কোনো মানুষ কি অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে? স্টিফেন হকিংকে দেখলে মনে হতো, বোধহয় তার পক্ষেই সম্ভব ছিল এ অসাধ্য সম্ভব করা। কেন এমন মনে হতে পারে, সেটা খুঁজতে ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টিয়ে আমাদের যেতে হবে ১৯৬৩ সালে, হকিংয়ের বয়স তখন ২১ বছর। সে বছর তার শরীরে একটি স্নায়বিক সমস্যা ধরা পড়ে, যার নাম অ্যামিওট্রফিক লেটারাল স্ক্লেরোসিস। সেদিন তাকে আর মাত্র তিন বছরের আয়ু দিয়েছিলেন চিকিৎসকরা। সে হিসাবে ২৪ বছরেই থেমে যাওয়ার কথা ছিল হকিংয়ের জীবন। কিন্তু এই সেদিন যখন তিনি বিদায় নিলেন, তখন তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। পাঁচটা দশক তিনি জীবন কাটিয়েছেন একটা ইলেকট্রিক হুইলচেয়ারের ওপর। সময় যত গড়িয়েছে, তার শরীরের সব ধরনের নড়নক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। শেষদিকে তার গালের মাংসপেশির সামান্য ঝাঁকিকে কম্পিউটারের মাধ্যমে একটি ডিজিটাল কণ্ঠস্বরে রূপান্তর করা হতো। আর এ দিয়েই অন্যরা জানতে পারত, কী এক সৃষ্টিশীল মন হুইলচেয়ারে চলত্শক্তিহীন মানুষটির মনে খেলা করছে। সেই হুইলচেয়ারে বসেই তিনি আমাদের চিন্তায় আঁটে না, এমন গভীরতায় গিয়ে মহাবিশ্বকে অনুসন্ধান করেছেন।
হকিং কীভাবে বেঁচে ছিলেন? হকিংয়ের কাজের সঙ্গে সঙ্গে এ প্রশ্নটি বোধহয় আমাদের মনে কম কৌতূহল জাগায় না। অ্যামিওট্রফিক লেটারাল স্ক্লেরোসিস রোগটি লোউ গেহরিগ’জ ডিজিজ নামেও পরিচিত। এ রোগ সাধারণত মানুষের দেহে ধরা পড়ে ৫০ বছরের পর এবং রোগে আক্রমণের পাঁচ বছরের মধ্যে রোগী মারা যান। কিন্তু হকিংয়ের রোগ শনাক্ত হয়েছিল তার ২১ বছর বয়সে এবং তিনি তার ২৫তম জন্মবার্ষিকী দেখবেন, এমনটা কেউ ভাবতে পারেননি। সবাইকে ভুল প্রমাণ করে হকিংয়ের আরো পাঁচ দশক বেঁচে থাকা প্রসঙ্গে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার নিউরোলজির সহযোগী অধ্যাপক লিও ম্যাকলাস্কি কয়েক বছর আগে বলেছিলেন যে, ‘এটা অবিশ্বাস্য, রোগের পরিবর্তনশীলতার এক অসম্ভব উদাহরণ। এ রোগ যাদের আছে, হকিং তাদের দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার আশা দেখিয়ে গেছেন।’
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ব্যাখ্যাকার এমন এক যুগে বেঁচে ছিলেন, যখন প্রযুক্তি শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষের জন্য নানা বিস্ময়কর সহায়ক যন্ত্রপাতি উপহার দিচ্ছে। হকিং চলত্শক্তিহীন মানুষ। এ অবস্থায়ও বেঁচে থেকে তিনি ২৩০টির বেশি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ রচনা করেছেন। বই লিখেছেন, এমনকি শিশুদের জন্যও। অগণিত বক্তৃতা দিয়েছেন, আমাদের অস্তিত্বের প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করেছেন। হকিংকে তার সহকর্মীরা যথাযথভাবেই স্বীকৃতি দিয়েছেন। তারা একই সঙ্গে হকিংয়ের চিন্তাকেও ব্যাখ্যা করেছেন, যেন সবাই সেগুলো সহজে বুঝতে পারেন। অ্যামিওট্রফিক লেটারাল স্ক্লেরোসিসে আক্রান্ত একজন মানুষের জন্য এ সহযোগিতা খুব সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। যাহোক, ফেরা যাক প্রযুক্তির দিকে। হকিং যে যন্ত্রের সাহায্যে কথা বলতেন, তা স্পিচ জেনারেটিং ডিভাইস (এসজিডি) নামে পরিচিত। হকিংয়ের ব্যবহূত স্পিচ জেনারেটিং ডিভাইসটি তুলনামূলকভাবে সাধারণ মানের প্রযুক্তি হলেও এর কাজ করার পদ্ধতিটি অনন্য। তার গালের চামড়ার নড়নের মাধ্যমে তিনি একটি ইনফ্রারেড সুইচকে নির্দেশ দিতেন, যা তার ট্যাবলেট কম্পিউটারটিকে চালাত। হকিংয়ের নিজের কথায়ই সে প্রক্রিয়াটি শোনা যাক—
‘পর্দায় একটা সফটওয়্যার কিবোর্ড আছে। একটি কার্সর স্বয়ংক্রিয়ভাবে কিবোর্ডের ওপর ঘুরে বেড়ায়। আমি আমার গাল নাড়িয়ে কার্সরটিকে কোনো নির্দিষ্ট অক্ষরের ওপর থামিয়ে দিতে পারি। গালের নড়াচড়া শনাক্ত করে একটি ইনফ্রারেড সুইচ, যেটি আমার চশমার ওপর বসানো আছে। এ সুইচটাই কম্পিউটারের সঙ্গে আমার একমাত্র সংযোগ। একটা বাক্য লেখা হয়ে গেলে আমি সেটাকে স্পিচ সিনথেসাইজারে পাঠিয়ে দিতে পারি। আমি পর্দায় আমার মাউসকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। এভাবে আমি পুরো কম্পিউটারকে চালাই। আমি মেইল চেক করতে পারি, বক্তৃতা লিখতে পারি। ওয়েবক্যামে আমি স্কাইপও ব্যবহার করতে পারি।’
মনটেকের সাবেক ক্লিনিক্যাল সমন্বয়ক জুলি ডোয়েরনার বলেছেন, ‘দুনিয়ায় স্টিফেন হকিংই সবচেয়ে দক্ষ স্পিচ জেনারেটিং ডিভাইস ব্যবহারকারী।’
২০১৩ সালে নৃতত্ত্ববিদ হেলেন মিয়ালেট লিখেছিলেন, “হকিং যেন চৌবাচ্চায় রাখা একটি ‘মস্তিষ্ক’তে পরিণত হয়েছেন।’ হেলেন কথাটি বলেছিলেন হকিংয়ের ৭১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে। “একভাবে দেখলে স্টার ওয়ারসের কাল্পনিক চরিত্র ওবি-য়ান কর্তৃক ডার্থ ভেদারকে বলা একটি বাক্য ধার করে বলতে হয় যে, ‘হকিং এখন যতটা না মানুষ, তার চেয়ে বেশি যন্ত্র’।” হকিং এ ধারণাটিকে আলিঙ্গন করেছিলেন। ‘স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন’-এ হকিংয়ের ডজনখানেক ক্যামিও উপস্থিতি ছিল। তার মধ্যে একটিতে তাকে দেখা গেছে আইনস্টাইন ও আইজ্যাক নিউটনের সঙ্গে । ‘দ্য সিম্পসনস’-এও হকিংকে দেখা গেছে কয়েকবার।
সমান্তরাল ব্রহ্মাণ্ডে একজন সুস্থ, সচল হকিং কি এত বিখ্যাত হয়ে উঠতে পারতেন? এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, তার শারীরিক জরা তার কাজে বাধা হয়ে উঠতে পারেনি, বরং তার মস্তিষ্ককে আরো ক্ষুরধার করেছে। ২০১৩ সালে হকিং দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছিলেন, ‘আমি পুরো জীবন কাটিয়েছি একটা অকালমৃত্যুর হুমকিকে সঙ্গে নিয়ে।’ তার বৈজ্ঞানিক অবদান যতটা গভীর, ততটাই কঠিন সেগুলোকে অনুধাবন করা। হকিং কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা, সাবঅ্যাটোমিক জগতের দুর্বোধ্য বিজ্ঞানকে আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব ও কসমিক পর্যায়ে গ্রাভিটির অদ্ভুত প্রকৃতির পদার্থবিদ্যার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কৃষ্ণবিবরের ক্ষেত্রে তিনি এটা করতে পেরেছেন— পদার্থ এত ঘন হয়ে সন্নিবেশিত হতে পারে যে, আলোও তাদের মাধ্যাকর্ষণ অতিক্রম করে বের হতে পারে না— এটা ক্ল্যাসিক্যাল পদার্থবিদ্যার মতো। ১৯৮৪ সালে তার এক গবেষণাপত্রে হকিং দেখিয়েছেন, তত্ত্বীয়ভাবে কোয়ান্টাম মেকানিকসের অধীনে পদার্থ কৃষ্ণবিবরকে অতিক্রম করে যেতে পারে— এটা হকিং রেডিয়েশন নামে পরিচিত।
হকিংয়ের ক্যারিয়ার জ্যোতির্বিদ্যা ও অ্যাস্ট্রোফিজিকসে অবিস্মরণীয় জাগরণ সৃষ্টি করেছে। নতুন ধরনের টেলিস্কোপ ও স্যাটেলাইট নির্মিত যন্ত্রপাতির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রের কসমিক বিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন সেই প্রাথমিক কাল থেকে। এ পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করা হয়েছে বিগ ব্যাংয়ের পরবর্তীতে সৃষ্ট কসমিক মাইক্রোওয়েভকে ব্যাখ্যা করতে। পৃথিবীর সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছিল জ্যোতির্বিদ্যার কল্পনাবিলাসে, কিন্তু এবার তা এক্সপেরিমেন্টাল বিজ্ঞানে পরিণত হয়। কসমোলজিস্টরা তাদের অন্ধকারাচ্ছন্ন, আড়ালে থাকা গবেষণাগার থেকে কেমব্রিজ, পাসাডেনা ও ম্যানহাটনের আলোকোজ্জ্বল অফিসে উঠে এলেন। কৃষ্ণবিবর এ গল্পের অংশ। ১৯১৬ সালে আইনস্টাইন এদের অস্তিত্বকে তত্ত্বীয়ভাবে দেখিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে এদের প্রথমটিকে দেখা গিয়েছিল। এখন আমরা জানি, এরা সবখানেই আছে— শতকোটি। প্রত্যেকটি গ্যালাক্সির কেন্দ্রে একটি সুপার কৃষ্ণবিবর থাকে। আমাদের মিল্কিওয়েতেও এমন আছে। হকিং দেখিয়েছেন যে, কৃষ্ণবিবরই বস্তুর শেষ গন্তব্য নয়; তারা সেখান থেকে আলাদা হতে পারে, বিস্ফোরিত হতে পারে। হকিংয়ের সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত এসব বিষয়কে অনুধাবনযোগ্য করে তুলতে পারা বা নিদেনপক্ষে তিনি সেগুলোকে অভিগম্য করে তুলতে পেরেছেন। হকিংয়ের অবদানকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তার বন্ধু অ্যান্ডি স্ট্রমিঞ্জার বলেছেন, “স্টিফেন তার সবচেয়ে বড় আবিষ্কারটি করেছিলেন ১৯৭৪ সালে। তিনি দেখিয়েছিলেন যে, কোয়ান্টাম কৃষ্ণবিবরগুলো শূন্য বা ফাঁকা নয়। অথচ আইনস্টাইন ভাবতেন, সেগুলো শূন্য ছিল। হকিং জানান, এ কৃষ্ণবিবরগুলো বিপুল গিগাবাইট দিয়ে ভরপুর। এ বিষয়ে তিনি একটি সূত্রও তৈরি করেন। তার যুক্তি এতটাই সাধারণ ও সরল ছিল যে, অনেকে শুরুতে এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তারপর গিগাবাইট ধারণকারী কোয়ান্টাম চিপসের ধারণা আধুনিক পদার্থবিদ্যার হোলি গ্রেইলে পরিণত হয়। কোনো কোয়ান্টাম চিপসের অনুপস্থিতিকে ‘ব্ল্যাকহোল ইনফরমেশন প্যারাডক্স’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এখন মনে হয়, হকিংয়ের তোলা প্রশ্নের জবাব দিতে আমাদের চারপাশের পুরো ব্রহ্মাণ্ডের গঠন নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।”
‘ব্ল্যাকহোল ইনফরমেশন প্যারাডক্স’ সমাধান করতে গত চার দশকে হকিং অনেকগুলো বাধাকে ডিঙিয়েছেন। স্টিফেন অনেক সময় অন্ধকার গলিতে কোনো ফল হবে না জেনেও চেষ্টা করে দেখেছেন। বিজ্ঞানী হিসেবে কোনো বিশেষ অহংবোধ তাকে তাড়িত করেনি। কারণ প্রকৃত বিজ্ঞানী অন্ধকার গলিতে ঝাঁপ দিতে কিংবা ব্যর্থ হতে ইতস্তত করেন না। জরুরি হলো আপনি কতগুলো পথ খুঁজে দেখেছেন। স্টিফেন হকিং কিন্তু অনেকগুলো দেখেছেন। একপর্যায়ে স্টিফেন উপসংহারে পৌঁছেন যে, কোয়ান্টাম চিপস অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি নির্দেশ করে যে, কৃষ্ণবিবর তথ্য সংরক্ষণের চেয়ে ধ্বংসও করে দেয়। এ ধারণাকে তিনি ১৯৯৭ সালে পরিত্যাগ করেন। ৩২ বছর পর তিনি নিজের সিদ্ধান্তকে বদলে দিলেন। ভুল প্রমাণিত হতে কিংবা নিজের সিদ্ধান্তকে পরিবর্তন করতে তার মধ্যে কোনো দ্বিধা ছিল না, বিশেষত যখন বুঝতেন, সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের উপযুক্ত সময় হাজির হয়েছে।
পদার্থবিদ্যার প্রতি হকিংয়ের ভালোবাসা ছিল সর্বজনবিদিত। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও তিনি সর্বশেষ তথ্যের খোঁজখবর করছিলেন। চিকিৎসকরা যখন হকিংকে লিখতে দিতেন কিংবা সহকর্মী ও বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে দিতেন, তখনো সেসবের বিষয়বস্তু হয়ে থাকত পদার্থবিদ্যার সর্বশেষ কোনো ইস্যু।
হকিংয়ের আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৮ সালের এপ্রিলে। বইটির এক কোটির বেশি কপি বিক্রি হয়েছে। বহু মাস ধরে বইটি টাইমসের বেস্টসেলার তালিকায় অবস্থান করছিল। অনেক বলেন, এটা হচ্ছে সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি বই, যা কেউ পড়ে আত্মস্থ করতে পারেননি। যদিও এ বইয়ের একেবারে কঠিন অংশগুলো পড়াও দারুণ আনন্দের বিষয়। হকিং তার বইটির বিভিন্ন সীমাবদ্ধতাকে নির্দিষ্ট করে পরবর্তীতে সেগুলোকে পূরণ করতে লিখেছেন দি ইউনিভার্স ইন আ নাটশেল, আ ব্রিফার হিস্ট্রি অব টাইম ও দি ইলাস্ট্রেটেড ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম। দি ইলাস্ট্রেটেড ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইমের ভূমিকায় হকিং লিখেছেন, ‘আপনি যদি এমনকি বইয়ের ছবি এবং সেগুলোর ক্যাপশনগুলোও দেখেন, তাহলেও পুরো বিষয় সম্পর্কে আপনি কিছু ধারণা পাবেন।’
হকিংয়ের আগে মহাবিশ্ব নিয়ে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ জাগিয়েছিলেন কার্ল সাগান। আ ব্রিফার হিস্ট্রি অব টাইম বইয়ের ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন সাগান। সাগানের কসমস ছিল বরফ আর মহাকাশের নানা প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে। হকিং যুক্ত করেন গাণিতিক স্তর। তিনি মহাকাশকে গাণিতিক ফ্যাক্ট দিয়ে বিচার করলেন। রাতের খাবার খেতে খেতে ইউক্লিডিয়ান স্পেস টাইম ও গ্রাভিটেশনাল ফ্লাকচুয়েশন নিয়ে আলোচনা করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়া সম্ভব হলো কেবল হকিংয়ের জন্য। এমনকি পুরোপুরি না বুঝেও কিছুটা আলোচনা করা সম্ভব হলো শুধু তার অবদানে। তবে মহাবিশ্ব সম্পর্কে সবকিছু বোঝা বা নিশ্চিত হয়ে বলা সম্ভবও না আর এ অনিশ্চয়তাটা প্রয়োজনও। মহাবিশ্বের প্রকৃতি নরকের মতোই অদ্ভুত; এ স্থলভাগে বসবাস করে আমরা যতকিছু দেখি, সেগুলোর কোনো কিছুকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। শুধু একটা ভাষা আমাদের বোধগম্য হয়, তার নাম গণিত। আর এ গণিত এখনো আমাদের মধ্যকার মেধাবী মানুষেরা বিকশিত করে চলেছেন।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, হকিংয়ের শারীরিক অবস্থা তার নিজের জন্য সহায়ক না হলেও আমাদের জন্য উপকার হয়েছে। নিশ্চল, কম্পিউটারাইজড মানুষটি যেন অন্য জগৎ থেকে আমাদের একের পর বার্তা দিয়ে গেছেন। সচল ব্যক্তির নানা অভিক্ষেপের চেয়ে নিশ্চল মানুষের বার্তাগুলোয় মনোযোগ দেয়ায়ও আমাদের সুবিধা হয়েছে। তবে তিনি দুনিয়ার এ সবচেয়ে বড় রহস্যকে আবিষ্কারের ক্ষেত্রে নমনীয়, রসাত্মক। তিনি একই সঙ্গে দুটো দুনিয়ার ছেদবিন্দুতে বসবাস করতেন— একটা মহাজাগতিক, অন্যটা শারীরিক। তিনি এ দুই জগতের মধ্যে একটা দরজা হতে চেয়েছিলেন।
অতি অবশ্যই হকিং পুরোপুরি একজন মানুষ ছিলেন। শিশুকালে তিনি শিশুদের মতো খেলতেন: সাইকেল চালাতেন, বোর্ডগেম খেলতেন, টিভি দেখতেন, রেডিও শুনতেন। এমনকি বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে আতশবাজি পোড়াতেন। অক্সফোর্ডে একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটিং ক্লাবেও যোগ দিয়েছিলেন। এমনকি তিনি এমনটাই আগ্রাসী মাঝি ছিলেন যে, সরু জায়গা দিয়ে বোট চালাতে গিয়ে বোটের ব্লেড ভেঙে ফেলেছিলেন। তিনি এন্টার্কটিকা, ইস্টার আইল্যান্ড সফর করেছেন; সাবমেরিনে চড়েছেন; জিরো গ্রাভিটিতে উড়েছেন।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার শিক্ষক ও গবেষক বুসো হকিংয়ের মৃত্যুর পর প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেছেন, ‘স্টিফেন ছিলেন হাসি-খুশি, চিন্তার ভারমুক্ত মানুষ। তিনি অতি সম্মান ও জটিল সম্পর্ক দ্বারা ভারাক্রান্ত হতে চাইতেন না।’ বুসো নিজে জীবনের বিভিন্ন ঝামেলা, দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলতে হকিংকে অনুসরণ করতেন।
২০১৪ সালে ইংল্যান্ড কী করে বিশ্বকাপ ফুটবল জিততে পারে, সেটা অংকে হিসাব করে দেখিয়েছিলেন, যদিও অংকটা ভুল ছিল। তিনি দুবার বিয়ে করেছিলেন এবং তার তিন সন্তান ও একজন নাতি আছে।
হকিং একাকী হলেও নিঃসঙ্গ নন। ‘হকিং ইনকরপোরেটেড’ গ্রন্থের জন্য নৃতত্ত্ববিদ মিয়ালেট বেশ ক’বছর হকিংকে অনুসরণ করেছেন। তার মতে, হকিং অদ্ভুত কেউ নন, বরং তিনিই বিজ্ঞানের বিশুদ্ধ রূপ। ২০১৩ সালে তিনি লিখেছিলেন, ‘হকিং হচ্ছেন ছড়িয়ে পড়া কেন্দ্রীভূত একজন কর্তা। এ রকমটা হয়েছে তার শারীরিক অচলাবস্থার কারণে। এভাবে এক জায়গায় থেকেই বিজ্ঞানীরা কাজ করেন এবং ভবিষ্যতে পুরো পৃথিবীই এভাবে কাজ করবে।’
টেলিভিশন সিরিজের চরিত্র হোমার সিম্পসনকে হকিং বলেছিলেন, ‘সে সবসময় অকারণে নানা ধরনের চেষ্টা করে।’ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডও ঠিক তাই। হকিংয়ের মতে, খুব ক্ষুদ্র কোয়ান্টাম কণা মহাকাশে ঘুরে বেড়ায়— সময়ই খুব সম্ভবত সেই বীজ, যা নক্ষত্র, ছায়াপথ, জীবন ও বুদ্ধিমত্তার জন্ম দিয়েছিল— একের অধিকবার।’ গার্ডিয়ানকে হকিং বলেছিলেন, ‘বিজ্ঞান ধারণা করে যে, অনেক ধরনের ব্রহ্মাণ্ড শূন্য থেকেই আপনাআপনি সৃষ্টি হবে। এটা কেবল এক ধরনের সুযোগ, আমরা নিজেরাও যার মধ্যে বাস করছি।’ এবং অতি অবশ্য এ সবকিছু আবার ধীরে ধীরে একসময় শূন্যে পরিণত হবে। হকিং জীবনের অমরত্বের ধারণাকে গ্রহণ করেছিলেন। তবে নিজে সেটার জন্য আকাঙ্ক্ষিত ছিলেন না। গার্ডিয়ানকে তিনি আরো বলেছিলেন,‘আমি মনে করি, মস্তিষ্ক হচ্ছে মনের মধ্যে একটা কম্পিউটার প্রোগ্রাম। তত্ত্বীয়ভাবে একটি মস্তিষ্ককে কম্পিউটারে কপি করা সম্ভব’ ফলে মৃত্যুর পরও এক রকমের জীবন বজায় রাখার উপায় হতে পারে।’ তিনি আরো যোগ করেন, ‘এসব এখনো আমাদের বর্তমান সামর্থ্যের বাইরে। আমার মনে হয়, প্রথাগত যে পরকালের ধারণা, সেটা হচ্ছে অন্ধকারকে ভয় পাওয়া মানুষের মনের রূপকথা।’ একটা কৃষ্ণবিবর আমাদের সবার জন্যই আসছে, তবে ভাগ্য আর তত্ত্ব নিয়ে।
গ্যালিলিওর মৃত্যু দিবসে তার মৃত্যুর ৩০০ বছর পর ১৯৪২ সালের ৮ জানুয়ারি জন্মেছিলেন স্টিফেন হকিং— কথাটা আনন্দের সঙ্গে তিনি তার শ্রোতাদের শোনাতেন। আর তিনি মারা গেলেন আইনস্টাইনের ১২৯তম জন্মবার্ষিকীতে— ২০১৮ সালের ১৪ মার্চ। কে জানে, এ ঘটনায় তিন কতটা খুশি হতেন। তার ধারণামতো মস্তিষ্কের কম্পিউটার কপি তৈরি করা গেলে হয়তো তার দৈহিক মৃত্যুর পরও তার মনের প্রতিক্রিয়াটা জানা যেতে পারত।
সূত্র: নিউ ইয়র্কার ও সায়েন্টিফিক আমেরিকান অবলম্বনে





