দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস প্রসঙ্গে অরুন্ধতী রায়
রূপান্তর: শওকত হোসেন
টাইমের ২০১৪ সালের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় ‘ভারতের বিবেক’ হিসেবে উল্লেখ করা লেখক অরুন্ধতী রায় এমন এক কণ্ঠস্বরের অধিকারী, যাকে হিসাবে নিতে হয়। সম্পতি বার্লিনে বক্তব্য রাখার সময় তিনি তার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত দ্বিতীয় উপন্যাসকে তুলে ধরেন।
হাউস ডার বার্লিনার ফেস্তপিয়েলে ২০ মিনিট দেরিতে পৌঁছলেও হাজার হাজার দর্শক প্রবল উত্সাহে অরুন্ধতী রায়কে স্বাগত জানান। অবশ্য তারা কাকে নিয়ে উল্লাস করছে, সেটা স্পষ্ট ছিল না: লেখক, অ্যাক্টিভিস্ট, নাকি বিশ্বায়নবিরোধী বিক্ষোভকারী।
সাম্প্রতিক পুরস্কারের জন্য মনোনীত উপন্যাস ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’-এর জার্মান তর্জমার পাঠক-অভিনেত্রী ইভা ম্যথেস ও তার সাক্ষাত্কার গ্রহণের জন্য অপেক্ষায় থাকা বেশ দীর্ঘদেহী জার্মান লেখক গ্যাব্রিয়েলে ফন আর্মিনের পাশে ৫৫ বছর বয়সী ভারতীয় লেখককে মঞ্চে বেশ খর্বাকৃতিই মনে হয়েছে।
প্রথম গ্রন্থ ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’-এর অভাবিত সাফল্যের ২০ বছর পর বার্লিন আন্তর্জাতিক সাহিত্য উত্সবের দর্শনার্থীর সমাবেশ রায়ের পরবর্তী রচনার পেছনে এত দীর্ঘ সময় নেয়ার কারণ জানতে উদগ্রীব ছিলেন।
‘আমি “গড অব স্মল থিংস” লেখার এবং সেটি সাফল্য পাওয়ার অল্প পরই অতি মৌলবাদী একটি ডানপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার ভারতের ক্ষমতা লাভ করে। এবং প্রথমেই এ সরকারটি একাধিক পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। সারা ভারতে বিপুল প্রশংসিত হয় সেটা। তখন প্রত্যেকটা সাময়িকীর প্রচ্ছদেই ছিলাম আমি। পরাশক্তির অবয়ব হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলাম’— বলেন রায়।
কিন্তু স্বদেশকে তিনি ওভাবে তুলে ধরতে চাননি। ভয়ঙ্কর সব ঘটনা ঘটতে থাকা একটা দেশের প্রতীক হিসেবে উদযাপিত হওয়ার ধারণায় বিতৃষ্ণ ছিলেন তিনি, ‘যে দেশে বেশির ভাগ মানুষ পড়তে জানে না, খাওয়ার মতো খাদ্য নেই। এ দেশে আমি একজন লেখক হতে চেয়েছি, বেস্ট সেলারের তালিকা আর সাহিত্য উত্সবের ভেতর বেঁচে থাকা কোনো ব্যক্তি নয়।’
রাজনীতি অর্গল ভেঙে দিয়েছে
বক্তব্য রাখার সময় রায়ের প্রবল উপস্থিতি ছিল। এটা স্পষ্ট যে, নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়ানোর মতোই কিছু ছিলেন তিনি। তিনি লাখো মানুষকে উদ্বাস্তুতে পরিণত করবে, এমন বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, বিশ্বায়ন, বৈশ্বিক রাজনীতি ও বহুজাতিক কোম্পানির বিধ্বংসী পরিণতি, হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও কাশ্মীরের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তবে কি তিনি লেখকের চেয়ে বরং বেশি করে অ্যাক্টিভিস্ট?
প্রশ্ন করা হলে রায় বললেন, বাজারের তৈরি করা মোড়ক বিবেচনায় তিনি এ তকমা পছন্দ করেন না। ‘মানুষ যেন লেখক বলতে কী বোঝায়, সে সংজ্ঞাকে সংকুচিত করে ফেলেছে। এ যেন রাজনৈতিক লেখালেখি করলেই আপনি আর লেখক নন, আপনি একজন অ্যাক্টিভিস্ট, এটা আমার কাছে খুবই দুঃখজনক মনে হয়। সাহিত্যের অবস্থান নিয়ে কী হচ্ছে?’— বললেন তিনি। লেখালেখি অনিবার্যভাবেই রাজনৈতিক বিষয় যোগ করে তিনি স্বীকার করছেন, ‘লেখক হিসেবে আমাদের কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, সে ব্যাপারে আমাদের খুবই সতর্ক থাকতে হবে। রাজনীতি অর্গল ভেঙে দিচ্ছে।’
নতুন বইয়ে রায় বিগত ২০ বছরে তার ব্যক্তিগত বিষয়আশয়সহ ভারতে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনার ক্রমপঞ্জি দিয়েছেন। ‘কীভাবে গল্প বলতে হয়?’— প্রশ্ন করেছেন তিনি। ‘ধীরে ধীরে সবাইতে পরিণত হয়ে? না ধীরে ধীরে সবকিছুতে রূপান্তরিত হয়ে।’
মানবজাতির নিষ্ঠুরতা
প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠায় রায় মানব প্রজাতির ষড়যন্ত্র, হতাযজ্ঞ, যুদ্ধ ও খুনখারাবির কথা, মানবজাতির নিষ্ঠুরতার কথা লিখেছেন এবং এগুলোর নাম ধরে বলতে ভীত নন তিনি। কিন্তু সঞ্চালক গ্যাব্রিয়েলে ফন আর্মিন যেমন তুলে ধরেছেন, তিনি ‘কোনো ভারতীয় উপন্যাস’ লেখেননি, ‘তার চেয়ে বেশি কিছু তিনি চান।’ ‘রায় মিষ্টির প্রলেপ দেন না, তবু পাঠকদের চমকিত, বিব্রত করে অসাধারণ ভঙ্গিতে লেখেন’— বলেছেন তিনি।
‘বইটি আমরা যে বাতাসে শ্বাস গ্রহণ করি, তার ওপর রচিত’— বলেছেন রায়। ‘এবং সেই বাতাসে ভালোবাসা আর নিবিড়তা, জাতপাত, লিঙ্গ, ছেলেবেলা ও কাশ্মীর আর রাজনীতি, দুর্নীতি, করপোরেশন আর মিডিয়া এবং সবকিছু আছে, উপন্যাস কোনো কোনো এনজিও আবেদনপত্রের মতো শিরোনামের অন্বেষণের ওপর হওয়া উচিত নয়। উপন্যাসকে সবকিছুই নিয়েই হতে হয়।’
জাদুবাস্তবতা
কোনো কোনো পাঠক ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’-এর কিছু কিছু অংশকে জাদুবাস্তবতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রটি স্থানীয়ভাবে হিজড়া হিসেবে পরিচিত, ভারতের ট্রান্সজেন্ডার গোষ্ঠী ‘তৃতীয় লিঙ্গের’ একজন, ভারতে যাদের সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন।
এ জীবনের ভেতর জাদুময়ী কিছু নেই— বলেছেন রায়। তিনি জোরের সঙ্গে বলেছেন, ভারত ও কাশ্মীরের কাহিনী কেবল গল্পের ভেতর দিয়েই বাস্তবসম্মতভাবে বলা সম্ভব। ‘গল্পই সত্যি বলার একমাত্র উপায়। গল্পই সত্যি।’
রায়ের উপন্যাসটি বহু নিষ্ঠুরতার চিত্র তুলে ধরেছে। কোনো কোনো সমালোচক তাতে বিতৃষ্ণ বোধ করেছেন।
কিন্তু তার বার্লিনে হাজির হওয়ার মাত্র কদিন আগের এক করুণ ঘটনা ভারতের বাস্তবতা, গল্প ও বাস্তবতার সূক্ষ্ম পার্থক্য রেখা স্পষ্ট করে তোলে। দুঃখের সঙ্গে রায় তার বন্ধু পত্রিকা সম্পাদক ও শাসক হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলের কট্টর সমালোচক গৌরী লঙ্কেশের— রায়ের সমমনা লেখক— অজানা দুষ্কৃতকারীদের হাতে নিহত হওয়ার কথা স্মরণ করেন।
‘হররোজ মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে’— বলেছেন রায়। যেমন স্রেফ গরুর মাংস খাওয়ার দায়েই যে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা হতে পারে এবং নিমেষে ভয়ঙ্কর কোনো জটলার ঘেরাওয়ের ভেতর পড়ে যেতে হতে পারে। ‘এসব ব্যাপারকে প্রতিহত করা না গেলে সবকিছু খোয়াব আমরা’— বলেছেন তিনি।
দরিদ্রের বিরুদ্ধে লড়াই
রায় মনে করেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিন্দু জাতীয়তাবাদী নরেন্দ্র মোদির অধীনে ভুয়া খবর ও ইন্টারনেট ট্রলে আবেগকে উসকে দিয়ে সীমাহীন বিদ্বেষে দেশকে বিভাজিত করা হচ্ছে। ‘আমার ও অন্য বুদ্ধিজীবীদের পক্ষে অবস্থা এখন সঙ্গিন।’ তিনি মনে করেন, ভারত এক ধরনের গৃহযুদ্ধের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, আবার একই সময়ে নিজেকে একটি অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে দুনিয়ার সামনে তুলে ধরছে। ‘কিন্তু ভারত নিজেকেই উপনিবেশে পরিণত করছে। সেনাবাহিনী ও প্যারামিলিটারি প্রতিষ্ঠানগুলো দরিদ্রতরের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছে’— বলেছেন তিনি।
সন্ধ্যার শেষ দিকে দর্শকদের খানিকটা হকচকিত মনে হয়েছে। বর্তমান ভারতের সহিংসতা ও বিভাজন অনেকের কাছেই স্পষ্ট ছিল না বলে মনে হয়েছে। কিন্তু রায়ের নতুন বই থেকে ভালোবাসার ওপর একটি অনুচ্ছেদ পড়ার পর মেজাজ কিছুটা হালকা হয়ে আসে। শত হোক, এটা তো একটা উপন্যাসই।






