম প্রখ্যাত উদাহরণ হচ্ছে স্তাঁদালের Racine et Shakespeare (১৮২৩)।
রাজা ষোড়শ লুইকে নিজের কাজ উৎসর্গ করে লে ত্যুরনার রাজদরবারের সমর্থন লাভ করলেন। উল্লেখ্য, নতুন ধ্যান-ধারণার প্রতি রাজা তার পিতামহ পঞ্চদশ লুইয়ের চেয়ে বেশি সহনশীল ছিলেন, অন্তত তার রাজত্বের প্রথম দিকে। পৃষ্ঠপোষকদের তালিকায় ছিল ফরাসি ও ইংরেজ দুই রাজদরবারেরই সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্যরা। ভলতেয়ার ও তার দলের আক্রমণের পাল্টা জবাব দেয়ার জন্য এ সুরক্ষা প্রয়োজন ছিল। সংবাদমাধ্যম ও ফরাসি একাডেমির তরফ থেকে খানিকটা সমালোচনা হলেও ত্যুরনারের অনুবাদ এক রকম অকুণ্ঠ সফলতা লাভ করেছিল এবং নিশ্চিতভাবেই তার পেছনে সে সময়ের ইঙ্গোন্মত্ততা কাজ করেছিল। শেক্সপিয়রের প্রতিভা সেই প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা বিভিন্ন মূল্যবোধকে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। ফলে ফরাসি সাহিত্যে এতদিন যেসব মূল্যবোধকে বেশ সমীহ করা হতো, সেগুলোর ভিত নড়ে গিয়েছিল। শেক্সপিয়রের রচনাবলির সংস্পর্শে এসে আবিষ্কৃত হওয়া জাতীয়তা বোধ এক বৃহত্তর গুরুত্ব অর্জন করেছিল, যে গুরুত্ব একই সঙ্গে সাহিত্যিক আর রাজনৈতিক।
প্রায় ৫০ বছর ধরে লে ত্যুরনারের অনুবাদ অন্য অনুবাদকরা ব্যবহার এমনকি লুটপাট করেছেন, বিশেষ করে তারা, যারা মঞ্চের জন্য বিভিন্ন নাটক অ্যাডাপ্ট করেছিলেন। যদিও লে ত্যুরনারের সংস্করণগুলো তার সমসাময়িক জাঁ ফ্রাঁসোয়া দুসিসের (Jean-François Ducis, ১৭৩৩-১৮১৬) সংস্করণগুলোকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি মোটেই, যার স্টেজ অ্যাডাপ্টেশনগুলো ১৯২০-এর দশকের শেষ দিক অবধি যথেষ্ট সফলাতার মুখ দেখেছিল। ফরাসি থিয়েটারি ঐতিহ্য দুসিসের সতর্ক অনুবাদগুলোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল। যদিও তার পরও সেগুলোকে মৌলিক বলেই ধরে নেয়া হয়েছিল। কারণ সেসবের ইতিহাসভিত্তিক ও পৌরাণিক বিষয়বস্তু এবং চরিত্রগুলো প্রাচীন ট্র্যাজেডির প্রচলিত রীতির সঙ্গে একেবারেই মানানসই ছিল না। দুসিস্ রচিত সংস্করণগুলো ঐতিহ্য ও উদ্ভাবনের মাঝে একটা মধ্যবর্তী স্থান তৈরি করেছিল। সেগুলো ছিল কিছু স্থায়ী আপসের ফল, যা জনসাধারণ বেশ ব্যাপকভাবেই গ্রহণ করেছিল।
সে তুলনায় ভিক্টর হুগো যেসব সংস্কার প্রবক্তা ছিলেন— যার শুরু Préface de Cromwell (১৮২৭) দিয়ে— সেসব ছিল আরো বেশি র্যাডিক্যাল এবং সেগুলোর প্রভাব পড়তে সময়ও লেগেছিল খানিকটা বেশি। অনুবাদ সম্পর্কে হুগো দীর্ঘদিন খুব সাবধানী ছিলেন। রোমান্টিক বিতর্কটির তুঙ্গ মুহূর্তে আলফ্রেড দে ভিনি (Alfred de Vigny, ১৭৯৭-১৮৬৩) ও এমিল দেশাম্প (Émile Deschamps, ১৭৯১-১৮৭১) শেক্সপিয়র (অনুবাদের) নতুন সংস্করণ বের করলেন। এ দুজনই একটি নতুন থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। রোমান্টিক কাব্য ট্র্যাজেডির নতুন এক আদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভিনির ওথেলো ১৮২৯ সালে মর্যাদাপূর্ণ থিয়েতার-ফ্রাঁসে মঞ্চস্থ হয়। শেক্সপিয়র এমন একটি নাট্য ও কাব্যিক তত্ত্বের উৎস ছিলেন, যা ‘উপকরণ বা হাতিয়ার’ ও ‘শৈলী’কে নতুনভাবে সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। অনুবাদকে উৎস নয়, বরং উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। চাওয়া হয়েছিল, যেন সেটা লক্ষ্য-ভাষায় একটি পরিপূর্ণ মৌলিক কাজ হিসেবে কাজ করে। আর সত্যি বলতে ঠিক সেভাবেই ভিনির অনুবাদ গৃহীত হয়েছিল।
লে ত্যুরনার, দুসিস্ ও ভিনি— এরা সবাই বিদ্যমান সাহিত্যিকচর্চার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু কিছু সংকর ফর্মের প্রচলন ঘটানো এ অনুবাদগুলো লক্ষ্য-ভাষার অন্যান্য প্রযোজনার তুলনায় বেশ উদ্ভাবনমূলক ও প্রগতিশীলই ছিল বলা চলে।
(ক্রমশ)






