১০ জুন ছিল বব ডিলানের নোবেল ভাষণ প্রদানের ডেডলাইন। উল্লেখ্য, নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য অর্থাত্ ৯ লাখ ডলার গ্রহণ করতে হলে ডিলানকে অবশ্যই তার নোবেল ভাষণ প্রদান করতে হতো এই সময়ের মধ্যে। ভক্তদের স্বস্তি দিয়ে ডিলান সময়মতোই তার নোবেল ভাষণ প্রদান করেছেন। সেই ভাষণের চুম্বকাংশের ভাষান্তর এখানে—

 

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর আমি বিস্মিত হয়েছিলাম, কীভাবে আমার গান সাহিত্য হিসেবে বিবেচিত হলো। আমি এই সম্পর্কটা খুঁজে দেখতে চেয়েছিলাম। এবার আমি সেই সম্পর্কটাই আপনাদের কাছে ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করব। খুব সম্ভব এটা একটু ঘোরানো-প্যাঁচানো মনে হতে পারে, তবে আমার আশা যে আমি যা বলব, সেটা উদ্দেশ্যমূলকই হবে।

আমার জীবনে কিছু বিষয় ছিল। নিয়মনীতি ও সংবেদনশীলতা ছিল এবং দুনিয়া সম্পর্কে একটি জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। এগুলো সব গ্রামার স্কুলেই শিখেছি। ডন কুইক্সোট, আইভানহো, রবিনসন ক্রুশো, গালিভার্স ট্রাভেলস, টেল অব টু সিটিজসহ গ্রামার স্কুলের আরো সব নির্ধারিত বইপত্র আপনাকে দুনিয়াকে দেখার একটা দৃষ্টিভঙ্গি দেবে। মানুষের প্রকৃতিকে বোঝার সক্ষমতা তৈরি করে এবং একটি আদর্শ মান দেয়া, যা দিয়ে বিভিন্ন বিষয় মাপা যায়। আমি যখন গান লেখা শুরু করি, তখন এসবই আমার সঙ্গে ছিল। এসব বইয়ের থিম বিভিন্নভাবে আমার অনেক গানে ছাপ ফেলেছে, কখনো জ্ঞাতসারে আবার কখনো অজ্ঞাতসারে। আমি এমন গান লিখতে চেয়েছি, যা কেউ আগে কখনো শোনেনি এবং এ থিমগুলো ছিল মৌলভিত্তি। গ্রামার স্কুলে পড়ার পর থেকে যেসব বই আমার মাথায় গেঁথে আছে, সে রকম বইয়ের কথা বললে আমি তিনটি বইয়ের নাম বলতে চাই— মবি-ডিক, অল কোয়ায়েট অন্য দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট ও দি অডেসি। 

মবি-ডিক একটা চিত্তাকর্ষক বই, বইটি উচ্চমাত্রার নাটকীয় দৃশ্য আর সংলাপে পূর্ণ। বইটা আপনার কাছে দাবি করবে। গল্পের প্লট সোজা-সরল। রহস্যময় ক্যাপ্টেন আহব। তিনি পেকোদ নামের একটা জাহাজের ক্যাপ্টেন, তার একটি পা কামড়ে নিয়ে গিয়েছিল দানবাকৃতির এক সাদা তিমি মবি-ডিক। তিনি তিমির বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে উন্মাদের মতো ছুটে চলেন। ক্যাপ্টেন সেই তিমির দেখা পান আটলান্টিক থেকে দূরে আফ্রিকা ও ভারত মহাসাগরে। দুনিয়ার উভয় প্রান্তেই তিনি তিমিটিকে ধাওয়া করেছেন। এটা ছিল একটা বিমূর্ত লক্ষ্য, নির্দিষ্ট কিছু নয়। ক্যাপ্টেন মবিকে ডাকেন সম্রাট নামে, তাকে দেখেন শয়তানের প্রতিরূপ হিসেবে। আহবের স্ত্রী ও সন্তান থাকে নানটুকেটে, তিনি মাঝে মাঝে স্ত্রী-সন্তানের স্মৃতিচারণ করেন। গল্পের সামনে কী হবে সেটা আপনি অনুমান করতে পারবেন।

জাহাজের ক্রুরা বিভিন্ন জাতি থেকে আসা, তাদের মধ্যে যে তিমিটা দেখতে পাবে, তাকেই একটি স্বর্ণমুদ্রা দেয়ার ঘোষণা দেন ক্যাপ্টেন। পথে আহবের সঙ্গে তিমি শিকারে বের হওয়া আরো অনেক নৌযানের সাক্ষাত্ হয়, সেগুলোর ক্রুদের কাছে ক্যাপ্টেন মবি সম্পর্কে তথ্য জানতে চান। আপনারা কি মবিকে দেখেছেন? এক জাহাজে এক পাগলাটে ভবিষ্যত্ বক্তা ছিলেন, যিনি মত দেন যে আহবের অভিযান ব্যর্থ হবে। তিনি আরো বলেন, মবি হচ্ছে এক শাকের গডের দেহধারী প্রকাশ। তার সঙ্গে যে মোকাবেলা করতে যাবে, সেই চূড়ান্তভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি এটা ক্যাপ্টেন আহবকে বলেন। আরেকটি জাহাজের ক্যাপ্টেন বুমারও মবির কাছে নিজের বাহু হারিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এটা সহ্য করে নিয়ে বেঁচে আছেন বলেই খুশি আছেন। বুমার আহবের প্রতিশোধের তৃষ্ণাকে গ্রহণ করতে পারেননি।

একই রকম ঘটনায়, অভিজ্ঞতায় বিভিন্ন মানুষ বিভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়। ওল্ড টেস্টামেন্টের অনেক বিবিলিকাল অ্যালিগরি: গ্যাব্রিয়েল, র্যাচেল, জেরোবম, বিলদাহ, এলিজাহ বইয়ে ব্যবহূত হয়েছে। বিভিন্ন প্যাগান নাম: তাশতোগো, ফ্লাস্ক, ড্যাগু, ফ্লিস, স্টারবাক, স্টাব, মারথা’স ভিনইয়ার্ডও আছে। প্যাগানরা মূর্তি পূজারি। কেউ ছোট মোমের বা কাচের মূর্তিপূজা করে আবার কেউ আগুনকে। দ্য পেকোদ একটি ইন্ডিয়ান গোষ্ঠীর নাম।

মবি-ডিক সমুদ্রে অভিযানের গল্প। গল্পের বক্তা বলেন, ‘আমাকে ইশমায়েল নামে ডাকবে।’ কেউ একজন সে কোথা থেকে এসেছে সেটা জিজ্ঞেস করে, জবাবে ইশমায়েল বলে, ‘এটা কোনো মানচিত্রে নেই। সত্যিকার জায়গা কখনই মানচিত্রে থাকে না। স্টাব কোনো কিছুকেই গুরুত্ব দিতে নারাজ; তার মতে, সবকিছুই পূর্বনির্ধারিত। ইশমায়েল তার প্রায় পুরো জীবনই কাটিয়েছে সমুদ্রগামী জাহাজে। জাহাজকেই সে নিজের হার্ভার্ড ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় বলে মনে করে। মানুষ থেকে সে দূরে থাকে। এর মধ্যে পেকোদে একটা টাইফুনের পাল্লায় পড়ে। ক্যাপ্টেন আহবে মনে করেন এটা শুভলক্ষণ আবার স্টারবাক মনে করেন এটা অশুভ লক্ষণ। টাইফুন থেমে গেলে জাহাজের মাস্তুল থেকে পড়ে এক জাহাজি পানিতে তলিয়ে যায়। ঘটনাটা যেন সামনের ভয়ানক পরিস্থিতির ইঙ্গিত করছিল। 

খ্রিস্ট ধর্মের একটি আন্দোলন কোয়েকারের একজন শান্তিবাদী যাজক ছিলেন আদতে একজন রক্তলোলুপ ব্যবসায়ী। এ ঘটনার কথা উল্লেখ করে ফ্লাস্ক বলে, ‘আঘাতপ্রাপ্ত অনেক মানুষ ঈশ্বরের কাছে চলে যান আবার অনেকে তিক্ত জীবনে বেদনার্ত হন।’

সবকিছুই মিশে আছে। পুরাণ, জুডিও খ্রিস্টান বাইবেল, হিন্দু পুরাণ, ব্রিটিশদের কিংবদন্তি, সেন্ট জর্জ, পারসিয়াস, হারকিউলিস সবাই তিমিশিকারি। গ্রিক পুরাণ, একটা তিমিকে কাটার রক্তাক্ত প্রক্রিয়া। এ বইয়ে স্থান পাওয়া অনেক তথ্য— ভৌগোলিক তথ্য, তিমির তেল— রাজপরিবারগুলোর তিমি শিকারের ব্যবসায় জড়িত হওয়া নিশ্চিত করে। তিমির তেল রাজারা ব্যবহার করতেন।

শেষমেশ আহব মবিকে খুঁজে পায়। হারপুনগুলো বের হয়ে আসে। ছোট ছোট নৌকাগুলো সাগরে নামানো হয়। আহবের হারপুন মবির রক্তে রঞ্জিত হয়। মবি আহবের নৌকায় আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেয়। পরের দিন আবার মবির দেখা মেলে। মবি আবার আহবের নৌকায় আক্রমণ করে। তৃতীয় দিনে আরেকটি নৌকা ধ্বংস হয়। আরো ধর্মীয় রূপক। এর পর আরেকবার আক্রমণ করে মবি পেকোদ জাহাজটা ডুবিয়ে দেয়। আহবের সলিল সমাধি হয়।

হাজার বছরের সংস্কৃতি, দর্শন, প্রাজ্ঞতা— প্লেটো, অ্যারিস্টটল, সক্রেটিস— সেসবের কী হলো?

ইশমায়েল বেঁচে গিয়েছিল। একটা কফিনে সে ভেসে ছিল। এটা মবি ডিকের পুরো গল্প। এই গল্পের থিম এবং অর্থ আমার অনেক গানে ব্যবহার হয়েছে।

অল কোয়ায়েট অন দি ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট আরেকটি বই, যা আমার ওপর প্রভাব রেখেছে। এ বইয়ে আপনি আপনার শিশুবেলা, অর্থপূর্ণ দুনিয়া এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার বিষয়ে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবেন। আপনি একটা দুঃস্বপ্নে আটকে যাবেন।

অডেসি যুদ্ধ শেষে এক যোদ্ধার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের অদ্ভুত, রোমাঞ্চকর গাথা। তার যাত্রা নানা রকম ফাঁদ আর বিভ্রান্তিতে পূর্ণ। সে পথ ভুল করার অভিশাপে আক্রান্ত। সে এমন সব মানুষকে রাগান্বিত করে, যাদের তার রাগানো উচিত নয়। তার সহকর্মীদের মধ্যেও অনেকে সমস্যা সৃষ্টি করে। আছে বিশ্বাসঘাতকতা।

নায়ক এক বিরান দ্বীপে আটকে পড়ে। সেখানে সে কিছু জনশূন্য গুহা পেয়ে সেগুলোয় আশ্রয় নেয়। সেখানে সে এক দানবের পাল্লায় পড়ে, দানব তাকে খেতে চায়। সে বাড়ি ফিরতে চায় কিন্তু বাতাস তাকে বারবার ফিরিয়ে দেয়। ভবিষ্যতের যেকোনো কিছুর ব্যাপারে সে সবাইকে সাবধান করে। সবসময়ই মানুষের সামনে দুটো পথ খোলা থাকে এবং দুটোই খারাপ। দুটোই বিপদসংকুল। এক পথে আপনি ডুবে যেতে পারেন আর অন্য পথে অভুক্ত থাকতে পারেন। সে গিয়েছিল বিপদসংকুল এক সংকীর্ণ পথে। সেখানে সে ছয় মাথা আর ধারালো দাঁতযুক্ত এক দানবের মোকাবেলা করে। তার ওপর বজ পাত হয়। ঝুলে থাকা গাছের শাখা-প্রশাখায় পা রেখে সে একটা খরস্রোতা নদী পার হয়। দেব-দেবীরা তাকে রক্ষা করে। তবে কোনো কোনো দেব-দেবী তাকে হত্যা করতে চায়। সে নিজের পরিচয় বদলে ফেলে। সবকিছু নিয়ে সে বিরক্ত-ক্লান্ত। সে ঘুমিয়ে পড়ে। হাসির শব্দে তার ঘুম ভাঙে। সে তার গল্প অচেনা সেই আগন্তুককে খুলে বলে।

মেলভিল তার ওল্ড টেস্টামেন্ট, সাগর, তিমি আর জাহাজ-বিষয়ক জানা সব বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও জ্ঞান এই একটি কাহিনীতে উজাড় করে দিয়েছেন। আমার মনে হয় না এসবের অর্থ নিয়ে তাকে কখনো খুব বেশি উদ্বিগ্ন হতে হয়েছে।

অনেকে ভাবে আপনার জীবনেও ঠিক এমনসব ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। আপনিও মদের সঙ্গে ওষুধ মিশিয়ে থাকতে পারেন। ভুল নারীর সঙ্গে বিছানায় যেতে পারেন। অচেনা কোন জাদুকরী মিষ্টি সুরে আপনিও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থাকবেন।

আমিসহ আরো অনেক গীতিকার এসব থিম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। এগুলোর অনেক অর্থ হতে পারে। যদি কোনো গান আপনাকে নাড়া দেয়, তাহলে সেটাই সবচেয়ে বড় কথা। গান কী, সেটা কখনো আমাকে জানতে হয়নি। আমি আমার গানে সবকিছুই লিখেছি। এসবের অর্থ নিয়ে আমাকে কখনো দুশ্চিন্তা করতে হয়নি। মেলভিল যখন ওল্ড টেস্টামেন্ট, বিবিলিকাল রেফারেন্স, বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, প্রোটেস্টান্ট তত্ত্ব, সাগর, জাহাজ, তিমি নিয়ে তার সব জ্ঞান একটি গল্পে মিশিয়ে দিলেন, তখন তাকে অর্থ নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়নি।

কবি-পাদ্রি, শেক্সপিয়ারের সমসাময়িক জন ডান লিখেছিলেন, ‘দ্য সেসটোজ অ্যান্ড অ্যাবিডোজ অব হার ব্রেস্টস। নট অব টু লাভারস, বাট টু লাভস, দ্য নেস্টস।’ আমি জানি না এ লাইনদ্বয়ের অর্থ কী। কিন্তু শুনতে খুব ভালো লাগে। এবং আপনিও চান আপনার গানগুলো যেন শ্রুতিমধুর হয়।

বীর যোদ্ধা একিলিস শান্তিময় দীর্ঘ জীবনের চেয়ে সম্মান আর গৌরবে ভরা সংক্ষিপ্ত জীবন বেছে নিয়েছিলেন। দি অডেসিতে অডিসিয়াস বা ইউলিসিস যখন পাতালে সুবিখ্যাত যোদ্ধা একিলিসের সঙ্গে সাক্ষাত্ করলেন, তখন তিনি বললেন, ‘সেটা ছিল আমার ভুল। আমি মরে গিয়েছিলাম। এটাই সব। কোনো সম্মানের বিষয় নেই। অমরত্বের সম্মান নেই।’ এবং যদি সম্ভব হতো একিলিস তাহলে পেছনে ফিরে যেতেন এবং কোনো এক কৃষকের দাস হিসেবে জীবন কাটিয়ে দিতেন। এ মৃতদের দেশে রাজা হওয়ার চেয়ে সেটাই ভালো।

গানগুলোও এমন কিছু। আমাদের গানগুলো জীবিতদের দুনিয়ায় বেঁচে থাকে। গান কিন্তু আর সব সাহিত্যের মতো নয়। গান পড়া হয় না বরং গাওয়া হয়। শেক্সপিয়ারের নাটকের সংলাপ মঞ্চে অভিনয় করতে হয়। গানের কথার মতো যা আসলে গাইতে হয়, পাতা থেকে পড়লে হয় না। আমার আশা আপনাদের অনেকেই আমার গানের কথাগুলো সেভাবে শোনার সুযোগ পেয়েছেন, যেভাবে সেগুলো শোনার কথা: কনসার্টে বা রেকর্ডে— যেভাবে আজকাল মানুষ গান শোনে। আমি আরেকবার হোমারের কাছে ফিরে যাব, যিনি বলেছিলেন, ‘ওহ মিউজ, আমার মধ্যে সুর তোলো এবং আমার মাধ্যমে গল্পটা বর্ণনা করো।’

 

জিকিউ ম্যাগাজিন থেকে ভাষান্তর: এস এম রশিদ