মূল: ইন্তিজার হুসেন । ভাষান্তর: মাহমুদ আলম সৈকত

লোকটার বউ তার দিকে তাকায়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি হাসতেছ কেন?’ বিপদ টের পেয়ে লোকটা উত্তর দিল, ‘আমি তো হাসতেছি না, হাসতেছি?’

‘হাসতেছ না? কেন হাসতেছ বলো, হাসতে হাসতে তো দুই কান ভরায়ে ফেলছ!’ হাতেনাতে প্রমাণ দিয়া বউ যোগ করে, ‘কাউরে মনে পড়ছে?’

‘কি বলো এইসব! আমার কারে মনে পড়বে?’ আমতা আমতা করে লোকটা চুপ মেরে গেল।

লোকটা ভাবল এইভাবে চুপ মেরে থাকলে বিষয়টা হারায়ে যাবে আর তারপর সে একটু মন খুইলা হাসতে পারবে, কিন্তু বউটা বাগড়া দিতেই লাগল। নাশতার থালাবাটি দ্রুত রান্নাঘরে রাইখা সে আবার জামাইর সামনে হাজির। মানে বোঝা গেল যে এই ঘরে মন খুইলা হাসার স্বাধীনতা হারাইছে সে। তাইলে এখন সে কই যাবে?

ঘরের এমন কষা দশা থিকা বাইর হয়া সে অন্য ফিকিরে মন দেওনের কথা ভাবল। ধরেন, হাসতে পারে এমন সম্ভাবনার দিকে যাইতে পারা আর কি। আজকে তার হাসতেই হবে এইটাতে কোনো ভুল নাই, ফলে সে পরিকল্পনা করছিল যে ঘরে বইসা শান্তিমতো এই হাসাহাসির কাজটা সারবে। কিন্তু সেই আশার গুড়ে প্রচুর বালু দেখা যাইতেছে।

সুতরাং তাকে এখন ঘর ছেড়ে বাইর হইতে হবে।

‘তুমি যে আজকে অফিসে যাইতে এত দেরি করতেছ?’

‘যাবো না ভাবছিলাম। কিন্তু হঠাৎ একটা জরুরি কাজের কথা মনে পড়ল। ওইটা আজকে শেষ করতেই হবে।’

‘খুব ভালো কথা। তাইলে অফিসে যাওয়ার পথে কারেন্টের বিলটা জমা দিয়া যাইয়ো। কালকেই জমা দেওনের শেষ দিন, তাইলে আজকে দিয়ে দেওয়া ভালো না?’ বলে সে বিলের কাগজ আর টাকা আনতে ভেতরে গেল।

ঠিক বাইর হওয়ার আগমুহূর্তে বউর মনে পড়ল, ‘আইচ্ছা খালাম্মারে না টাকা পাঠানো কথা? শোনো, বিলটা দেওনের পর পোস্ট অফিস থিকা খালাম্মারে টাকা পাঠায় দিও। খাড়াও, টাকা দিতেছি।’

ঘর থিকা বাইর হয়া সে লম্বা একটা শ্বাস টানল। হ, এইবার হাসতাম পারি। স্কুটারের প্যাডেল মারতে মারতে লোকটার মুখে হাসির ঝলক দেখা যাইতে লাগল। কিন্তু ঝলকটা দ্রুতই হাওয়ায় মিলায় গেল। কারণ একটা লোক প্যাডেল মারতে মারতে হাসতেছে এইটা অন্য লোকজন দেখলে কী ভাববে, এমন একটা ভাবনা লোকটার মাথায় টোকা মারল। ফলে প্যাডেল মারতে মারতে বেক্কলের মতো হাসা ঠিক না ভেবে সে হাসিটা গিল্লা ফেলে।

বিল জমা দেয়ার জন্য ব্যাংকে পৌঁছায়া সে দেখে যে তার আগে আরো অনেকেই লাইনে দাঁড়ায় আছে, লাইনটা সাপের ল্যাঞ্জার মতো বাঁকায়া ব্যাংকের দরজা ইস্তক ঠেকছে। উপায় নাই, তাই সে লাইনে দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে ক্লান্ত হইল। তার ডাক আসলে, সে বিল জমা দিয়া পোস্ট অফিসের দিকে হাঁটা দিল। এইখানেও একই কাহিনী, লম্বা লাইন। যথারীতি সে লাইনের শেষজন, সেইটাই দস্তুর। একসময় এইখান থিকাও সে মুক্ত হইল।

ব্যাংক আর পোস্ট অফিসের এই ফ্যাকরা লোকটারে ত্যক্তবিরক্ত বানায়ে ফেলছিল। সুতরাং এমন একটা শান্ত-নিরিবিলি জায়গা সে খুঁজতেছিল, যেইখানে বসে এক কাপ চা খেয়ে নিজেরে চাঙ্গা করতে পারে। হাঁটতে হাঁটতে একটা রেস্টুরেন্ট মনে ধরলে সে ওইখানে গিয়া বসল। বসে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি আর চায়ের অর্ডার করল। গলায় পানি ঢালতে ঢালতে তার কলিজা ঠাণ্ডা হইতে লাগল, চা খাওয়ার পর সে পুরা চাঙ্গা হয়া উঠল। তখন আবারও তার গোপন ইচ্ছাটার কথা মনে পড়ল।

সে প্রায় হেসেই দিছিল কিন্তু তার সজাগ মন ভাবল যে আশপাশে এত লোকজন, এসবের মধ্যে একটা লোক এমনে এমনে হাসবে বিষয়টা দেখতে আজিব। লোকজন ভাববে এই লোকের মাথা নষ্ট! ভেবে সে এদিক-সেদিক তাকাল। সবগুলা টেবিল ভর্তি। স্বাভাবিক, দুপুরবেলা। লোকজন গপাগপ খাচ্ছে। কারোর মুখে হাসির চিহ্নমাত্র নাই। ‘যাও একটু সময় পাইলাম হাসার জন্য, দেখতেছি আর কেউই আমার দলে নাই। আমি যদি এখন বেহুদার মতন হাসতে লাগি, তাইলে লোকজন পাগল বলবে না? না, তবে হাসার জন্যও তো দুয়েকজন সঙ্গীসাথী লাগে। কী সব আন্দাজি তালিবালি।’

আসলে অফিসে চইলা যাওয়াই ভালো। ‘হাসার জন্য উপযুক্ত জায়গা পাওয়া মুশকিল। অফিসে লোকজন আজাইড়া বইসা থাকে আর হুদাই গ্যাজায়, এই রাজনীতি তো এই সিনেমা তো এই লুচ্চামার্কা কৌতুক। সুতরাং অফিসে ঢুইকা যাওয়াটাই ঠিক হবে। ফারুকির স্টকে অফুরন্ত কৌতুক আছে, খালি টেকা মারনের দেরি, গড়গড়ায়ে বলে যাবে ঘণ্টাখানেক।’

অফিসে পৌঁছে সে দেখল যে অফিসের হাওয়া-বাতাস বেশ গরম। কারণ কী? কারণ ফারুকির পদোন্নতিটা বাতিল হয়া গেছে, তার বদলে এমন একজনের পদোন্নতি হইছে যে ফারুকির বহুত পরে চাকরিতে যোগ দিছিল। অতএব ফারুকির মনমর্জি তব্দা হয়া আছে।

ধুর বাল বলে সে অফিস থিকা বাইর হয়া বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। হাঁটতে হাঁটতে তার ভাবনা হইল: তার হাসতে হবে কেন? কেন হাসতে হবে!

‘আমি হাসতে চাইতেছি কেন?’ এই প্রশ্ন আরেক প্রশ্নরে টাইনা আনল: ‘হাসতে হইলে কী কোনো কারণ লাগে?’

তখন তার সকাল বেলার কথা মনে পড়ল, বউ যে জিগাইছিল, ‘হাসতেছ কেন?’ সেই প্রশ্নটা তারে আসলে ভ্যাবাচ্যাকায় ফেলায় দিছিল।

‘কাউরে প্রত্যেক পদে পদে জিজ্ঞাস করা যে তুমি এইটা কেন করছ, তুমি ওইটা কেন করছ, এইটা উদ্ভট না! কারণ ছাড়া, অহেতুক ব্যাপারস্যাপার মানুষের জীবনে থাকবেই, এইটা মানুষের হক। তাইলে আমি কেন হাসব বা আমারে কেন হাসতে হবে, এসব ভাবনা ভাবার কী আছে? আমি হাসতে চাইছি, এইটা আসল কোনো কারণ ছাড়াই, এমনেই।’

নিজের এ মতন ব্যাখায় সে বেশ আশ্বস্ত বোধ করল, কিন্তু অন্যরা এইটারে কীভাবে নেবে সেই বিষয়ে সে রফায় আসতে পারে নাই তখনো। অন্যরা তো সবসময় জিজ্ঞাস করতেই থাকবে যে তুমি কেন হাসতেছ বা কেন কানতেছ? সুতরাং সে তার ভাবনা জারি রাখল। ভাবতে ভাবতেই সে চারপাশে চোখ বোলাল এ আশায় যে হাসতে পারার মতো অত্যন্ত একটা বিষয় খুঁইজা পাবে। আশপাশে প্রচুর হাসনের মতন বিষয়, তবুও হাসলে পরে লোকে কেন জিগায় ‘হাসতেছ কেন?’ আর জিগাইলেই বা তা সেটার কারণ খোঁজার কি কোনো দরকার আছে? অবাক হয়া লোকটা দেখল যে চারপাশে এত এত হাসির মতন কারণ থাকার পরও লোকজন খুব কমই হাসে। হুম এইবার সে নিজেই নিজেরে ভ্যাঙ্গাইতে শুরু করল।

ঘরে পৌঁছায়ে সে দেখতে পাইল যে পাশা কেমন জানি উল্টায়ে গেছে! সকালের ফাপড় আর নাই বরং তিনি খুবই ব্যস্ত হয়া রান্না চড়াইতেছেন চুলায়। রাতের রান্না বসাইতে একটু বোধহয় দেরি হয়া গেছে। ফলে জামাইর দিকে মন দেবার ফুরসত এখন একেবারেই নাই। লোকটা তার হারানো স্বাধীনতা ফিরা পাইল যেন! এইটা মানে এই স্বাধীনতাটা খুবই জরুরি, এইটা ফিরা পাইতেই হয়। এইটা থাকলে আপনেরে কেউ আইসা তালাশি নিবে না, দিগদারি লাগাবে না।

উদ্দেশ্যহীনভাবে লোকটা রেডিও চালু করল এবং ততোধিক উদ্দেশ্যহীনভাবে রেডিওর চ্যানেল ঘুরাতে লাগল। ঘোরাতে ঘোরাতে একটা স্টেশনে আইসা সে শুনতে পাইল সেইখানে কৌতুক-নকশা চলতেসে। একটুক্ষণ শোনার পর তার বেশ মজা লাগতে লাগল। তারপর সে অন্য চ্যানেলে যাওয়ার জন্য নব ঘোরানো শুরু করল। আরেকটায় গান হইতেছে, সুখী সুখী গান।

চ্যানেল থিকা চ্যানেলে ঘুরতে লাগল সে। প্রতিটি চ্যানেলই সে বেশ খুশি খুশি ব্যাপার টের পাইল, ‘আরে সবাই তো দেখি মহাসুখে আছে!’

‘হুম, সবাই-ই সুখে আছে, আছে না?’ নিজেই নিজেরে বিড়বিড় করে বলার পর লোকটা বিষাদে আক্রান্ত হইল। অথচ বিষাদে পড়ার মতো কোনো মামলা কিন্তু নাই।